ত্রিশ বছর আগে। ১৯৯৬ সালের ১৭ এপ্রিল। নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত ‘ফর মেক্সিকো’র স্মল ফারমারস, এনএএফটিএ’স প্রমিজ হু অ্যা ড্রাইড-আপ ফিল্ড’ শিরোনামে প্রকাশিত ফিচারে উঠে আসে মেক্সিকোর পোপোৎলা গ্রামের হোসে লুইসের দুর্দশার গল্প।
হোসের জীবন ছিলো তার সিক্স-প্যাক ডেয়ারি গাভী আর দুই একরের ভুট্টার ক্ষেত নিয়ে। মেক্সিকোর বাতাসে তখন উত্তর আমেরিকান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এনএএফটিএ) ‘সুবাতাস’। হোসেকে বলা হয়েছিল, সীমান্ত খুলে গেলে তার খামারের মাংস আর ভুট্টা নাকি মার্কিন বাজারে ঝড় তুলবে।
কিন্তু দুই বছরের মাথায় হোসে দেখলেন উল্টো এক দৃশ্য। মার্কিন সরকারের বিলিয়ন ডলারের ভর্তুকিতে ফুলে ফেপে ওঠা টেক্সাসের বিশাল সব করপোরেট ফিডলট থেকে হিমায়িত সস্তা মাংস আর আইওয়ার সাবসিডাইজড হাইব্রিড ভুট্টা মেক্সিকোর বাজারে সয়লাব হয়ে গেছে। যে মাংস উৎপাদন করতে হোসের খরচ হতো কেজিপ্রতি ৫০ পেসো, মার্কিন মাংসের কারণে বাজারে তা বিক্রি হতে শুরু করল ৩০ পেসোতে। হোসে লুইস সেদিন তার প্রিয় গাভীগুলোকে কসাইখানায় নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন।
মেক্সিকোর কৃষি মন্ত্রণালয়ের দলিল বলছে, হোসের মতো প্রায় ১৩ লাখ ক্ষুদ্র খামারি রাতারাতি দেউলিয়া হয়ে চিলির সীমান্ত পাড়ি দিতে বাধ্য হয়েছিল।
দ্য কোরিয়ান টাইমস-এ প্রকাশিত ৬০ বছর বয়সী কিম সং-জিল এর গল্প আরো করুণ। ২০১২ সালের ১৫ জানুয়ারি ‘কোরাস এফটিএ: হানউ বিফ ফারমারস স্টেয়ার এনটু দ্য অ্যাবসিস অব ইউএস ইমপোর্টস’ শিরোনামে প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয়, কোরিয়া-ইউএস মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (কোরাস এফটিএ) কার্যকর হওয়ার ঠিক পর সিউল থেকে কয়েক শ মাইল দূরে গ্যাংওন প্রদেশের পাহাড়ি গ্রামে কিম সং-জিল তার খামারের ঐতিহ্যবাহী ‘হানউ’ জাতের গরুর গায়ে হাত বুলিয়ে অঝোরে কাঁদছিলেন।
কোরিয়ানদের কাছে ‘হানউ’ জাতের গরু শুধু মাংসের জন্য প্রয়োজনীয় না, বরং তাদের জাতীয় সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা সস্তা ফ্রোজেন ‘ইউএসডিএ প্রাইম’ গরুর মাংসের টেকনিক্যাল ট্যারিফ যখন ধসে পড়ল, তখন সিউলের সুপারমার্কেটগুলো মার্কিন মাংসে ছেয়ে গেল। কিম সং-জিলের হানু গরুর দাম এক সপ্তাহে এক-তৃতীয়াংশ কমে যায়। খামারের পশুখাদ্যের ঋণ শোধ করতে না পেরে কিম কোরিয়া টাইমসের সাংবাদিককে বলেছিলেন, “প্রযুক্তি আর গাড়ি রপ্তানি বাড়ানোর জন্য সরকার আমাদের বুকের পাঁজর এই হানউ খামারগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের কসাইখানায় বলি দিল।”
মেক্সিকোর পোপোৎলা গ্রামের হোসে লুইস অথবা সিউলের গ্যাংওন প্রদেশের কিম সং-জিল-কারো গল্প আজ আর সুদূর অতীতের কোনো রূপকথা নয়। গত ৯ ফেব্রুয়ারির পর এই গল্পগুলো এখন বাংলাদেশের পাবনার চাটমোহর কিংবা সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের কোনো প্রান্তিক খামারির ঘরের বাস্তব ভবিষ্যৎ।
বাংলাদেশের গবাদি পশু শিল্প ও চামড়া খাত কি আসলেই তেমন ভয়বহ দিনের সামনে দাড়িয়ে আছে? গত ৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে স্বাক্ষরিত রেসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্টের (আরটিএ) গবাদিপশু, মাংস ও খাদ্যসংক্রান্ত ধারাগুলো হোসে লুইস আর কিম সং-জিলের সেই ট্র্যাজেডিরই একটা বাংলা অনুবাদ বলে মনে করছেন দেশের কৃষি অর্থনীতিবিদরা।
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ড. জাহাঙ্গীর আলম খান চরচাকে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাশ-ভর্তুকিপ্রাপ্ত হিমায়িত মাংসের অবাধ প্রবেশ ঘটলে আমাদের দেশীয় লাইভস্টক খাতের মেরুদণ্ড ভেঙে পড়বে। আমাদের খামারিদের উৎপাদন খরচ যেখানে প্রতি কেজিতে ৮ ডলারের কাছাকাছি, সেখানে মার্কিন মাংস ৪ ডলারে বাজারে এলে স্থানীয় খামারগুলো তিন মাসের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাবে। এটি কেবল বাণিজ্য চুক্তি নয়, এটি দেশের আড়াই কোটি প্রান্তিক মানুষ, বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক সুরক্ষাকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত করে দেওয়ার দলিল।”
কেন চুক্তিকে বাংলাদেশের জন্য এতোটা আত্মবিধ্বংসী বলছেন কৃষিবিদরা?
কী আছে চুক্তির গবাদিপশু ও কৃষিজপণ্য সংক্রান্ত ধারায়?
১. বাজার উন্মুক্তকরণের প্রতিশ্রুতি
বাংলাদেশ মার্কিন শিল্প ও কৃষিপণ্যের জন্য উল্লেখযোগ্য অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সয়া পণ্য, দুগ্ধজাত পণ্য, গরুর মাংস, পোল্ট্রি, এবং ট্রি নাট ও ফল।
২. মাংস ও পোল্ট্রি: স্বাস্থ্য পরিদর্শন ও নিবন্ধন
চুক্তির অ্যানেক্স-থ্রিতে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ মার্কিন মাংস ও পোল্ট্রি (ওফাল বা ভুঁড়িসহ), মাংস ও পোল্ট্রিজাত পণ্য, প্রক্রিয়াজাত মাংস ও পোল্ট্রি, সিলুরিফর্মিস (ক্যাটফিশ) এবং ডিম পণ্য উৎপাদনকারী মার্কিন স্থাপনাগুলোয় নিবন্ধন করবে। যাতে এসব পণ্য বাংলাদেশ আমদানি করতে পারে।
বাংলাদেশ মার্কিন ইউএসডিএ-এর ফুড সেফটি অ্যান্ড ইন্সপেকশন সার্ভিস (এফএসআইএস)-এর তত্ত্বাবধান মেনে নেবে। এফএসআইএস-এর তালিকাই হবে যোগ্য মার্কিন স্থাপনার সরকারি তালিকা-প্রতিটি মার্কিন কারখানাকে আলাদাভাবে বাংলাদেশের অনুমোদন নিতে হবে না। চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ মার্কিন মাংস ও পোল্ট্রির ক্ষেত্রে কোনো অতিরিক্ত পণ্য-নিবন্ধন বা স্থাপনা-নিবন্ধন শর্ত আরোপ করতে পারবে না।
৩. দুগ্ধজাত পণ্য: সমতুল্য নিরাপত্তা স্বীকৃতি
বাংলাদেশ মার্কিন ডেইরি-সেফটি ব্যবস্থাকে নিজের দেশীয় মানের ‘অন্তত সমতুল্য’ সুরক্ষা প্রদানকারী হিসেবে স্বীকার করবে। ইউএসডিএ-এর অ্যাগ্রিকালচারাল মার্কেটিং সার্ভিস (এএমএস)-এর সার্টিফিকেট সংযুক্ত থাকলে গরু, মহিষ, ভেড়া ও ছাগলের দুধ থেকে তৈরি মার্কিন দুগ্ধপণ্য আমদানির অনুমতি দেওয়া হবে।
৪. চিজ ও মাংস পণ্যের নাম ব্যবহারের বিধান
চুক্তির অনুচ্ছেদ ২.৫ অনুযায়ী, বাংলাদেশ অ্যানেক্স-টুতে তালিকাভুক্ত চিজ ও মাংসের পদের একক ব্যবহারের কারণে মার্কিন বাজার সুবিধা সীমিত করতে পারবে না। এর মাধ্যমে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের চিজ ও মাংস উৎপাদকদের বাজার সুবিধা সংরক্ষিত হবে, যারা নির্দিষ্ট সাধারণ নামের ওপর নির্ভর করে ব্যবসা পরিচালনা করেন।
৫. কৃষি বায়োটেকনোলজি ও জিএমও
বাংলাদেশ কৃষিপণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিতে মার্কিন নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার কার্যকারিতা স্বীকার করবে। চুক্তি স্বাক্ষরের ২৪ মাসের মধ্যে বাংলাদেশকে এমন একটি নীতিমালা তৈরি করতে হবে যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আইনত অনুমোদিত কৃষি বায়োটেক পণ্যের আমদানি ও বিপণনের সুযোগ দেবে।
চুক্তির এই ধারা অনুযায়ী জিএমও পণ্যে লেবেলিংয়ের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই এবং বাংলাদেশ সরাসরি সয়াবিন ও ভুট্টা আমদানি না করলেও মাংস, দুগ্ধপণ্য ও সয়াভুট্টা-ভিত্তিক পণ্যের মাধ্যমে এগুলো পরোক্ষভাবে প্রবেশ করবে।
চুক্তির এসব ধারা বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তৈরি পোশাক খাতের সামান্য ট্যারিফ সুবিধার আড়ালে বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের বিলিয়ন ডলার ভর্তুকিপ্রাপ্ত অ্যাগ্রো-বিজনেস জায়ান্টদের জন্য এদেশের গবাদিপশু ও মাংসের বাজার উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে ওই চুক্তির মাধ্যমে।
ফলে, পাবনার চাটমোহর কিংবা সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের খামারিরা যখন কোরবানি ঈদ কেন্দ্রিক বাজার ধরার শেষ প্রস্তুতি সারছেন, তারা হয়তো জানেনও না যে মেক্সিকোর পোপোৎলা গ্রামের হোসে লুইসের সেই অভিশপ্ত সকালটি তাদের কতটা কাছে চলে এসেছে।
বাংলাদেশের গবাদিপশু খাত কত বড়
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর গত বছরের তথ্য বলছে, দেশের সামগ্রিক জিডিপিতে গবাদিপশু খাতের সরাসরি অবদান প্রায় ১.৯০% থেকে ২.০০%। তবে কৃষি জিডিপির একক উপখাত হিসেবে এর হিস্যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যা প্রায় ১৬.৫% থেকে ১৭.০%। পোল্ট্রি ও ডেইরিকে সংযুক্ত করলে সামগ্রিক প্রাণিসম্পদ খাতের পরোক্ষ অবদান আরও বৃদ্ধি পায়।
হবিগঞ্জে ছোট-বড় ও পারিবারিক প্রায় ৭ হাজার ২০০ গরুর খামার গড়ে উঠেছে। ছবি: বাসস
কেবল তাই নয়; বাংলাদেশের প্রায় দুই কোটি থেকে আড়াই কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গবাদিপশু পালন ও এর সামগ্রিক ভ্যালু চেইনের সাথে যুক্ত। এর মধ্যে খামার পরিচালনা এবং গবাদিপশু লালন-পালনের মাঠপর্যায়ের শ্রমে গ্রামীণ নারীদের অংশগ্রহণ প্রায় ৬২% থেকে ৬৫%। পুরুষদের অংশগ্রহণ মূলত বাজারজাতকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণে (৩৫%-৩৮%) সীমাবদ্ধ
বাংলাদেশের গ্রামীণ নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবিকার প্রধান ভিত্তি এই ক্ষুদ্রায়তন গবাদিপশু খাত, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহদাকার ও স্বল্প উৎপাদন ব্যয়ের খামার ব্যবস্থার সামনে চরম অসম প্রতিযোগিতার ঝুঁকিতে পড়বে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চুক্তির সরাসরি প্রভাব কেমন হবে?
১. মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যের আমদানি বাড়তে পারে ৪০০% পর্যন্ত
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও মার্কিন কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ক্ষুদ্র খামারি পর্যায়ে পশুখাদ্যের উচ্চ মূল্য এবং আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রতি কেজি গরুর মাংসের গড় উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৭.৫০ থেকে ৮.২০ মার্কিন ডলার (প্রায় ৮৫০–৯০০ টাকা)। বিপরীতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বৃহৎ আকারের ফিডলট ব্যবস্থা এবং বিপুল সরকারি ভর্তুকির কারণে তারা প্রতি কেজি হিমায়িত গরুর মাংস আন্তর্জাতিক বাজারে মাত্র ৪.২০ থেকে ৪.৮০ মার্কিন ডলার মূল্যে রপ্তানি করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত মাংস ও ডেইরি পণ্যের ওপর বাংলাদেশের বর্তমান সম্মিলিত শুল্ক হার প্রায় ৩৭% থেকে ৫৮%। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, এটি তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে হ্রাস পেয়ে ১০%-এর কোটায় নেমে আসবে। এই ট্যারিফ কমার কারণে ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সেন্টারের ট্রেড ম্যাপ সিমুলেশন মডেল অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রথম দুই বছরে মার্কিন হিমায়িত মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যের আমদানি বার্ষিক প্রায় ৩৫০% থেকে ৪০০% বৃদ্ধি পেতে পারে।
২. চামড়া শিল্পে প্রভাব
বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের কাঁচামালের প্রায় ৯৫% আসে দেশীয় গবাদিপশু জবাই থেকে, যার সিংহভাগ (প্রায় ৬০-৬৫%) সংগ্রহ হয় ঈদুল আজহার সময়। বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৪০ লাখ গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া জবাই হয়। এর মধ্যে গরু-মহিষের সংখ্যা প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ লাখ। এর মাধ্যমে বছরে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ মেট্রিক টন কাঁচা চামড়া উৎপাদিত হয়।
সস্তা মার্কিন হিমায়িত মাংসের আগ্রাসনে দেশের ডেইরি ও ক্যাটল ফার্মিং যদি ধসে পড়ে, তবে ঈদুল আজহা কেন্দ্রিক দেশীয় পশু জবাইয়ের হার এক ধাক্কায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাবে। আর এর সরাসরি অর্থ হলো-বাংলাদেশের ১.১২ বিলিয়ন ডলারের চামড়া শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বা কাঁচামালের সরবরাহ চেইনে এক অভাবনীয় বিপর্যয়।
সাভারের ট্যানারিগুলো যখন দেশীয় কাঁচা চামড়ার অভাবে হাহাকার করবে, তখন এই চুক্তিরই আরেকটি ধারা অনুযায়ী মার্কিন প্রক্রিয়াজাত চামড়া আমদানির ওপর আমাদের নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হবে।
মার্কিন হিমায়িত মাংসের বাজার সয়লাব হলে দেশীয় গবাদিপশুর ব্যবসা লোকসানের মুখে পড়বে, যা গবাদিপশু জবাইয়ের হার প্রায় ২৫-৩০% কমিয়ে দিতে পারে। এর ফলে দেশীয় কাঁচা চামড়ার সরবরাহ তীব্র সংকটে পড়বে। কাঁচা চামড়ার দাম কমে যাবে। ফলে চূড়ান্ত ফিনিশড লেদার এবং ফুটওয়্যার খাতের বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নষ্ট হবে। কাঁচামাল সংকটের কারণে সামগ্রিক রপ্তানি আয়ে পর্যন্ত ধস নামতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশের চামড়া খাতের বার্ষিক রপ্তানি আয় প্রায় ১.১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
৩. যুক্তরাষ্ট্র থেকে চামড়া আমদানি ও এইচএস কোড ক্যাটাগরি
বাংলাদেশ জুতো ও ব্যাগের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর ‘কমপ্লায়েন্স’ ও এলডব্লিইজি সার্টিফিকেশনের শর্ত পূরণের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রক্রিয়াজাত ওয়েট-ব্লু বা ক্রাস্ট চামড়া আমদানি করে থাকে। চুক্তির অ্যানেক্স-ওয়ান-এর শুল্ক তফসিলে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের প্রধান এইচএস কোডগুলোর ক্ষেত্রে ‘বি ফাইভ’ এবং ‘বি টেন’ ক্যাটাগরি নির্ধারিত হয়েছে। এর অর্থ, চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর থেকে পরবর্তী পাঁচ থেকে ১০ বছরের মধ্যে এই পণ্যগুলোর ওপর প্রযোজ্য শুল্ক সম্পূর্ণ শূন্য করতে হবে।
ফলে, মার্কিন মাংসের আগ্রাসনে দেশীয় গবাদিপশু উৎপাদন কমলে চামড়া শিল্পের অভ্যন্তরীণ ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ সাপ্লাই চেইনটি পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।
৪. দেশীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংকোচন
চুক্তি অনুযায়ী, মার্কিন কৃষি বিভাগের খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিদর্শন বিভাগ (ইউএসডিএ এফএসআইএস) প্রদত্ত সার্টিফিকেটকে বাংলাদেশ সরাসরি বৈধতা দিতে বাধ্য থাকবে। এর ফলে পণ্য খালাসের বন্দরে বাংলাদেশের বিএসটিআই বা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর নতুন করে কোনো ব্যাকটেরিয়াল, অ্যান্টিবায়োটিক রেসিডিউ বা ‘হালাল’ মানদণ্ডের অজুহাতে পণ্য আটকে বা রি-টেস্ট করতে পারবে না। এতে দেশীয় ল্যাবরেটরিগুলোর স্বাধীন রেগুলেটরি ক্ষমতা প্রায় ৭০% সংকুচিত হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া চুক্তিতে দেশের কৃষিখাতে তথা খাদ্য নিরাপত্তায় ভয়ংকর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া চুক্তিতে দেশের কৃষিখাতে তথা খাদ্য নিরাপত্তায় ভয়ংকর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচাল ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, “মেক্সিকো যখন এনএএফটিএ চুক্তিতে সই করেছিল, তখন তাদের লাখ লাখ ভুট্টা ও গবাদিপশু চাষী দেউলিয়া হয়েছিল। বাংলাদেশও এখন একই কাঠামোগত ফাঁদে পা দিচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিলিয়ন ডলারের প্রাতিষ্ঠানিক কৃষি ভর্তুকির সাথে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র খামারিরা কখনোই প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। সরকারের উচিত ছিল বাজার উম্মুক্ত করার আগে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিইউটিও) ‘ভেরিয়েবল ইমপোর্ট লেভি’ বা কঠোর কোটা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।”
এখন কী করতে পারে বাংলাদেশ
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র রেসিপ্রোকাল ট্রেড চুক্তিটি মূলত তৈরি পোশাক খাতের জন্য মার্কিন তুলা ব্যবহারের বিপরীতে একটি সীমিত জিরো-ট্যারিফ সুবিধা নিশ্চিত করলেও, এর বিনিময়ে দেশের গবাদিপশু, মাংস, এবং কৃষি-বায়োটেকনোলজি খাতকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত করে দেওয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি একটি অসম বাণিজ্য সমঝোতা, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ ভর্তুকিপ্রাপ্ত এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত এগ্রি-বিজনেস জায়ান্টদের সাথে বাংলাদেশের আড়াই কোটি প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র খামারির সরাসরি প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই চুক্তির ফলে মাংসের বাজার হারানোর পরোক্ষ প্রভাবে চামড়া শিল্পের দেশীয় কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা দেশের ১.১২ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি খাতকে গভীর সংকটে ফেলবে। দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় খাদ্য ও জৈব-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে বাংলাদেশকে অবিলম্বে ডব্লিইউটিও -এর সেফগার্ড মেকানিজম সক্রিয় করা এবং দেশীয় খামারিদের ব্যাক-এন্ডে সরাসরি ইনপুট ভর্তুকি দেওয়ার নীতি গ্রহণ করতে হবে।