Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও পোস্টার নিষিদ্ধ রাখার পথে হাঁটছে নির্বাচন কমিশন। কাগজের পোস্টারের বদলে সীমিত আকারে নির্দিষ্ট বিলবোর্ড ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে ইসি। পাশাপাশি বাড়তে পারে জামানত, বাতিল হতে পারে অনলাইন মনোনয়ন, আর স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরের শর্তও তুলে দেওয়ার ভাবনা রয়েছে সংস্থাটির। এসব সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে আলোচনা। আর প্রচারের দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি ও বাস্তবতা বিবেচনায় পোস্টার বাতিলের সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। এর মাধ্যমে ভোটের আমেজ হারিয়ে যাবে না তো— শঙ্কা অনেকের।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করতে চায় কমিশন। পরে কয়েক ধাপে উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন শেষ করা হবে। কমিশনের যুক্তি, দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে থাকা স্থানীয় প্রশাসন ও নাগরিক সেবাব্যবস্থা সচল করতে দ্রুত নির্বাচন প্রয়োজন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর স্থানীয় সরকারের বড় অংশ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। জনপ্রতিনিধিদের অনেকে গা-ঢাকা দেওয়ায় নাগরিক সেবা কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনকে গুরুত্ব দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন।

কমিশন জানিয়েছে, এই নির্বাচনের আগে বিধিমালায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসছে। নির্বাচনী প্রচারে কাগজের পোস্টার পুরোপুরি বাতিল হতে পারে। এর পরিবর্তে সীমিত আকারে নির্দিষ্ট আকারের বিলবোর্ড ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে। একই সঙ্গে অনলাইনে মনোনয়ন দাখিল বাতিল হবে। আর স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষরের বিধানটি বাতিলের সিদ্ধান্তও নেওয়া হচ্ছে।

যদিও এসব এখনো চূড়ান্ত নয় বলে আগামীর সময়কে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশার আব্দুর রহমানেল মাছউদ। তিনি বলেছেন, ‘নীতিমালা নিয়ে এখনো কিছু চূড়ান্ত হয়নি। আমরা চূড়ান্ত কিছু করার আগে জনমতের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখছি। সাংবাদিকদের মাধ্যমেই জনগণকে এই পরিবর্তনের কথাগুলো জানাচ্ছি।’

পোস্টার বাতিলের বিষয়ে আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, বড় পরিবর্তন আসছে নির্বাচনী প্রচারে। এবার নির্বাচনে কোনো পোস্টার থাকবে না। পোস্টার একবারে বাদ দেওয়া হবে।

পোস্টারের বিকল্প হিসেবে প্রচারের কৌশল নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমরা সীমিত আকারে বিলবোর্ডের কথা চিন্তা করেছি। নির্বাচনে বিলবোর্ড ব্যবহারের খরচ যেন কম হয়, সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট করে দেওয়া কাঠামোর বাইরে কেউ যেতে পারবেন না। বিলবোর্ডটি আনুভূমিক নাকি উলম্ব হবে, তা স্পষ্ট করে দেওয়া হবে। কারণ, গতবার এই বিলবোর্ডের আকার ও ধরন নিয়ে অনেক ঝামেলা হয়েছিল।’

তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ নিয়ে মতভেদ স্পষ্ট। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘জাতীয় নির্বাচনে যেমন পোস্টারের পরিবর্তে বিলবোর্ড ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও একই কাঠামো অনুসরণ করা হতে পারে। এটি সম্পূর্ণ নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত। আমাদের এ বিষয়গুলো নিয়ে এখনো আলাচোনা হয়নি। তবে কমিশনের এসব সিদ্ধান্ত জনগণ কীভাবে নেয়, সেটাই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিলবোর্ড বা প্রচার সীমিত করার যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেগুলো নীতিগতভাবে থাকলেও বাস্তবে অনেক সময় প্রয়োগ হয় না। তার মতে, বড় বা প্রভাবশালী প্রার্থীরা এসব নিয়ম মানেন না। তাই শুধু বিধি থাকলেই হবে না, সেটি বাস্তবায়নের সক্ষমতাও থাকতে হবে নির্বাচন কমিশনের। জামানত বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেছেন, এটি যৌক্তিক হবে না। কারণ এতে অনেক সাধারণ বা নতুন প্রার্থী নিরুৎসাহিত হতে পারেন।

গণতন্ত্র মঞ্চের নেতা সাইফুল হক মনে করছেন, পোস্টার ও ফেস্টুন স্থানীয় নির্বাচনের দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি। হঠাৎ করে এগুলো পুরোপুরি বাতিল করা বাস্তবসম্মত নয়। একই ধরনের মত দিয়েছেন বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজও। তার মতে, পোস্টারবিহীন নির্বাচন স্থানীয় ভোটের উৎসবমুখর পরিবেশকে দুর্বল করতে পারে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পোস্টারই মূলত প্রচারের সবচেয়ে প্রাণবন্ত অংশ, যা পুরো নির্বাচনী পরিবেশকে উৎসবমুখর করে তোলে। তাই নীতিমালা প্রণয়নে দেশের বাস্তবতা, সংস্কৃতি ও গণমানুষের অংশগ্রহণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

কমিশনের জামানত বাড়ানোর সিদ্ধান্তও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কমিশনের ধারণা, অতিরিক্তসংখ্যক দুর্বল প্রার্থী কমাতে এই পদক্ষেপ প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর আশঙ্কা, এতে সাধারণ বা নতুন প্রার্থীরা নিরুৎসাহিত হবেন।

জামানত বাড়ানোর বিষয়ে সাইফুল হক বলেছেন, জামানত বাড়ানোর পেছনে যদি নির্বাচন কমিশনের কোনো ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য না থাকে, তাহলে এর কোনো যৌক্তিকতা নেই। বর্তমান কাঠামোতে জামানত বাড়ালে প্রকৃত জনপ্রতিনিধিরা শুরুতেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে ছিটকে পড়বেন।

এসব বিষয়ে আলাপ হয়েছে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলীমের সঙ্গে। তিনি বলছেন, পোস্টার নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় নির্বাচনেও একই ধরনের প্রচার সংস্কৃতি গড়ে তোলা দরকার। তবে তিনি মনে করছেন, দলীয় সমর্থন, প্রচার ও নির্বাচনী আচরণবিধি নিয়ে আইনি স্পষ্টতা জরুরি।

আব্দুল আলীম বলেছেন, তফসিল ঘোষণার আগেই রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থী সমর্থন বা প্রচারে কতটা ভূমিকা রাখতে পারবে, সে বিষয়ে বর্তমান আইনে পরিষ্কার কোনো ব্যাখ্যা নেই। এমনকি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ‘দল সমর্থিত প্রার্থী’ বিষয়টিও আইনে সরাসরি উল্লেখ নেই। ফলে নির্বাচন কমিশনকে ভবিষ্যতের জটিলতা এড়াতে আইন ও বিধিমালায় স্পষ্ট ব্যাখ্যা যুক্ত করতে হবে।

জামানতের পরিমাণ বাড়ানোর আলোচনা নিয়েও মত দেন আব্দুল আলীম। তিনি বলেছেন, অর্থের মূল্য কমে যাওয়া এবং অতিরিক্ত সংখ্যক অপ্রতিদ্বন্দ্বী বা দুর্বল প্রার্থীর অংশগ্রহণ কমাতেই হয়তো এমন চিন্তা করা হচ্ছে। কারণ খুব বেশি প্রার্থী হলে ব্যালট পেপার দীর্ঘ হয়ে যায়, যা নির্বাচন পরিচালনাকে জটিল করে তোলে। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তি থাকাটা স্বাভাবিক। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও কিছু ন্যূনতম মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন।

বিধিমালা পরিবর্তনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা হওয়া উচিত কি না— এ প্রশ্নের জবাবে আব্দুল আলীম বলেছেন, কিছু বিষয়ে সংলাপ প্রয়োজন হলেও দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকায় ঐকমত্যে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে। নির্বাচনী বিধিমালা পরিবর্তনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসার খুব একটা প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। কারণ, বড় যে বিষয়টি ছিল, যেমন নির্দলীয় ব্যবস্থা, সেটি সরকার এরই মধ্যে আইনের মাধ্যমে পাস করে ফেলেছে। এর সঙ্গে সংগতি রেখে বিধিমালার পরিবর্তনগুলো মূলত এক ধরনের দাপ্তরিক বা ক্লারিক্যাল কাজের মতো বিষয়।

সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশনের নতুন পরিকল্পনাগুলো প্রশাসনিক দিক থেকে কিছুটা যৌক্তিক মনে হলেও বাস্তবতা ও সংস্কৃতির প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। পোস্টারবিহীন নির্বাচন পরিবেশবান্ধব ও ব্যয়সাশ্রয়ী হতে পারে; কিন্তু গ্রামবাংলার দীর্ঘদিনের নির্বাচনী আবেগ ও অংশগ্রহণের সংস্কৃতি কতটা ধরে রাখতে পারবে— সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ স্থানীয় নির্বাচন শুধু ভোট নয়, এটি দীর্ঘদিন ধরে ছিল মানুষের সামাজিক উৎসবেরও একটি অংশ।