তুমি কই থাকবা? প্রশ্নে শামসুন্নাহারের জবাব— ‘দেহি, ভালা না লাগলে দেশ ছাইড়া যামু গা’। কোন দেশে যাইবা? শামসুন্নাহার বলল— ‘জানি না’। শামসুন্নাহার যুদ্ধশিশু। হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার সুলতানপুর গ্রামের গেজেটভুক্ত বীরাঙ্গনা মাজেদা বেগমের কন্যা। মায়ের সম্ভ্রম হারানোর বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীন বাংলাদেশে নিরাপদ জীবন হয়নি তার।
কেবল শামসুন্নাহার নয়, সদ্যপ্রয়াত বীরাঙ্গনা টেপরী বর্মণের ছেলে সুধীর বর্মণকেও সহ্য করতে হচ্ছে সমাজের অবহেলা আর বঞ্চনা। এমন হাজারো যুদ্ধশিশুর কথা স্বাধীন বাংলাদেশ কতটা মনে রেখেছে? সে প্রশ্ন সামনে হাজির করেছে শবনম ফেরদৌসী পরিচালিত প্রামাণ্যচিত্র ‘জন্মসাথী’।
১৯৭১ সালের এপ্রিলের শেষ দিকে টেপরী বর্মণের বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। চারদিকে তখন যুদ্ধের ভয়াবহতা। এ অবস্থায় পরিবারের সদস্যরা ছিলেন মৃত্যুর আতঙ্কে। তখন স্থানীয় একজন রাজাকার টেপরীকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে তুলে দিয়ে পরিবারের সদস্যদের প্রাণ রক্ষার কথা বললেন। রাজাকারের কথায় অসহায় মধুদাস নিজের মেয়েকে পাকিস্তানি সেনাক্যাম্পে তুলে দিতে বাধ্য হন। এরপর টানা সাত মাস পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হন টেপরী বর্মণ।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় বাড়ি ফেরেন তিনি। কিন্তু স্বাধীনতার পরও সমাজ তাকে আপন করে নেয়নি। অনাগত সন্তানকে নষ্ট করে ফেলার জন্য নানা চাপ আসে চারদিক থেকে। তখন মেয়ের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ান তার বাবা। তিনি বলেছিলেন, ‘এই সন্তানই হবে তোর বেঁচে থাকার অবলম্বন।’ পরে জন্ম হয় ছেলে সুধীর বর্মণের। কিন্তু সমাজের কটূক্তি পিছু ছাড়েনি তাদের। ছোটবেলা থেকেই সুধীরকে ‘পাঞ্জাবির বাচ্চা’ বলে অপমান করা হতো। বর্তমানে তিনি পেশায় একজন ভ্যানচালক।
আগামীর সময়
গত ১২ মে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন বীরাঙ্গনা টেপরী বর্মণ। তাকে স্মরণ করে গত শুক্রবার ঢাকার আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে প্রদর্শিত হয়েছে শবনম ফেরদৌসী নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘জন্মসাথী’। চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর পর মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক, অধিকারকর্মী শিরিন পারভিন হক প্রমুখ।
১৯৭১: যুদ্ধশিশু কত?
প্রামাণ্যচিত্রের শুরুতেই ধারাবর্ণনায় বলা হয়, বাংলাদেশে যুদ্ধশিশু কত, তার সঠিক সংখ্যা আজও জানা যায়নি। তা হতে পারে ১০ হাজার, ২০ হাজার কিংবা ৫০ হাজার বা তারও বেশি। আনুমানিক আড়াই লাখ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, এর মধ্যে কতটি যুদ্ধশিশুর জন্ম হয়েছে। সে প্রশ্নের উত্তর মেলে না।
তবে বিভিন্ন সূত্রে ৮১ হাজার যুদ্ধশিশুর কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে সংখ্যাটি আরও বেশি বলে মুক্ত আলোচনায় উঠে আসে।
অস্ট্রেলীয় চিকিৎসক ড. জিওফ্রে ডেভিস যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে নির্যাতিত নারীদের সহায়তা করার জন্য এসেছিলেন। তিনি ১৯৭২ সালের মার্চ থেকে ছয় সপ্তাহ ছিলেন। তার বরাত দিয়ে নির্মাতা শবনম ফেরদৌসী বললেন, ‘তিনি ৮১ হাজার যুদ্ধশিশুর কথা বলেছেন; কিন্তু বাস্তবে সে সংখ্যা আরও বেশি। কারণ যুদ্ধের পর অনেক ধর্ষিত নারী লোকলজ্জার ভয়ে পরিচয় লুকিয়ে ফেলেছেন। কেউ কেউ দেশ ছেড়ে গেছেন। অন্তত তিন থেকে চার হাজার যুদ্ধশিশুকে কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের লোকেরা দত্তক নিয়েছেন।’
গবেষক মফিদুল হক বললেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পর নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসনের জন্য কাজ শুরু হয়েছিল। কিন্তু পরে তা থেমে যায়। সামাজিকভাবে আমরা তাদের সম্মানটা দিতে পারিনি। সমাজের ব্যাধিগুলোকে আমরা চিহ্নিত করিনি, নিন্দিত করিনি। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি।’
‘জন্মসাথী’ প্রামাণ্যচিত্রে উঠে এসেছে কানাডাপ্রবাসী মনোয়ারা ক্লার্কের কথা, যিনি কয়েক বছর আগে বাংলাদেশে এসেছিলেন পিতৃপরিচয়ের খোঁজে। মফিদুল হক বললেন, ‘মনোয়ারা ক্লার্কের কথা অনেকে জানি। বিদেশে গিয়েও তার জীবনটা কিন্তু খুব সুখী ছিল না। আমরা প্রায়ই কিন্তু দেখি বিদেশ থেকে অনেকে আসছেন, তাদের জন্ম পরিচয়ের খোঁজে। রাষ্ট্রীয়ভাবে আমরা সেই যুদ্ধশিশুদের সম্মানটা দিতে পারিনি।’
আগামীর সময়
তিন প্রজন্ম বয়ে চলেছে অবহেলা
টেপরী বর্মণের গর্ভে জন্ম নেওয়া সুধীর বর্মণ নন কেবল, তার মেয়ে জনতা বর্মণকেও নানা বঞ্চনা সহ্য করতে হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশে। সুধীর বর্মণ বলেছেন, তাকে প্রায়ই শুনতে হয় ‘পাঞ্জাবির ছেলে’। তার মেয়ে জনতা বর্মণকেও এমন কটুকথা শুনতে হয়।
সুধীর-শামসুন্নাহারদের মতো যুদ্ধশিশুরা কটুকথা শুনে প্রতিবাদ করে না, শুধু অপলক তাকিয়ে থাকে। শামসুন্নাহারের ভাষায়, ‘আমি হাইস্যা ফালাই দেই। মনে কুস্তা করি না।’
আর সুধীর বর্মণের ভাষ্য, ‘আমি মুসলমান না হিন্দু? জানি না। হিন্দুধর্মই পালন করি। তয় মানুষ যখন ‘পাঞ্জাবির ছেলে’ কয়, খারাপ লাগে।’
নির্মাতা শবনম ফেরদৌসীর জন্ম ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে ঢাকার রেড ক্রস হাসপাতালে (বর্তমান হলি ফ্যামিলি)। যেদিন শবনমের জন্ম হয়েছিল, সেদিন ওই হাসপাতালে মোট ১৩ শিশুর জন্ম হয়েছিল। এর মধ্যে তিন-চারটি ছিল যুদ্ধশিশু। সেই জন্মসাথীদের খুঁজে ফেরার মধ্য দিয়ে প্রামাণ্যচিত্রে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র সামনে এনেছেন শবনম। নিজভূমে আত্মপরিচয় সংকটে জীবনযাপন করা এসব মানুষের সন্ধানই ‘জন্মসাথী’।