Image description

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যায় ভুগছিলেন বলে স্বজনরা জানিয়েছেন।

ষাটের দশকের ছাত্র রাজনীতির সেই উত্তাল সময়ে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তোফায়েল আহমেদ হয়ে উঠেছিলেন ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান নেতা। এরপর মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতা হিসেবে দাপটের সঙ্গে রাজনীতিতে ছিলেন। তবে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের একপর্যায়ে এসে দলের শীর্ষ নেতা শেখ হাসিনার সঙ্গে দ্বন্দ্বের জেরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডের ছয় বছর পর ১৯৮১ সালে তার কন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন। দলটির যে নেতারা সে সময় তাকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। পরে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় রাজনীতিতে মি. আহমেদের ব্যাপক প্রভাব ছিল।

 
 

তবে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, আশির দশকের শেষ দিকে শেখ হাসিনার সঙ্গে তোফায়েল আহমেদের এক ধরনের শীতল সম্পর্ক তৈরি হয়।

 
 

এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ওই নেতারা বলেন, পঁচাত্তরে শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যার ঘটনার পর তোফায়েল আহমেদ যদিও জেল খেটেছেন, কিন্তু সে সময় তোফায়েল আহমেদ শক্ত অবস্থান নেননি। এমন একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের।

 

শেখ হাসিনা কয়েকবার বক্তব্যেও তার সেই ধারণা প্রকাশ করেছেন। এটি তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে শেখ হাসিনার শীতল সম্পর্কের একটি বড় কারণ ছিল বলে মনে করেন দলটির নেতাদের অনেকে।

আর দলের শীর্ষ নেতার সঙ্গে শীতল সম্পর্কের কারণে দলীয় রাজনীতিতে বিভিন্ন সময়ই কোণঠাসা হয়ে থাকতে হয়েছে তোফায়েল আহমেদকে।

আশির দশকে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। দলটির একজন নেতা জানিয়েছেন, তোফায়েল আহমেদ তাদের দলের সাধারণ সম্পাদক হতে না পেরে তার মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছিল আশির দশকের শেষ দিকে।

আওয়ামী লীগের নীতনির্ধারণী ফোরাম সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য করা হয়েছিল তোফায়েল আহমেদকে। সর্বশেষ তিনি দলটির উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। দলের নীতিনির্ধারণে উপদেষ্টা মণ্ডলীর তেমন কোনো ভূমিকা ছিল না।

দলীয় রাজনীতিতে হতাশার বিষয়ে তোফায়েল আহমেদ নিজেও ঘনিষ্ঠ রাজনীতিকদের কাছে বিভিন্ন সময় শেয়ার করতেন।তার সেই ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যে অন্যতম একজন ছিলেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। যদিও সেলিম কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতি করেন। কিন্তু এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় দলগুলোর মধ্যে লিঁয়াজো করতে গিয়ে তাদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়েছিল।

বর্তমানে কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, দলীয় রাজনীতিতে বিভিন্ন সময় সংকটে পড়ে হতাশ হয়েছেন। কিন্তু আদর্শ থেকে সরেননি এবং রাজনীতির যাত্রায় থেমে যাননি।

তবে এক এগারোর সরকার হিসেবে পরিচিত ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সময়ে তোফায়েল আহমেদসহ আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার ভূমিকার জন্য পরবর্তীতে দলের রাজনীতিতে বেশি বেকায়দায় পড়েছিলেন তারা।

সেই সরকার রাজনীতিতে সংস্কারের কথা বলে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ হাসিনা ও বিএনপির শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করতে চেয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

সে সময় সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, আব্দুর রাজ্জাক ও আমির হোসেন আমুর সঙ্গে তোফায়েল আহমেদ তাদের দল আওয়ামী লীগে সংস্কারের প্রস্তাব তুলেছিলেন। বিএনপিরও কয়েকজন নেতা তাদের দলে সংস্কারের প্রস্তাব তুলেছিলেন।

আওয়ামী লীগেও সংস্কারপন্থী বলে ওই চার নেতার একটা পক্ষ তৈরি হয়েছিল। সেই এক এগারোর সরকার তাদের সংস্কার ও দুই নেত্রীর মাইনাস করার ফর্মূলা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এক পর্যায়ে দুই নেত্রীর নেতৃত্বেই দলদুটো ২০০৮ সালে নির্বাচন করেছে এবং বিদায় নিতে হয়েছে সেই সরকারকে।

কিন্তু রাজনীতিতে কপাল পোড়ে সেই সংস্কারপন্থীদের। তোফায়েল আহমেদ দলে চিহ্নিত হন সংস্কারপন্থী হিসেবে এবং একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়েন দলীয় রাজনীতিতে।

এরপর টানা সাড়ে পনেরো বছরের আওয়ামী লীগের শাসনে যদিও তোফায়েল আহমেদ একবার মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়েছিলেন, কিন্তু শেখ হাসিনার সঙ্গে তার সম্পর্কের টানাপোড়েন বেড়ে গিয়েছিল।

সেই পরিস্থিতি তোফায়েল আহমেদ কতটা সামলে উঠতে পেরেছিলেন, তার রাজনৈতিক সহকর্মীদেরও কারও কারও সেই প্রশ্ন রয়েছে। যদিও স্বাধীন বাংলাদেশের সাড়ে পাঁচ দশকে নৌকা প্রতীকেই নয় বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তোফায়েল আহমেদ। তবে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ছিলেন তিনি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের সাতই জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনেও ভোলা-১ আসন থেকে এমপি হয়েছিলেন তোফায়েল আহমেদ।

সূত্র : বিবিসি বাংলা।