Image description

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যক্রমগুলো ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে সত্যিকার অর্থেই যাতে মানুষের কল্যাণে কাজে আসে, সেই চিন্তা থেকেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে চলমান ১২৩টি কর্মসূচিকে কমিয়ে ১৫টিতে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে বেকার ভাতা চালু করা, বেসরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন তহবিল গঠন, ই-স্বাস্থ্য কার্ড প্রচলন, জটিল রোগের ওষুধ স্বল্পমূল্যে দেওয়া, অনাথদের জন্য বিশেষ তহবিলসহ বিভিন্ন উদ্যোগ থাকবে। ২০৩০ সাল পর্যন্ত তৈরি হতে যাওয়া ‘ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক-এ এসব বিষয় যুক্ত করা হবে।

তবে এরই মধ্যে নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি হিসেবে কিছু নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। এই কৌশলপত্রটি তৈরির কাজ করছে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)।

এ প্রসঙ্গে কথা হয় ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরীর সঙ্গে। তিনি আগামীর সময়কে বলেছেন, বর্তমানে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় কতটি কর্মসূচি চলছে— এর সঠিক হিসাবও পাওয়া কঠিন। কেউ বলেন ১২৩টি, আবার কেউ বলেন ১৪০টি কর্মসূচি চলছে। এতগুলো কর্মসূচি বাস্তবায়নের সক্ষমতা আমাদের নেই। ফলে সুবিধাভোগী নির্বাচন করা থেকে শুরু করে বিতরণ পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপচয়ের কথা শোনা যায়। এ কারণে কর্মসূচিগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সফল হয়নি। কিন্তু এগুলোকে যদি ১০ থেকে ১৫টিতে নিয়ে আসা যায়, তাহলে অপারেট করতে সহজ হবে। সেই সঙ্গে প্রকৃত যাদের প্রয়োজন তারা এর আওতাভুক্ত হতে পারবেন।

এতে বেকার ভাতা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা কর্মসংস্থান না পাওয়া পর্যন্ত ছয় মাসের জন্য (সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত) আর্থিক ভাতা পাবেন। পরে এই মেয়াদ বাড়ানো হতে পারে। এই ভাতা বেকারদের টিকে থাকতে সহায়তা দেবে। এতে তারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন।

কৌশলপত্রে পেনশন তহবিল গঠনের কথা বলা হয়েছে। এর আওতায় বেসরকারি খাতের কর্মচারীদের পেনশন দেওয়ার জন্য একটি তহবিল প্রতিষ্ঠা করা হবে। সেই সঙ্গে পেনশনের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হবে। এক্ষেত্রে বলা হয়েছে, সব নিঃস্ব, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্ত নারী এবং অসহায় প্রবীণদের পেনশনের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হবে।

কৌশলপত্রে বলা হয়, দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চালু করা হবে ই-স্বাস্থ্য কার্ড। এর আওতায় প্রত্যেক নাগরিক একটি ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য কার্ড পাবেন, যার মাধ্যমে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যাবে। পাশাপাশি বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা অব্যাহত থাকবে।

সার্বিক বিষয়ে জিইডির সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন বলেছেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির যে নতুন ধারণা, এগুলো আমরা সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার থেকেই নিয়েছি। এগুলো পরামর্শক কমিটির প্রথম বৈঠকে তুলে ধরা হয়েছে। কারণ এগুলো বাস্তবায়নের রূপরেখা থাকতে হবে তৈরি হতে যাওয়া কৌশলপত্রে।

শুধু তাই নয়, আমরা চেষ্টা করব আরও নতুন কিছু কর্মসূচি যুক্ত করার। তবে সবগুলোর উদ্দেশ্য থাকবে মানুষের প্রকৃত উপকার করা। সেই সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা করা হবে।

এক্ষেত্রে প্রতিটি ইউনিয়নে একটি এবং প্রতিটি নগর ওয়ার্ডে এক বা একাধিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। শুধু তাই নয়, নতুন করে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। যাদের ৮০ শতাংশই হবেন নারী।

বিনামূল্যে ওষুধ ও টিকা দেওয়ার বিষয়ে কৌশলপত্রে বলা হয়েছে, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য দেশব্যাপী বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ এবং মারাত্মক রোগের জন্য স্বল্পমূল্যে ওষুধ দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে ক্যানসার, স্ট্রোক, ডায়াবেটিসসহ জটিল রোগের ওষুধ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিষেবা দিতে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য বাস, ট্রেন ও লঞ্চে বিনামূল্যে যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হবে। এ ছাড়া জেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। পাশাপাশি অসহায় ও অনাথদের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করা হবে। এটির নাম হবে জাতীয় ভরণপোষণ তহবিল। এর অর্থে বিনামূল্যে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা নিশ্চিত করা হবে।

সূত্র জানায়, ২৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মাধ্যমে বর্তমানে প্রায় ১২৩টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চলমান। প্রধান কর্মসূচিগুলো হলো— বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ও মুক্তিযোদ্ধা ভাতা। সব কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৪ কোটি ৯১ লাখ মানুষ নগদ অর্থ ও খাদ্য সহায়তা পাচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ রয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা।