২০১২ সালের কোনও এক সময়, জীবনের নানা দুঃখ-কষ্ট পেরিয়ে বিধবা কমলা খাতুন নতুন করে সংসার জীবনে পা রাখেন। মাত্র ২২ বছর বয়সে বিপত্নীক আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। দু’জনেরই এটি ছিল দ্বিতীয় বিয়ে। সেই সংসারে জন্ম নেয় তাদের পুত্র সন্তান নোমান।
অন্যদিকে আবুল কালাম আজাদের প্রথম পক্ষের সংসারে ছিল পাঁচ ছেলে, যাদের মধ্যে তিনজন এখন জীবিত। সময়ের সঙ্গে বড় হতে থাকে পরিবারটি। সৎ সন্তান, তাদের স্ত্রী-সন্তান এবং নিজের সন্তানকে নিয়ে কমলা খাতুন ধীরে ধীরে একটি বড় পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন।
প্রায় সাত-আট বছর আগে আবুল কালাম আজাদের মৃত্যু হলে কমলা খাতুন তার একমাত্র ছেলে নোমান এবং সৎ সন্তানদের সঙ্গে একই বাড়িতে বসবাস করছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই বদলে যায় সবকিছু।
২০২৪ সালের ১০ মার্চ, কমলা খাতুনের সৎ ছেলে জিয়াউর রহমান সাগর নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডিতে উল্লেখ করা হয়, আগের দিন ৯ মার্চ থেকে তাদের সৎ মা নিখোঁজ রয়েছেন এবং মোবাইল ফোনেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
খবরটি পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ছুটে আসেন কমলা খাতুনের ছোট বোন রহিমা বেগম। তিনি এসে সৎ ছেলে জিয়াউর রহমান সাগর ও সাইফুল ইসলাম রাজনের কাছে বোনের খোঁজ জানতে চাইলে তারাও জানান, কমলা খাতুনকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে খোঁজ নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তারা জানান, এ ঘটনায় থানায় জিডিও করা হয়েছে।
তবে তাদের কথায় পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারেননি রহিমা বেগম। বোনের হঠাৎ নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তার মনে জন্ম নেয় গভীর সন্দেহ। পুরো ঘটনাতেই তিনি অস্বাভাবিক কিছু আঁচ করতে থাকেন।
অবশেষে নিজেই বাদী হয়ে ২০২৪ সালের ১৪ মার্চ নোয়াখালীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এ একটি পিটিশন মামলা দায়ের করেন। মামলায় সাগর (৩৫), রাজু (৩০), শ্যামলী (৪৫) ও কাজল (৩৮)—এই চারজনকে সন্দেহভাজন বিবাদী করা হয়।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় বিজ্ঞ আদালত প্রথমে নোয়াখালী জেলা গোয়েন্দা শাখাকে (ডিবি) অনুসন্ধানের নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে আরও গভীর ও বিস্তারিত তদন্তের স্বার্থে মামলাটি সিআইডি নোয়াখালীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এরপর শুরু হয় সন্তানসহ এক নিখোঁজ নারীর রহস্য উদ্ঘাটনের দীর্ঘ অনুসন্ধান। প্রায় তিন মাস ধরে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ, গোপন অনুসন্ধান এবং সন্দেহভাজনদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের পর অবশেষে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসে। ২০২৪ সালের ৪ জুন, সিআইডির অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিজ্ঞ আদালত সোনাইমুড়ি থানায় একটি নিয়মিত মামলা রুজুর নির্দেশ দেন।
মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধনী ২০০৩)-এর ৭/৩০ ধারায় রুজু করা হয় এবং তদন্তভার দেওয়া হয় সিআইডিকে।
অনুসন্ধান থেকে অপহরণ মামলা
এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় অপহরণ মামলার তদন্ত কার্যক্রম। তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়েই সিআইডি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়।
তদন্তে জানা যায়, মৃত্যুর আগে আবুল কালাম আজাদ তার দ্বিতীয় স্ত্রী কমলা খাতুন এবং তাদের একমাত্র শিশু সন্তান নোমানের নামে বসতবাড়িসহ সংলগ্ন প্রায় ৩০ শতাংশ জমি লিখে দিয়েছিলেন। বর্তমান বাজারমূল্যে যার মূল্য প্রায় এক কোটি টাকা। এই সম্পত্তিকে কেন্দ্র করেই দীর্ঘদিন ধরে প্রথম সংসারের সন্তানদের সঙ্গে বিরোধ চলছিল।
বিশেষ করে এজাহারভুক্ত অভিযুক্ত জিয়াউর রহমান ওরফে সাগর বিদেশ থেকে দেশে ফিরে সম্পত্তি নিজেদের নামে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য কমলা খাতুনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে একটি জমি বিক্রির অর্থ ভাগাভাগি নিয়েও সৎমা ও সৎ সন্তানদের মধ্যে তীব্র বিরোধের সৃষ্টি হয়।
তদন্তে আরও উঠে আসে, ২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে অভিযুক্তরা কমলা খাতুন ও তার শিশু ছেলে নোমানকে মারধর করেন এবং প্রাণনাশের হুমকি দেন। ওই ঘটনার পর থেকেই মা ও ছেলেকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।
একপর্যায়ে জনৈক এক ব্যক্তির কাছ থেকে কমলা খাতুনের ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোন সিআইডি উদ্ধার করে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, মোবাইল ফোনটি ঢাকার সবুজবাগ এলাকার একটি বাসা থেকে ভাঙারি মালামালের সঙ্গে বিক্রি করা হয়েছিল।
বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে সিআইডি ওই বাসা এবং সেখানে বসবাসকারী ভাড়াটিয়াদের তথ্য বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা শুরু করে। তদন্তে তখন বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। জানা যায়, মামলার এজাহারভুক্ত আসামি সাইফুল ইসলাম ওরফে রাজন ওরফে রাজু একসময় ওই বাসাতেই ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করতেন।
আসামি গ্রেফতার ও খুনের লোমহর্ষক তথ্য
দীর্ঘ তদন্ত ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অবশেষে মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসে। সিআইডি নোয়াখালীর একটি চৌকস আভিযানিক দল, এলআইসি সিআইডির সহায়তায়, গোপন তথ্য ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের ২১ মে রাতে ময়মনসিংহের কোতোয়ালী থানার ভাটিকাশর এলাকা থেকে এজাহারভুক্ত আসামি সাইফুল ইসলাম ওরফে রাজন ওরফে রাজুকে (৪০) গ্রেফতার করে।
এরপর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরদিন ২২ মে সন্ধ্যায় সোনাইমুড়ী জিরো পয়েন্ট এলাকা থেকে আরও দুইজনকে আটক করা হয়। তারা হলেন—এজাহারভুক্ত আসামি জিয়াউর রহমান ওরফে সাগর (৪৫) এবং তদন্তে উঠে আসা সহযোগী অভিযুক্ত আশিকুর রহমান টিপু (৩২)।
পরবর্তীতে আদালতের অনুমতিতে তিন দিনের রিমান্ডে এনে তাদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে এক ভয়াবহ ও শিউরে ওঠার মতো হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা।
জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্তরা স্বীকার করেন, সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে ঘটনার প্রায় ১৫ দিন আগেই তারা হত্যার পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাড়ির পাশের পুকুরপাড়ে আগেই একটি গর্ত খুঁড়ে রাখা হয়, যাতে হত্যার পর লাশ গোপনে মাটিচাপা দেওয়া যায়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ মার্চ রাতে কমলা খাতুন ও তার শিশু ছেলে নোমানের খাবারের পানির সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেওয়া হয়। গভীর রাতে তারা অচেতন হয়ে পড়লে অভিযুক্তরা ঘরে প্রবেশ করেন।
এরপর গলায় গামছা পেঁচিয়ে, হাত দিয়ে গলা চেপে এবং বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে মা ও শিশুপুত্রকে হত্যা করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর অপরাধের কোনও আলামত যাতে না থাকে, সেজন্য ভিকটিমদের পরনের কাপড় খুলে ফেলে পূর্বপ্রস্তুত গর্তে লাশ দুটি পুঁতে রাখা হয়। ব্যবহৃত গামছা ও পরিধেয় কাপড় আগুনে পুড়িয়ে আলামত নষ্ট করারও চেষ্টা চালানো হয়।
পুকুর সেচে উদ্ধার হয় দেহাবশেষ
গ্রেফতার আসামিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত রবিবার (২৪ মে) সকালে সিআইডির একটি দল স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গ্রাম পুলিশ ও এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে সন্দেহভাজন পুকুরে অভিযান চালায়। পুকুর সেচ এবং ভেকুর সাহায্যে খননকাজ পরিচালনার একপর্যায়ে লুকিয়ে রাখা দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়।
পরে ভিকটিম কমলা খাতুন ও শিশু নোমানের দেহাবশেষ শনাক্ত করা হয়। উদ্ধারকৃত দেহাবশেষের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে ময়নাতদন্তের জন্য নোয়াখালী সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। আইনানুগ প্রক্রিয়া শেষে দেহাবশেষ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি
গ্রেফতার হওয়া তিন অভিযুক্ত আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
এদিকে, উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষ থেকে সংগৃহীত নমুনা ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পরীক্ষাগারে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে সিআইডি নোয়াখালী ইউনিট। এ ঘটনায় জড়িত অন্য সদস্যদের শনাক্ত, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ রহস্য উদ্ঘাটন এবং বাকি অভিযুক্তদের গ্রেফতারের লক্ষ্যে সিআইডির তদন্ত ও অভিযান এখনও অব্যাহত রয়েছে।