মিরপুরে ৭৫ বছর বয়সী নূর জাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তিনি তাঁর মেয়ের সঙ্গে যে বাসায় থাকতেন, সেই বাসার ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, নূর জাহান বেগমের ঘরসহ পুরো ফ্ল্যাটের অবস্থা অত্যন্ত নোংরা, অস্বাস্থ্যকর। মরদেহের ফুটেজেও নূর জাহান বেগমের ডান চোখে সাদা ফাঙ্গাসের মতো পড়ে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পল্লবী থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বলছেন, মরদেহ উদ্ধারের সময় তাতে পোকার অস্তিত্ব দেখেছেন।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে মিরপুরের সেকশন ৬, ব্লক সি, ১৩ নম্বর সড়কের ভবনটির চতুর্থ তলায় গিয়ে প্রথম আলোসহ অন্যান্য গণমাধ্যমের কর্মীরা দীর্ঘ সময় কলবেল দিয়ে অপেক্ষা করলেও কেউ দরজা খোলেননি।
তবে ভবনটিতে থাকা এবং আশপাশের প্রতিবেশীরা বলছেন, ঘরের ভেতরে একজন প্রবীণ নারী যেভাবে মারা গেলেন, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই নারীর দুই ছেলে এবং এক মেয়েও উচ্চশিক্ষিত এবং ভালো চাকরি করছেন। এলাকাবাসী এমন মৃত্যুকে অমানবিক বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
নূর জাহান বেগমের এক ছেলে যুগ্ম সচিব, এক ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক এবং এক মেয়ে স্থানীয় একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। তিন ছেলেমেয়ের সঙ্গেই প্রথম আলোর মুঠোফোনে কথা হয়েছে। মেয়ে এবং এক ছেলে প্রতিবেদকের পরিচয় জানার পর ফোন কেটে দিয়েছেন। এক ছেলে বলেছেন, তাঁর মা যেহেতু তাঁর বোনের সঙ্গে থাকতেন, এই বোনকে এলাকাবাসী বিভিন্নভাবে হুমকি দিচ্ছে, তাই এ মুহূর্তে নাম–পরিচয় প্রকাশ করে কথা বলাটা ঠিক হবে না।
পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শামছুর রহমান নূর জাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার প্রক্রিয়ার শুরু থেকে উপস্থিত ছিলেন। তিনি জানান, একজন নার্সকে ডেকে এনেছিলেন তাঁর মেয়ে। নার্স এসে সরকারের জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন দেন। তারপর তিনি (এসআই) সেখানে গিয়ে দেখতে পান, বাসাটি বসবাসের অনুপযোগী, চারপাশ অত্যন্ত নোংরা। মরদেহটি বিছানায় পড়ে আছে, ডান চোখ ও পিঠে পোকা ধরেছে।
এ ঘটনা আবারও প্রমাণ করে যে মানুষ এত আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে, নিজের মায়ের খোঁজও রাখতে চায় না
শামছুর রহমান বলেন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মরদেহের সুরতহাল করে ময়নাতদন্ত করা হয়। নূর জাহান বেগমের মাথার ডান পাশে একটি আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে, যা চিকিৎসকও দেখেছেন। মৃত্যু হয়তো আরও কয়েক দিন আগেই হয়েছে। ময়নাতদন্তের পর বুয়েটের অধ্যাপক ছেলে এবং মেয়ের জিম্মায় লাশ হস্তান্তর করা হয়। বড় ছেলেকে ফোন করলেও তিনি খুলনায় আছেন, আসতে পারবেন না বলে জানান। চাঁদপুরের উত্তর মতলব থানায় গ্রামের বাড়িতে দাফন করার কথা।
গত ৩১ মে লাশ উদ্ধারের পর ১ জুন নূর জাহান বেগমের মেয়ে পল্লবী থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, তাঁর বাসায় তাঁর অগোচরে মায়ের মৃত্যু হয়েছে। এ মৃত্যুতে পরিবারের কারও প্রতি কোনো অভিযোগ বা সন্দেহ নেই।
ডি ব্লকের বাসিন্দা সাংবাদিক মারুফ হায়দারও এ ঘটনায় নূর জাহান বেগমের তিন ছেলেমেয়ে এবং দুই নাতির বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বাসার ভেতরে ঢুকে বাসার অবস্থা দেখে তিনিও অবাক হয়ে গেছেন। নূর জাহান বেগমের পরিবারের সদস্যরা তিনিসহ অন্যদের ওপর হামলা করেছেন এবং ঘুষ দিতে চেয়েছেন।
নূর জাহান বেগম মেয়ের ফ্ল্যাটে থাকতেন। ফ্ল্যাটটি তাঁর মেয়ে শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে পেয়েছেন। মেয়ের স্বামী মারা গেছেন কয়েক বছর আগে, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। আর নূর জাহান বেগম নিজেও শিক্ষকতা করতেন।
আইনে বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তানকে পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে।পিতা–মাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখবেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও পরিচর্যা করবেন। আইন না মানলে অনূর্ধ্ব এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন বা অর্থদণ্ড অনাদায়ের ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব তিন মাস কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
ছেলেমেয়েদের আইনের আওতায় আনার দাবি
নূর জাহান বেগমের মরদেহ পুলিশ উদ্ধারের পর আবার আলোচনায় এসেছে ২০১৩ সালের পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইনটি। ২০২৩ সালে এ আইনের বিধিমালাও করা হয়। আইনে বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তানকে পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো পিতা-মাতার একাধিক সন্তান থাকলে সন্তানেরা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে ভরণপোষণ নিশ্চিত করবেন। পিতা এবং মাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখবেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও পরিচর্যা করবেন। আইন না মানলে অনূর্ধ্ব এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন বা অর্থদণ্ড অনাদায়ের ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব তিন মাস কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
নূর জাহান বেগম যে ভবনে থাকতেন, তার নিচতলার ভাড়াটে জহিরুল ইসলাম, আরেক প্রতিবেশী সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ছেলেমেয়েরা সবাই শিক্ষিত। তারপরও এমন অবহেলায় মা কেন মারা যাবেন? এই ছেলেমেয়েদের আইনের আওতায় এনে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
মা ও মেয়ে একই ফ্ল্যাটে থাকতেন। তারপরও মায়ের এভাবে মারা যাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত অমানবিক।মো. হাসান বাসির, পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)
এলাকাবাসী জানান, এই পরিবারের সদস্যরা কখনোই অন্য কারও সঙ্গে মিশতেন না, কথা বলতেন না। বাসায় কোনো প্রয়োজনে গেলেও দরজা খুলতেন না।
পল্লবী থানায় গিয়ে কথা হয় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাসান বাসিরের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নূর জাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত করানো হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, নূর জাহান বেগমের মৃত্যু কয়েক দিন আগেই হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেলে জানা যাবে, কবে মারা গেছেন। কোনো আঘাত বা অন্য কোনো কারণে মারা গেছেন কি না, তা–ও নিশ্চিত হওয়া যাবে। এরপরই আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ওসি বলেন, মা ও মেয়ে একই ফ্ল্যাটে থাকতেন। তারপরও মায়ের এভাবে মারা যাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত অমানবিক। উদ্ধারের পর মরদেহ দেখে মনে হয়েছে, নূর জাহান বেগমের মলমূত্র পরিষ্কার করা হতো না। দুর্গন্ধে কাছে যাওয়া যাচ্ছিল না।
‘মানুষ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনাটি খুবই হৃদয়বিদারক। মা হিসেবে তিনি নিশ্চয়ই অনেক যত্ন নিয়ে এই সন্তানদের বড় করেছিলেন। সেই সন্তানেরা উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত। অথচ তাঁরা মায়ের প্রতি কোনো দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনীয়তা বোধ করেননি, এটা বেদনাদায়ক। এ ঘটনা আবারও প্রমাণ করে যে মানুষ এত আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে, নিজের মায়ের খোঁজও রাখতে চান না।
এ ক্ষেত্রে পিতা–মাতার ভরণপোষণ আইনের কথা স্মরণ করে দিয়ে অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল বলেন, আইনটি সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। এমন বাস্তবতায় বৃদ্ধাশ্রম নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব না রেখে আদর্শ বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বাড়ানোর চিন্তা করতে হবে।