Image description

ঘরের ভেতর চলছিল ঘাতক সোহেলের ভয়াবহ ধর্ষণ, চলছিল হত্যার পর আলামত গায়েব করে দেওয়ার আয়োজন। বাইরে পাগলের মতো মেয়েকে খুঁজছিলেন রামিসার মা। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে কাঁপা কাঁপা আর্তকণ্ঠে ডাকছিলেন রামিসাÑরামিসা। রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের তদন্তে উঠে আসছে এমনসব শিউরে ওঠার মতো তথ্য। পুলিশ বলছে, বিকৃত যৌনলালসা চরিতার্থ করার পর অপরাধের প্রমাণ নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে শিশুটিকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। আলামত গোপন এবং মরদেহ সরিয়ে ফেলার উদ্দেশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার মাথাও বিচ্ছিন্ন করে ঘাতক সোহেল রানা। অথচ ওই সময় ঘাতকের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মেয়েকে খুঁজছিলেন অসহায় মা।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ঘটনাটি নিছক কোনো হত্যাকাণ্ড নয়; এটি ভয়ংকর মানসিক বিকৃতি ও পরিকল্পিত নিষ্ঠুরতার ভয়াবহ উদাহরণ। গতকাল বুধবার এই ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা আদালতে দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। একই ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারও। তদন্তকারীদের দাবি, স্বপ্না আক্তার তার স্বামীকে এই হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতা করেছে, পরে পালাতেও সাহায্য করেছে।

গতকাল সোহেলকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তোলা হলে আদালত চত্বরে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষকে ক্ষোভে ফেটে পড়তে দেখা যায়। কেউ কেউ চিৎকার করে প্রকাশ্যে তার ফাঁসির দাবি জানান। বেলা ৩টা ১৫ মিনিটে তাকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় সোহেল। তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই অহিদুজ্জামানের আবেদনের পর আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে পুলিশ তার বিরুদ্ধে ১০ দিনের রিমান্ডও আবেদন করেছে।

পুলিশ ও তদন্ত সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি-ব্লকের একটি বহুতল ভবনে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহত রামিসা স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হান্নান মোল্লার মেয়ে এবং স্থানীয় একটি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। পরিবারটি দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে ওই ভবনে বসবাস করছে। অভিযুক্ত সোহেল ও তার স্ত্রী স্বপ্না মাত্র দুই মাস আগে বিপরীত পাশের ফ্ল্যাটে ভাড়া ওঠে। প্রতিবেশী হওয়ায় দুই পরিবারের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক ছিল। সেই পরিচয়ের সুযোগই নেয় ঘাতক।

তদন্তে জানা গেছে, ঘটনার দিন সকালে রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল পরিবার। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পুরো ভবনে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। একপর্যায়ে শিশুটির মা পাশের ফ্ল্যাটের সামনে রামিসার স্যান্ডেল দেখতে পান। তখনই সন্দেহ জাগে তার মনে। তিনি বারবার দরজায় নক করতে থাকেন। পুলিশ বলছে, ঠিক সেই সময় ফ্ল্যাটের ভেতরে চলছিল হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা।

তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সোহেল রানা যাতে পালাতে পারে, সেজন্য দীর্ঘ সময় দরজা খুলতে দেরি করে স্ত্রী স্বপ্না। পরে জানালার গ্রিল কেটে সোহেল পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর দরজা খোলা হয়।

পল্লবী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে যে দৃশ্য দেখেন, তাতে হতবাক হয়ে যান তদন্ত কর্মকর্তারাও। খাটের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় রামিসার মস্তকবিহীন বিবস্ত্র দেহ। পরে বাথরুমের একটি বালতির ভেতর থেকে পাওয়া যায় বিচ্ছিন্ন মাথা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মাথার সঙ্গে একটি ওড়না পেঁচানো ছিল। ঘটনাস্থল থেকে হত্যায় ব্যবহৃত ধারালো ছুরিও উদ্ধার করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) এন এম নাসিরুদ্দিন জানান, শিশুটিকে ধর্ষণের পর মাথা বিচ্ছিন্ন করে হত্যা করা হয়েছেÑ এমনটা প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে এবং আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে।

ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপ পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোস্তাক সরকার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এটি তাৎক্ষণিক উত্তেজনার ঘটনা নয়; বরং আলামত গোপনের উদ্দেশ্যে সংঘটিত নির্মম ও পরিকল্পিত অপরাধ। মরদেহ গুমের পরিকল্পনা থেকে মাথা ও হাত বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চালানো হয়।

ঘটনার পরপরই ফ্ল্যাট থেকে আটক করা হয় স্বপ্না আক্তারকে। প্রধান আসামি সোহেল রানা এর আগেই জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়। পরে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে পুলিশ জানতে পারে, সে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকায় অবস্থান করছে। তদন্তকারীরা আরও জানতে পারেন, এক বন্ধুর মাধ্যমে পাঠানো টাকা তুলতে একটি বিকাশের দোকানে গেছে সোহেল। এরপর স্থানীয় পুলিশ ও দোকানদারের সহায়তায় অভিযান চালিয়ে সেখান থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, সোহেলের বিরুদ্ধে আগেও একটি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। তার অতীত অপরাধ, আচরণগত বৈশিষ্ট্য এবং বিকৃত মানসিকতার বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গ্রেপ্তার স্বপ্না দাবি করেছে, ঘটনার সময় সে ঘুমিয়ে ছিল এবং এসবের কিছুই জানে না। তবে তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, ঘটনাস্থলের আলামত, দরজা খুলতে বিলম্ব এবং সোহেলের পালানোর জন্য গ্রিল কাটার ঘটনা স্বপ্নার বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

পল্লবী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) এমদাদুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে ধাপে ধাপে তদন্তে হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা সামনে আসে। এ ঘটনায় পল্লবী থানায় হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে। তিনি বলেন, পুরো ঘটনাটি ঘিরে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে অন্য কারও সম্পৃক্ততা আছে কি না, তাও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

জবানবন্দিতে যা বলেছে সোহেল

রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার আগে ইয়াবা সেবন করার কথা জবানবন্দিতে জানিয়েছে সোহেল রানা। তার দেওয়া তথ্যমতে, গত মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা ঘর থেকে বের হলে স্বপ্না আক্তার তাকে রুমের ভেতরে নিয়ে যায়। সোহেল শিশু রামিসাকে বাথরুমে নিয়ে ধর্ষণ করার সময় শিশুটি জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। এরই মধ্যে রামিসার মা দরজায় কড়া নাড়তে থাকেন। তখন সোহেল রামিসাকে গলা কেটে হত্যা করে। পরে মরদেহ গুম করার জন্য তার মাথা ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে গলা থেকে আলাদা করে ফেলে। দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করে মরদেহ বাথরুম থেকে শয়নকক্ষে এনে খাটের নিচে রাখে। ছুরি দিয়ে শিশুটির অঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করে। ঘটনার সময় তার স্ত্রী একই রুমে ছিল। পরে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায় সোহেল। আদালতকে সে এ-ও জানায়, ভুক্তভোগীর পরিবারের সঙ্গে তার কোনো শত্রুতা ছিল না।