Image description

বাংলাদেশের মাটির নিচে রয়েছে বিলিয়ন টন কয়লার মজুদ। বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান চাহিদা বিবেচনায় এই মজুদ দিয়েই অন্তত ২০০ থেকে ৩০০ বছর দেশের কয়লার প্রয়োজন মেটানো সম্ভব। অথচ বাস্তবতা হলো- দেশ এখন দ্রুত আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ছে। প্রতি বছর বিদেশ থেকে কয়লা আমদানিতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা। এতে এক দিকে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়ছে চাপ, একই সাথে ঝুঁকির মুখে পড়ছে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, দেশে এত বিপুল কয়লা মজুদ থাকা সত্ত্বেও কেন তা উত্তোলন করা হচ্ছে না।

বাংলাদেশের মাটির নিচে রয়েছে বিলিয়ন টন কয়লার মজুদ। বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান চাহিদা বিবেচনায় এই মজুদ দিয়েই অন্তত ২০০ থেকে ৩০০ বছর দেশের কয়লার প্রয়োজন মেটানো সম্ভব। অথচ বাস্তবতা হলো- দেশ এখন দ্রুত আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ছে। প্রতি বছর বিদেশ থেকে কয়লা আমদানিতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা। এতে এক দিকে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়ছে চাপ, একই সাথে ঝুঁকির মুখে পড়ছে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, দেশে এত বিপুল কয়লা মজুদ থাকা সত্ত্বেও কেন তা উত্তোলন করা হচ্ছে না। কেন দেড় যুগ পার হলেও জাতীয় কয়লানীতি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আর কেন একের পর এক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরও দেশকে বিদেশী কয়লার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

 

পাঁচ খনিতে ৭ বিলিয়ন টনের বেশি মজুদ

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত প্রধান কয়লাখনির সংখ্যা পাঁচটি। এগুলোর অধিকাংশই দেশের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত এবং উচ্চমানের বিটুমিনাস কয়লায় সমৃদ্ধ। বর্তমানে আবিষ্কৃত খনিগুলো হলো- দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া, ফুলবাড়ী ও দীঘিপাড়া, রংপুরের খালাশপীর এবং জয়পুরহাটের জামালগঞ্জ কয়লাক্ষেত্র। বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, বড়পুকুরিয়ায় প্রায় ৩৯০ মিলিয়ন টন, ফুলবাড়ীতে ৫৭২ মিলিয়ন টন, দীঘিপাড়ায় ৬০০ মিলিয়ন টন এবং খালাশপীরে ১৪৩ মিলিয়ন টন কয়লার মজুদ রয়েছে। সবচেয়ে বড় মজুদ রয়েছে জামালগঞ্জে, যেখানে প্রায় ৫.৪ বিলিয়ন টন কয়লা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সব মিলিয়ে দেশে সম্ভাব্য কয়লা মজুদের পরিমাণ প্রায় ৭.১ বিলিয়ন টন।

৩০০ বছরের জ্বালানি চাহিদা মেটানোর সক্ষমতা

বর্তমানে দেশে চালু কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বার্ষিক কয়লার চাহিদা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ থেকে এক কোটি ৫০ লাখ টন। পায়রা, রামপাল, মাতারবাড়ী এবং বড়পুকুরিয়াসহ বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হওয়ায় এই চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। সে হিসাবে, পুরো ৭.১ বিলিয়ন টন কয়লা ব্যবহার করা গেলে বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী প্রায় ৪৭০ থেকে ৫৯০ বছর পর্যন্ত দেশের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব।

তবে বাস্তবে পুরো মজুদ উত্তোলন করা যায় না। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, ভূতাত্ত্বিক জটিলতা, পরিবেশগত ঝুঁকি ও নিরাপত্তাজনিত কারণে সাধারণত ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ কয়লা উত্তোলনযোগ্য ধরা হয়। সে হিসেবে মোট মজুদের মাত্র অর্ধেকও যদি উত্তোলনযোগ্য হয়, তাহলেও প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন টন কয়লা ব্যবহার করা সম্ভব হবে। বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী এই কয়লা দিয়েই প্রায় ২৩০ থেকে ৩০০ বছর দেশের বিদ্যুৎ খাতের জ্বালানি চাহিদা পূরণ করা যেতে পারে।

তবুও আমদানির ওপর পূর্ণনির্ভরতা

বিপুল মজুদ থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে দেশের একমাত্র উৎপাদনশীল কয়লাখনি হলো দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি। এখান থেকে বছরে গড়ে ৭ থেকে ১০ লাখ টন কয়লা উত্তোলন করা হয়, যা জাতীয় চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। ফলে দেশের প্রায় সব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন আমদানিকৃত কয়লার ওপর নির্ভরশীল। পটুয়াখালীর পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র, বাগেরহাটের রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং কক্সবাজারের মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বিদেশী কয়লায় চলছে। জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে বছরে প্রায় এক কোটি ২০ লাখ থেকে এক কোটি ৫০ লাখ টন কয়লা আমদানি করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামার ওপর নির্ভর করে এর জন্য বছরে প্রায় ২ থেকে ২.৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে। বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় দেশের ডলার সঙ্কটকে আরো তীব্র করছে। একই সাথে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতার কারণে বিদ্যুৎ খাতও বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার কাছে জিম্মি হয়ে পড়ছে।

কয়লা উত্তোলন আটকে আছে কেন?

বাংলাদেশে কয়লা উত্তোলন নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই রয়েছে নীতিগত অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে ওপেন-পিট নাকি ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন হবে- এই বিতর্কের কারণে বড় প্রকল্পগুলো এগোয়নি। বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের মতে, বাংলাদেশের অধিকাংশ কয়লাখনি তুলনামূলক কম গভীরতায় অবস্থিত। ফলে ওপেন-পিট পদ্ধতিতে উত্তোলন করলে উৎপাদন ব্যয় কম হবে এবং অধিক পরিমাণ কয়লা উত্তোলন সম্ভব হবে। কিন্তু এই পদ্ধতিতে ব্যাপক জমি অধিগ্রহণ, কৃষিজমি ক্ষতি, বসতভিটা উচ্ছেদ এবং পরিবেশগত ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে ২০০৬ সালে ফুলবাড়ী কয়লাখনি প্রকল্পকে কেন্দ্র করে তীব্র আন্দোলন ও হতাহতের ঘটনার পর সরকার অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নেয়। এরপর থেকে কার্যত ফুলবাড়ী প্রকল্প স্থবির হয়ে আছে। অন্য দিকে ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে উত্তোলন তুলনামূলক নিরাপদ হলেও তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং প্রযুক্তিগতভাবে জটিল। বড়পুকুরিয়া খনিতে ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে উৎপাদনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, প্রত্যাশিত পরিমাণ কয়লা উত্তোলন সম্ভব হয়নি। জামালগঞ্জ কয়লাক্ষেত্রের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও বড়। খনিটির কয়লার স্তর মাটির প্রায় ৬০০ থেকে এক হাজার মিটার গভীরে অবস্থান করছে। ফলে বর্তমান প্রযুক্তি ও ব্যয়ের কাঠামোয় এটিকে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক মনে করা হচ্ছে না।

দেড় যুগেও হয়নি কয়লানীতি

বাংলাদেশে জাতীয় কয়লানীতি প্রণয়নের আলোচনা শুরু হয় প্রায় দেড় যুগ আগে। ২০০৮ সালে খসড়া কয়লানীতি তৈরি হলেও তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। নীতিটি ঝুলে থাকার কারণে কয়লা উত্তোলনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিদেশী বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি উন্নয়ন- কোনোটিই এগোয়নি। ফলে দেশের জ্বালানি পরিকল্পনায় এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার এক দিকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে, অন্য দিকে দেশীয় কয়লা উত্তোলনে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। ফলে আমদানিনির্ভরতা দিন দিন বাড়ছে।

জ্বালানি নিরাপত্তায় বাড়ছে ঝুঁকি

বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতা বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার দাম কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সেই সময় ডলার সঙ্কটের কারণে কয়লা আমদানিতে সমস্যা দেখা দেয় এবং কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান জ্বালানি যদি বিদেশি বাজারের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে যেকোনো বৈশ্বিক সঙ্কট সরাসরি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করবে। তাদের ভাষ্য, দেশীয় কয়লার একটি অংশও যদি পরিকল্পিতভাবে উত্তোলন করা যেত, তাহলে অন্তত বিদ্যুৎ খাতের একটি বড় অংশে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হতো। একই সাথে বৈদেশিক মুদ্রার চাপও কমে আসত।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি বনাম কয়লা বিতর্ক

পরিবেশবিদদের একটি অংশ মনে করেন, বিশ্ব এখন ধীরে ধীরে কয়লা থেকে সরে এসে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগোচ্ছে। ফলে নতুন করে বড় আকারে কয়লা উত্তোলন দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে জ্বালানি অর্থনীতিবিদদের অনেকে বলছেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় আগামী কয়েক দশকে কয়লা পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। গ্যাসের মজুদ কমে যাচ্ছে, এলএনজি আমদানির ব্যয় বাড়ছে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতাও এখনো সীমিত। তাদের মতে, পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশীয় কয়লার ব্যবহার বাড়ানোই হতে পারে বাস্তবসম্মত সমাধান। কারণ দেশের মাটির নিচে শত শত বছরের জ্বালানি মজুদ রেখে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার কয়লা আমদানি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা- দুই ক্ষেত্রেই বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।