Image description

আবারো বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এবার পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। এতে বিদ্যুতের দাম ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। তবে এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, শিল্পোদ্যোক্তা, ভোক্তা অধিকার সংগঠন এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তাদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অপচয় ও দুর্নীতির দায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে।

দেশে আবারো বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এবার পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। এতে বিদ্যুতের দাম ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। তবে এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, শিল্পোদ্যোক্তা, ভোক্তা অধিকার সংগঠন এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তাদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অপচয় ও দুর্নীতির দায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে।

গতকাল বুধবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আয়োজিত দুই দিনব্যাপী গণশুনানির প্রথম দিনে পাইকারি বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির এই প্রস্তাব উপস্থাপন করে বিপিডিবি। শুনানিতে জানানো হয়, একই সাথে দেশের ছয়টি বিতরণ কোম্পানি খুচরা পর্যায়ে বিভিন্ন শ্রেণীর গ্রাহকের জন্য ১৫ থেকে ২৯ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আবেদনও জমা দিয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার খুচরা পর্যায়ের মূল্যহার নিয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।

 

শুনানিতে বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো: রেজাউল করিম বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় সংস্থাটিকে বিশাল আর্থিক ঘাটতির মুখে পড়তে হচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৬২ থেকে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। তিনি বলেন, সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির দাম বেড়েছে। পাশাপাশি ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর জ্বালানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থ পরিশোধ করতে হওয়ায় চাপ আরো বেড়েছে। বিপিডিবি চেয়ারম্যান জানান, বর্তমানে ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্র কম চালু থাকলেও এইচএফওভিত্তিক কেন্দ্র পরিচালনা করতে হচ্ছে। এছাড়া ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের মূল্যও আগের তুলনায় বেশি। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ আমদানি করে-এমন ধারণা সঠিক নয়। বর্তমানে ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ বিদ্যুৎ ভারত থেকে আসে, বাকি বিদ্যুৎ দেশেই উৎপাদিত হয়। তবে দেশীয় উৎপাদনেও আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়।’ তিনি আরো বলেন, সরকারের পক্ষে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই পুরো খাতকে ব্রেক-ইভেনে নেয়া নয়, বরং ভর্তুকির একটি অংশ সমন্বয়ের জন্যই এই মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব আনা হয়েছে।

দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবের বিরোধিতা

মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের সবচেয়ে তীব্র বিরোধিতা করে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক ড. সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, ‘বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করা হলে বিইআরসি গণশত্রুতে পরিণত হবে।’ তিনি অভিযোগ করেন, সরকার জনগণের টাকায় ভর্তুকি দিলেও সাধারণ মানুষের কষ্টের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে না। তার মতে, অতীতে আইনের দোহাই দিয়ে বিদ্যুৎ খাতে বহু বেআইনি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং তাতে বিইআরসি সহায়তা করেছে। ড. মিজানুর রহমান বলেন, ‘৫ আগস্টের পর দেশে অনেক কিছু পরিবর্তন হলেও বিইআরসিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। কমিশন যদি সত্যিই জনগণের স্বার্থে কাজ করতে চায়, তাহলে বিদ্যুতের দাম কমানোর দিকেও ভাবতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতি, অপচয় ও অদক্ষতা বন্ধ করা গেলে এত বড় ঘাটতি তৈরি হতো না। তাই সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির চাপ সৃষ্টি না করে খাতটির সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।

শিল্পখাতের আশঙ্কা : বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিরোধিতা করেছেন ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারাও। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এর পরিচালক মো: জামাল উদ্দিন মিয়া বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।’ তিনি বলেন, দেশের রফতানি খাত এরই মধ্যে নানা সঙ্কটে রয়েছে। ডলার সঙ্কট, উচ্চ সুদহার, গ্যাসের সীমিত সরবরাহ এবং আমদানি ব্যয়ের চাপে শিল্পকারখানা টিকে থাকার লড়াই করছে। এর মধ্যে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি হলে উৎপাদন ব্যয় আরো বাড়বে। তার মতে, একসময় তৈরী পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশ চীনের পরেই ছিল। কিন্তু বর্তমানে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দেশের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছে। এখন বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে সেই সঙ্কট আরো তীব্র হবে।

শিল্প উদ্যোক্তারা বলেন, কারখানায় বিদ্যুতের ব্যয় বাড়লে পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়বে। ফলে একদিকে ভোক্তাপর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়বে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের প্রতিযোগিতা কমে যাবে।

শুনানিতে বক্তব্য দেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স। তিনি বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্প উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থনীতিতে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। তার অভিযোগ, বর্তমান আইন অনুযায়ী বিইআরসি শুধু মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়েই শুনানি করতে পারে, মূল্য কমানোর প্রস্তাব নিয়ে নয়। তাই জনগণের স্বার্থ রক্ষায় বিইআরসি আইন সংশোধনের দাবি জানান তিনি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরাও বলেন, বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সঙ্কটের সমাধান শুধু দাম বাড়ানো নয়। বরং সুশাসন নিশ্চিত করা, উৎপাদন ব্যয় কমানো, অপচয় রোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে খাতটিকে টেকসই করতে হবে। তাদের মতে, বিদ্যুতের দাম বাড়লে এর প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ বিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; কৃষি, শিল্প, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সব ক্ষেত্রে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরো বাড়তে পারে।

সামনে আরো চাপের শঙ্কা : বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বাড়বে। একই সাথে শিল্প ও ব্যবসা খাতে নতুন চাপ তৈরি হবে। ফলে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সঙ্কট মোকাবেলায় সরকার শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেয়, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।