Image description

মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, মূল পদ স্থপতি। যদিও এই পদেও নিয়োগের বৈধতা নেই। প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা-অভিজ্ঞতা ছাড়াই এই পদে চাকরি নিয়েছেন তিনি। পরবর্তীতে এই পদের অতিরিক্ত হিসেবে একই সঙ্গে সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ পদও অবৈধভাবে দখল করে রেখেছেন। তাও দু’একদিন বা দু’এক মাস নয়- দীর্ঘ ২২ বছর। যদিও এই পদে দায়িত্ব পালনের মতো যোগ্যতা নেই মোটেই। সিটি কর্পোরেশনের স্থপতি পদ ৬ষ্ঠ গ্রেডের, অন্যদিকে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ ৪র্থ গ্রেডের। সরকারের বিধি-বিধান অনুযায়ী ৬ষ্ঠ গ্রেডের কোনো কর্মকর্তাকে ৪র্থ গ্রেডের পদের দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ নেই। তারপরও সিরাজুল ইসলাম উপরের মহলে প্রভাব খাটিয়ে ও ঘুষ লেনদেন করে অবৈধভাবে এই পদটি দীর্ঘকাল ধরে দখল করে রেখেছেন। অবাক ব্যাপার হলো, ২০১১ সালে সিটি কর্পোরেশেন ভাগ হওয়ার পর ডিএসসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ পদে দায়িত্ব পালনের লিখিত কোনো আদেশ বা নথিতে অনুমোদন নেই। তৎকালীন মেয়রের মৌখিক নির্দেশে তিনি এই পদে বহাল থেকেছেন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক তদন্তে এসব ভয়াবহ অনিয়মের ঘটনা প্রমাণিত হয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনে দায়ের করা এক অভিযোগ এবং কমিশনের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে এ তদন্ত কার্যটি পরিচালিত হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্মসচিব ড. মো. মনিরুল ইসলাম এটি তদন্ত করেন। গত ৭ মে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন তিনি। তদন্ত প্রতিবেদনের মতামত বা সুপারিশ কলামে বলা হয়েছে, “প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে দায়িত্ব প্রদান সংক্রান্ত বিষয়টি বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়েছে। সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ‘স্থপতি’ পদের কর্মকর্তাকে ‘প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ’ পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদানে বিদ্যমান বিধি-বিধানের ব্যত্যয় ঘটেছে। এছাড়া মৌখিক আদেশে প্রদত্ত অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের সুযোগ নেই।”

মো. সিরাজুল ইসলামের মূল যে পদ- “স্থপতি”, আদতে এই পদে চাকরিতে প্রবেশের যোগ্যতা-অভিজ্ঞতাও তার নেই। তিনি যখন এই পদে চাকরিতে প্রবেশ করেন তাতে চাওয়া হয়েছিল ন্যূনতম স্নাতক এবং ‘স্থপতি’ পদে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা। এর কোনোটিই তার ছিল না। তিনি সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি ডিপ্লোমা ডিগ্রি দাখিল করেন চাকরিতে ইন্টারভিউয়ের যোগ্যতা হিসেবে, যদিও এটি মোটেই গ্রহণযোগ্য ছিল না। কারণ, সোভিয়েত ইউনিয়নের এই “ডিপ্লোমা” সার্টিফিকেট বাংলাদেশের “স্নাতক ডিগ্রি”র সমতূল্য কিনা- এ ব্যাপারে বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মতামত নেওয়াটা অপরিহার্য ছিল। কিন্তু সিরাজুল ইসলাম তা নেননি বা চাকরির আবেদনের সময় জমা দেননি। শিক্ষাগত যোগ্যতার এই সার্টিফিকেট সম্পর্কে ড. মো. মনিরুল ইসলামের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের স্থপতি ও প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ (অ. দা.) মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম-এর স্থাপত্য বিদ্যায় স্নাতক অর্জন সংক্রান্ত ডিগ্রীর সমতাকরণ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সার্টিফিকেটমূলে করা উচিত ছিল। তবে, সমতাকরণ সম্পর্কিত দাখিলকৃত চৎড়ঃড়পধষ (প্রটোকল) এর বৈধতার বিষয়টি নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ যথাযথ প্রক্রিয়ায় যাচাই করতে পারে।”

ছাত্রলীগ পরিচয়ে অবৈধভাবে সিটি কর্পোরেশনের চাকরিতে প্রবেশ

সিরাজুল ইসলাম চাকরিতে প্রবেশ করেন আওয়ামী লীগের আগের আমলে ১৯৯৭ সালে। ওই সময় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত তফসিল এবং চাকরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনে ‘স্থপতি’ পদে নিয়োগের জন্য যেসব শর্ত দেওয়া হয় তাতে বলা হয়েছে, কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্য বিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি প্রাপ্ত হতে হবে। এবং কোনো সরকারি বা আধা সরকারি/বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নগর স্থাপত্য বিষয়ক কাজে কমপক্ষে ৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনায় অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে। কিন্তু সিরাজুল ইসলামের এ ধরণের কোনো যোগ্যতাই ছিলো না। তিনি কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্য বিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রিধারী নন। এমনকি সমমানের ডিগ্রিও তার নেই, যদিও সমমানের ডিগ্রির কথা চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়নি। অর্থাৎ এক্ষেত্রে ‘সমমান’ গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো সরকারি, আধা সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নগর স্থাপত্য বিষয়ক কাজে কখনো নিযুক্তও ছিলেন না তিনি। অর্থাৎ এ সংক্রান্ত অভিজ্ঞতাও তার ছিল না। ৩০ জুন, ১৯৯৪ সালে ইউক্রেনের একটি ইনস্টিটিউট হতে রাশান ভাষায় ডিপ্লোমা প্রাপ্ত একটি সনদ দিয়ে চাকরি নেন তিনি। যেটি স্থপতি পদে চাকরিতে নিয়োগের শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্তের সাথে কোনোই মিল ছিল না। এছাড়া স্থপতি পদে নিয়োগের জন্য কমপক্ষে ৫ বছরের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়। কিন্তু দেখা গেছে সেটাও মানা হয়নি। মানার সুযোগও ছিল না। কারণ সিরাজুল ইসলাম ৩০ জুন, ১৯৯৪ সালে ডিপ্লোমা পাস করেন। এবং ২২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ তারিখে স্থপতি পদে চাকরিতে যোগদান করেন। অর্থাৎ ডিপ্লোমা পাসের মাত্র সাড়ে ৩ বছরের মাথায় তার চাকরি হয়েছে। আর এ থেকে পরিষ্কার যে, স্থপতি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো শর্তই তিনি পূরণ করেননি। এ ব্যাপারে বৈধতা যাচাই করার কোনো প্রয়োজন বোধ করেননি তৎকালীন সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষও- একেতো ‘ছাত্রলীগ নেতা’ তার উপর আবার মোটা অংকের ঘুষ লেনদেনের কারণে।

প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ পদে অতিরিক্ত দায়িত্বে যেভাবে একনাগাড়ে ২২ বছর

২০০৪ সালে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের তখনকার প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের মৃত্যু হয়। আর এই সুযোগেই সিরাজুল ইসলাম বনে যান প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ। অন্য কোনো বিকল্প না থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে সিরাজুল ইসলামকে এই পদের অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করা হয়। ‘সাময়িক সময়’র কথা বলে তাকে এ পদের দায়িত্ব দেয়া হয় তখন। সেই থেকে এখন পর্যন্ত তিনি অতিরিক্ত দায়িত্বে এই পদে বহালই আছেন। এ ধরনের অতিরিক্ত দায়িত্বের ক্ষেত্রে ‘সাময়িক সময়’ বলতে সাধারণত দু’তিন মাস বুঝায়। অথচ সেই ‘সাময়িক সময়’ দীর্ঘ ২২ বছরেও শেষ হয়নি। প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ পদটি সিটি কর্পোরেশনের জন্য নিঃন্দেহেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পদে যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মকর্তা কাউকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারিরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু, শিক্ষাগত যোগ্যতা-অভিজ্ঞতা না থাকলেও অপকর্মে পটু ‘ধুর্ত’ সিরাজুল ইসলাম নানা কৌশলে সেই উদ্যোগ থামিয়ে দেন। এরপর যতবারই প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ পদে নিয়োগর জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে প্রত্যেকবারই উপরের মহলকে ম্যানেজ করে কোনো না কোনোভাবে তা আটকে দিয়েছেন তিনি।

২০১১ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশন দুই ভাগে বিভক্ত হয়- ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। কিন্তু বিভক্ত হওয়ার পর ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নতুন প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ নিয়োগ দিলেও ঢাকা দক্ষিণ সিটি এই পদে কোনো নতুন লোক নিয়োগ দেয়নি। দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ পদে অযোগ্য-দুর্নীতিগ্রস্ত সিরাজুল ইসলামই থেকে যান মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে। তবে এই সময় থেকে তিনি কিসের বলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ পদে আছেন এ ব্যাপারে নথিপত্রে কোনো রেকর্ড বা অনুমোদন নেই। সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য কোনো অফিস আদেশও নেই। অবশ্য এর আগে ২০০৪ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত এই পদে দায়িত্ব পালনেও কোনো বৈধতা ছিল না, যেহেতু সরকারের বিধি-বিধানে এ ধরনের (৬ষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তাকে ৪র্থ গ্রেডের দায়িত্ব) দায়িত্ব প্রদানের সুযোগ নেই। এরপরে ২০১১ সাল থেকে দায়িত্ব পালনের বিষয়ে বৈধ-অবৈধ কোনো কাগজপত্রই নেই তার হাতে।

ডিগ্রি নেই, তবুও একসঙ্গে পাঁচ শীর্ষ পদের দায়িত্বে ডিএসসিসির এই ভুয়া কর্তকর্তা

শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতা নেই তারপরও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে স্থপতি পদে নিয়োগ বাগিয়ে নেওয়া, এরপরে অবৈধভাবে দীর্ঘ ২২ বছর অতিরিক্ত দায়িত্বে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ পদে বহাল থাকার পাশাপাশি বিগত সময়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে ডিএসসিসির অধীন বিভিন্ন প্রকল্পের পরিচালকের পদও একই সঙ্গে দখল করেন ঊর্ধ্বতন মহলকে ম্যানেজ করে। এসব প্রকল্পে ব্যাপকহারে লুটপাট চালান। আর এই লুটপাটের অর্থে শীর্ষ ব্যক্তিদের ম্যানেজ করে পদে বহাল থাকার কৌশল অবলম্বন করেন। ফ্যাসিস্ট মেয়র সাঈদ খোকন এবং ফজলে নূর তাপস- উভয়ই ছিলেন এই ভুয়া কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলামের হাতের মুঠোয়। নানা অবৈধ পন্থায় তাদেরকে কাড়ি কাড়ি টাকা আয় করে দিতেন সিরাজুল।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও উন্নয়নের জন্য যথাযথ দক্ষ-অভিজ্ঞ লোকের প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রকৌশল, স্থপতি, নগর পরিকল্পনাবিদ এসবের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে যথাযথ যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা সম্পন্ন লোক ছাড়া চিন্তাই করা যায় না। এমনিতেই ডিএসসিসির বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অবস্থা খুবই নাজুক। উন্নয়নের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন। তার ওপর এরকম অযোগ্য লোক সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে এতকাল জোর করে বহাল থাকায় নগর উন্নয়ন ব্যাহত হয়েছে মারাত্মকভাবে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, যথেষ্ট যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকার পরও অনেকেই সিটি করপোরেশনের প্রকল্প পরিচালনার অতিরিক্ত দায়িত্ব পাননি। অথচ কোনো ধরনের যোগ্যতা না থাকার পরও, এমনকি যার মূল চাকরিই ভুয়া তাকেই আওয়ামী আমলে দেয়া হয়েছে সিটি করপোরেশনের ৩টি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব। এছাড়া অতিরিক্ত দায়িত্বে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ পদে তো ছিলেনই। অর্থাৎ ‘স্থপতি’ পদের অতিরিক্ত হিসেবে একই সঙ্গে তিনি আরও চারটি শীর্ষ পদের দায়িত্বে ছিলেন। যদিও সরকারের এ সংক্রান্ত আইন ও বিধি-বিধানে বলা আছে, একজন কর্মকর্তা একটি প্রকল্পের দায়িত্বে থাকবেন। তবে বিশেষ প্রয়োজনে একজনকে সর্বোচ্চ দুই প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু তাকে অবশ্যই যথেষ্ট যোগ্য ও অভিজ্ঞ হতে হবে।

অথচ ডিএসসিসির অযোগ্য-অনভিজ্ঞ এই স্থপতি সিরাজুল ইসলামকে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের অতিরিক্ত দায়িত্ব ছাড়াও আওয়ামী আমলে একই সঙ্গে বড় ৩টি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ঢাকা সিটি নিবারহুড আপগ্রেডিং প্রজেক্ট (ডিসিএনইউপি) নামে ৮৫০ কোটি টাকার প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয় ২৩ জুলাই, ২০১৯ইং। ওই সময় তিনি ১২৫ কোটি টাকার নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেইস) প্রকল্পটিরও পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। এরপর তাকে দেয়া হয় ঢাকা নগর মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব। নিয়ম অনুযায়ী কোনো বড় প্রকল্পের দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষেত্রে আগে ছোট ছোট প্রকল্পের দায়িত্ব পালন করতে হয়। কিন্তু এ ভুয়া স্থপতি এর আগে কোনো প্রকল্পের দায়িত্ব পালন করেননি। তৎকালীন মেয়রসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বড় অংকের ঘুষের বিনিময়ে তিনি এসব প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব বাগিয়ে নেন। এবং প্রকল্পগুলোতে ব্যাপকহারে লুটপাট চালান।

জানা যায়, দুদকের তদন্তে সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে মহাপরিকল্পনা তৈরির নামে ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা, ট্রাফিক সিগনাল স্থাপনের ৩৮ কোটি টাকা আত্মসাতসহ অনেক অপকর্মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। কিন্তু তারপরও তার বিরুদ্ধে কোনোই ব্যবস্থা নেয়নি সিটি কর্পোরেশন। দুদকের এসব তদন্তও তিনি বড় অংকের অর্থে ধামাচাপা দিয়ে রাখেন।

তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণে যা উঠে এসেছে

তদন্ত কর্মকর্তা, স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্মসচিব মো. মনিরুল ইসলাম তার প্রতিবেদনে বলেন, “ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম এর যোগদানের কাগজপত্র, সনদপত্র এবং অভিজ্ঞতার কাগজপত্র যাচাই-বাচাই করা হয়। বর্ণিত কর্মকর্তা ২৮.০৬.১৯৯২ তারিখে রাশিয়া (সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন) থেকে স্থাপত্য বিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রী অর্জনের সার্টিফিকেট শুনানিকালে উপস্থাপন করেন এবং তিনি দাবি করেন বাংলাদেশ সরকার ও রাশিয়ার মধ্যে সম্পাদিত প্রটোকল অনুযায়ী নিয়োগ বোর্ড কর্তৃক তার সনদ যাচাই করা হয়েছে।”
“মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলামকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে ২২.১২.১৯৯৭ খ্রি. তারিখের ৫৭৭ সংখ্যক স্মারকমূলে স্থপতি পদে (৬ষ্ঠ গ্রেড) নিয়োগ প্রদান করা হয়। তিনি রাশিয়া (সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন) হতে স্থাপত্য বিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন এবং এ সংক্রান্ত সনদপত্র বাংলাদেশ ঊসনধংংু হতে সত্যায়নকৃত মর্মে দেখানো হয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বর্ণিত কর্মকর্তার সনদপত্র, অভিজ্ঞতা ও অন্যান্য কাগজপত্র যাচাই-বাচাই করে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে মর্মে তিনি উল্লেখ করেন। বর্ণিত অভিজ্ঞতার বিবরণী বিবাদীর জীবন বৃত্তান্ত (ঈঠ)-তে উল্লেখ থাকলেও ডেভেলপমেন্ট ডিজাইন কনসালটেন্ট এর অভিজ্ঞতার সনদ ছাড়া আর কোন সনদ নথিতে পাওয়া যায়নি। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কর্তৃক ডিগ্রী সমতাকরণের কোন কাগজপত্র উপস্থাপন করা হয়নি। যদিও তিনি সমতাকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে সম্পাদিত প্রটোকল উপস্থাপন করেছেন।”

“অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ১৮ এপ্রিল ২০২৩ তারিখের

০৫.০০.০০০০.১৭০.১১.০১৭. ২১- ৯৭ নম্বর প্রজ্ঞাপনমূলে মন্ত্রণালয়/বিভাগ এবং এর অধীন সরকারি দপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং বিভিন্ন কর্পোরেশনের শূন্য পদে চলতি দায়িত্ব ও অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান নীতিমালা ২০২৩ এ অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্থ, সাময়িকভাবে কোনো সরকারি কর্মচারীকে তাহার মূল পদের/গ্রেডের সমপদে/সমগ্রেডের কিংবা ক্ষেত্রমত, নিম্নপদে নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত অন্য কোন শূন্যপদে দায়িত্ব প্রদান।”

“বর্ণিত কর্মকর্তাকে যখন অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করা হয়, তখন তিনি ৬ষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা ছিলেন। এ ক্ষেত্রে ৬ষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তাকে ৪র্থ গ্রেডের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদানের ১৮.১০.২০০৪ তারিখে জারিকৃত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের আদেশে বিদ্যমান বিধি-বিধান অনুসরণ করা হয়নি মর্মে পরিলক্ষিত হয়েছে। এছাড়া ২০১১ তারিখে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন বিভক্ত হওয়ার পর অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার প্রয়োজন হলে নতুনভাবে দায়িত্ব দেওয়া যেত মর্মে প্রতীয়মান হয়। আবার ২০১১ সালের ২০ নভেম্বর নগর পরিকল্পনাবিদ নিয়োগ দেয়ার পর তখনকার বিধিমালা অনুযায়ী এক ধাপ নিচের লাইন পদের কর্মকর্তাকে নিয়োগ প্রদান করা সমীচীন ছিল। এক্ষেত্রে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ প্রশাসনিক শৃঙ্খলার স্বার্থে যথাসময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে মুন্সিয়ানার পরিচয় দেয়নি মর্মে প্রতীয়মান হয়।”

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রতিনিধির বক্তব্য গ্রহণ প্রসঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, “জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলামকে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ এর অতিরিক্তি দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের তৎকালীন মেয়র মহোদয়ের মৌখিক নির্দেশে দেওয়া হয়।”

শীর্ষনিউজ