Image description

‘শিশুদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করা ভুল হয়েছে। যার মাশুল জীবন দিয়ে গুনছে শিশুরা।’

সমাজসেবা অধিদপ্তর কর্মকর্তার এমন স্বীকারোক্তিই বলে দেয় সরকারি হেফাজতে কেমন আছে পিতৃ-মাতৃহীন শিশুরা। নতুন আসা শিশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করা এবং হামের প্রাদুর্ভাবকে শুরুতে আমলে না নেওয়ার কারণে আজ বিপন্ন ১৭ শিশুর প্রাণ।

ঢাকা বিভাগের ছোটমণি নিবাসে থাকা ৩৬ শিশুর মধ্যে ১৭ জনই আক্রান্ত হামে। এরই মধ্যে মারা গেছে দুই শিশু। আর হাসপাতালের শয্যায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে আরও তিনজন।

সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত এই ছোটমণি নিবাসে রাখা হয় শূন্য থেকে সাত বছরের পরিত্যক্ত ও পাচারের সময় উদ্ধার হওয়া শিশুদের। গত এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে পুলিশ দুটি শিশুকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে এখানে। নিয়ম অনুযায়ী ভর্তির সঙ্গে সঙ্গে তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও রাখার কথা ছিল আইসোলেশনে। কিন্তু তা করেনি কর্তৃপক্ষ। ফলে কয়েক দিনের মধ্যেই পুরো নিবাসে ছড়িয়ে পড়ে হামের সংক্রমণ।

নিবাসের নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতি সপ্তাহে শিশুদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শে ছয়টি রোগের প্রতিষেধক টিকা দেওয়ার রয়েছে বাধ্যবাধকতা। অথচ মানা হয়নি তা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন একে স্পষ্ট অবহেলা এবং নীতিমালার লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, সরকারি ব্যবস্থায় এমন উদাসীনতা অপরাধ। আক্রান্ত তিন শিশু চিকিৎসাধীন শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, প্রতিটি শিশুই ভুগছে মারাত্মক অপুষ্টিতে। এদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

হাসপাতালের আইসিইউতে ভেন্টিলেশনে আছে ৯ মাসের খুশবু। অন্য বেডে হাড় জিরজিরে শরীর নিয়ে এক বছর চার মাসের সুহা। আরেক শিশু নুহার অবস্থাও স্থিতিশীল নয় পুরোপুরি।

ছোটমণি নিবাসের নাম প্রকাশে অনাগ্রহী এক কর্মকর্তা জানালেন, গত এপ্রিলের ২৩ বা ২৪ তারিখের দিকে পুলিশ দুটি শিশুকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে এখানে। এর কয়েক দিন পরই নিবাসে ছড়িয়ে পড়ে হাম।

ছোটমণি নিবাস ব্যবস্থাপনার রয়েছে স্পষ্ট একটি নীতিমালা। সেখানে বলা আছে, প্রতিটি শিশুকে ভর্তির সঙ্গে সঙ্গেই করতে হবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা। অসুস্থ ও দুর্বল শিশুদের তাৎক্ষণিক সুচিকিৎসার ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতি সপ্তাহে করতে হবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা। এ ছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দিতে হবে ছয়টি রোগের প্রতিষেধক টিকা।

কিন্তু নতুন আসা ওই দুটি শিশুর কোনো স্বাস্থ্য পরীক্ষাই করা হয়নি। এমনকি শুরুতে হামের প্রাদুর্ভাবকেও আমলে নেয়নি কর্তৃপক্ষ। ওই কর্মকর্তা স্বীকার করলেন, ‘শিশুদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করা ভুল হয়েছে। যার মাশুল জীবন দিয়ে গুনছে শিশুরা।’

যথাযথ ব্যবস্থা নিলে নিবাসের শিশুদের মধ্যে হাম এভাবে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ত না বলে মনে করছেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘এই শিশুরা সরকারি ব্যবস্থায় থাকে। তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার কথা। সুষম খাবার দেওয়ার কথা। প্রথমত, যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হলে শিশুদের মধ্যে হাম এভাবে ছড়িয়ে পড়ত না। দ্বিতীয়ত, অপুষ্টিতে না ভুগলে শিশুরা মারা যেত না। কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে স্পষ্ট জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।’

ছোটমণি নিবাসে যা ঘটেছে, তা শিশুদের প্রতি স্পষ্ট অবহেলা ও নীতিমালার লঙ্ঘন বলে মনে করেন মুশতাক হোসেন। তিনি বলেছেন ‘তাদের (শিশুদের) স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। দরকার ছিল নতুন বাচ্চা দুটিকে আইসোলেশনে রাখা। এটিকে সতর্কবার্তা ধরে নিয়ে সরকারের অন্যান্য শিশুনিবাসে এখনই যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কোনো শিশুর জ্বর হলে দ্রুত আইসোলেশনে নিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে হবে।’

এভাবে হাম ছড়িয়ে পড়ার কারণ জানতে চাওয়া হলে কথা বলতে চাইলেন না ছোটমণি নিবাসের উপ-তত্ত্বাবধায়ক জুবলী বেগম রানু। মোবাইল ফোনে তিনি বললেন, ‘আমি এখন কথা বলতে পারছি না, আপনি পরে কল দেন।’ এরপর ফের কল করা হলে আর রিসিভ করেননি।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রতিষ্ঠান শাখার পরিচালক সমীর মল্লিকের ভাষ্য, ছোটমণি নিবাসে এভাবে হাম ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত। তিনি বললেন, ‘এখানে স্বাস্থ্যপরীক্ষা করেই শিশুদের রাখার কথা। তবে এই শিশুদের ক্ষেত্রে কী হয়েছিল, সঠিকভাবে তা বলতে পারছি না।’

ছোটমণি নিবাস ব্যবস্থাপনা নীতিমালার শুরুতেই বলা আছে, জাতিসংঘ ঘোষিত শিশু অধিকার সনদ, দেশের সংবিধান ও জাতীয় শিশু নীতিমালা অনুযায়ী, অন্যান্য শিশুর মতো এসব পরিত্যক্ত শিশুদের সুষ্ঠুভাবে লালনপালন এবং উন্নয়নের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার জন্য সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সমাজসেবা অধিদপ্তর দেশের ছয় বিভাগে ছয়টি ছোটমণি নিবাসে প্রতিপালন করে শিশুদের।

মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে তিন শিশু: ছোটমণি নিবাসের তিন শিশু চিকিৎসাধীন শ্যামলীর শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে। ওয়ার্ডের দায়িত্বরত চিকিৎসকরা বলছেন, প্রতিটি শিশুই মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে। এ ছাড়া নানা শারীরিক জটিলতাও আছে। তিনজনের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। গতকাল রবিবার হামের জন্য বরাদ্দ ২ নম্বর ওয়ার্ডের ২৩ নম্বর বেডে গিয়ে দেখা যায়, এক বছর চার মাসের সুহা শুয়ে আছে। হাড় জিরজিরে শরীর নড়াচড়া করছে না। তবে চোখ দুটো দূর থেকে মায়া ছড়াচ্ছে।

শিশুটি শ্বাসকষ্ট, বুকে সংক্রমণ, যক্ষ্মসহ নানা সমস্যায় ভুগছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। সুহা শারীরিক প্রতিবন্ধীও। মুখে খাবার খেতে পারে না। নল দিয়ে শুধু দুধ দেওয়া হয়। এখানে আসার আগে অন্য একটি হাসপাতালে ৩০ এপ্রিল থেকে ভর্তি ছিল। এই হাসপাতালে নিয়ে আসা হয় ১৩ মে।

নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আছে ৯ মাসের খুশবু। শিশুটি গত ১০ মে থেকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসা নিচ্ছে। এখন ভেন্টিলেশনে। চিকিৎসকরা জানালেন, ১৫ হাজার টাকার করে ৫টি ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। আরও দরকার হতে পারে। তবে শিশুটির অবস্থা ভালো নয়। হামের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ৪৯ নম্বর বেডে চিকিৎসা নেওয়া নুহার অবস্থা আগের চেয়ে উন্নতির দিকে। তবে এখনো স্থিতিশীল নয়।

শিশুদের অপুষ্টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলছেন, সুষম খাবার খেলে শিশুদের পুষ্টি পরিস্থিতি ভালো থাকার কথা। নিবাসের শিশুদের দৈনন্দিন খাবার তালিকা কেমন, সেটি দেখতে হবে। পাশাপাশি শিশুরা ভিটামিন ‘এ’ পেয়েছিল কি না— টিকা দেওয়া হয়েছিল কি না, সেসব বিষয় খতিয়ে দেখা উচিত। সরকারি ব্যবস্থায় শিশুদের প্রতি অবহেলা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

প্রতি মাসে শিশুদের মাথাপিছু ৫ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকে বলে জানিয়েছেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রতিষ্ঠান শাখার পরিচালক সমীর মল্লিক। তিনি বলেছেন, এই বরাদ্দের হিসাবে খাবারের গুণগত মান বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়। খণ্ডকালীন চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শিশুদের স্বাস্থ্যগত বিষয়ে নেওয়া হয় সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. আব্দুল মতিন চৌধুরী বলেছেন, হাসপাতাল থেকে এই শিশুদের বিনামূল্যে বেড বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আইসিইউর প্রাত্যহিক ৬ হাজার টাকাও ছাড় দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি যতটুকু সহযোগিতা করা যায়, তা তারা করছেন।