Image description

একই ট্রাকে গরু ও ছাগল একসঙ্গে বহন করা যাবে না। প্রতিটি পশুর ডানে-বাঁয়ে অন্তত ১৫ সেন্টিমিটার এবং সামনে-পেছনে ৩০ সেন্টিমিটার ফাঁকা রাখা বাধ্যতামূলক। এমনকি টানা তিন ঘণ্টা বা ১০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার পর কোনো পরিচ্ছন্ন ও ছায়াযুক্ত স্থানে পশুকে আধা ঘণ্টার মতো বিশ্রাম নিতে দিতে হবে। গবাদিপশু পরিবহনে দেশের আইনে এমন সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এসব লঙ্ঘন করলে রয়েছে জেল-জরিমানার বিধানও।

কোরবানির ঈদ সামনে রেখে সারা দেশে এখন পশুবাহী ট্রাকের ব্যস্ততা। এক জেলা থেকে অন্য জেলায় গরু, মহিষ, ছাগল নিয়ে ছুটছেন ব্যবসায়ীরা। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, বিপুলসংখ্যক পশু পরিবহনে ট্রাক বা নৌকা হাটের দিকে যখন ছুটছে, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে আইন মানা হচ্ছে না।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যে, এবার দেশে কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি। বিপরীতে সম্ভাব্য চাহিদা ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার। অর্থাৎ এবার বেশি ২২ লাখ ২৭ হাজার গবাদিপশু। এই বিপুলসংখ্যক পশু পরিবহনের ক্ষেত্রে ট্রাকের গাদাগাদি এড়ানো এবং পশুর ওপর নিষ্ঠুরতা বন্ধে ‘পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা, ২০২১’ এবং ‘প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯’-এ স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

গাড়িতে পশুকে দিতে হবে পর্যাপ্ত জায়গা

আইন অনুযায়ী, একটি ট্রাকে যে কয়টি পশু ধরার কথা, সেখানে ঠাসাঠাসি করে বাড়তি পশু তোলা দণ্ডনীয় অপরাধ। বিধিমালা অনুযায়ী, ট্রাকে ওঠানোর আগে পশুকে অবশ্যই পর্যাপ্ত খাবার ও পানি দিতে হবে। প্রতিটি পশুর দেহের চওড়ার তুলনায় উভয় পাশে অন্তত ১৫ সেন্টিমিটার এবং মাথা ও লেজের গোড়া থেকে অন্তত ৩০ সেন্টিমিটার ফাঁকা জায়গা রাখতে হবে, যাতে তারা সহজে শ্বাস নিতে পারে। টানা ১০০ কিলোমিটার বা ৩ ঘণ্টার বেশি যাতায়াতের পথ হলে বিরতি করা বাধ্যতামূলক। এছাড়া পশুবাহী যানবাহনের চালকের কাছে একটি তথ্য কার্ড থাকতে হবে, যেখানে মালিকের নাম-ঠিকানা ছাড়াও পশুর সংখ্যা এবং গন্তব্য লেখা থাকবে।

পশুর কষ্ট লাঘবে পরিবহনের জন্য আরও কিছু নিয়ম রয়েছে। যেমন– ট্রাকে ওঠানো বা নামানোর সময় অবশ্যই র‍্যাম্প বা ঢালু পাটাতন ব্যবহার করতে হবে। পশুকে লাফ দিতে বাধ্য করা বা টেনেহিঁচড়ে নামানো যাবে না। পশুবাহী ট্রাকের মেঝে হতে হবে সমতল ও অমসৃণ, যাতে পিছলে না যায়। মেঝেতে বড় কোনো ছিদ্র থাকা যাবে না। এছাড়া একই ট্রাকে ভিন্ন প্রজাতির পশু একসঙ্গে পরিবহন নিষিদ্ধ।

নিষ্ঠুর আচরণে জেল-জরিমানা

প্রাণিকল্যাণ আইন অনুযায়ী, পশুকে অমানবিক অবস্থায় রাখা ‘অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুরতা’ হিসেবে গণ্য। আইনের ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, পশুকে এমনভাবে পরিবহন করা বা বেঁধে রাখতে হবে, যাতে পশুটি স্বাভাবিকভাবে দাঁড়াতে, বসতে বা শুতে পারে। এর ব্যতয় অপরাধ। একইভাবে জখম বা অসুস্থ পশুকে চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে বিক্রির জন্য হাটে আনা বা পরিবহন করাও আইনের লঙ্ঘন।

আইনের ১৬ ধারা অনুযায়ী, পশুর প্রতি এমন নিষ্ঠুর আচরণের অপরাধ প্রমাণিত হলে অনধিক ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। একই অপরাধ পুনরায় করলে শাস্তির মাত্রা বেড়ে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।

জবাইয়ের ক্ষেত্রেও কঠোর বিধি

শুধু পরিবহন নয়, পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রেও এই বিধিমালা বেশ কিছু মানবিক ও স্বাস্থ্যকর নিয়ম বেঁধে দিয়েছে। বিধিমালার ৩ নম্বরে বলা হয়েছে, কোনো অবস্থাতেই এক পশুর সামনে অন্য পশু জবাই করা যাবে না। জবাই করার আগে পশুকে অন্তত ৬ ঘণ্টা পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে। যদি কোনো পশু উত্তেজিত হয়ে পড়ে, তাকে শান্ত না করে জবাই করা যাবে না।

এমনকি জবাই করার পর পশুর মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার আগে কোনোভাবেই চামড়া ছাড়ানো বা অঙ্গহানি করা যাবে না। এছাড়া জবাই করার ২৪ ঘণ্টা আগে একজন প্রাণিচিকিৎসক দিয়ে পশুর স্বাস্থ্যপরীক্ষা করানো বাধ্যতামূলক।

হাটেও মানতে হবে আইন

শুধু পথেই নয়, হাটেও পশুর যত্নে আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। রোদ-বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে পশুকে ছাউনির নিচে রাখা এবং পর্যাপ্ত খাবার ও পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ইজারাদারসহ সংশ্লিষ্টদের। অসুস্থ, গর্ভবতী বা চলাচলে অক্ষম পশুকে কোনোভাবেই হাটে কেনাবেচার জন্য আনা যাবে না।