Image description

হবিগঞ্জের শাহজিবাজারে ৮৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন অত্যাধুনিক গ্যাস টারবাইন বিদ্যুৎকেন্দ্রটি গত ৬ বছর ধরে বিকল হয়ে পড়ে আছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ইতোমধ্যে বিল বাবদ প্রায় ৬০০ কোটি টাকা (মোট বরাদ্দের ৭০ শতাংশ) পরিশোধ করা হলেও কেন্দ্রটি থেকে জাতীয় গ্রিড কোনো বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। বারবার যান্ত্রিক ত্রুটি এবং টারবাইনের ব্লেড ভেঙে যাওয়ার কারণে এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে শাহজিবাজারে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কাজ শুরু হয়। কাজটির চুক্তি পায় চীনা প্রতিষ্ঠান ‘চায়না ক্যাবল করপোরেশন ইঞ্জিনিয়ারিং (সিসিসিই) লিমিটেড’। কেন্দ্রটিতে আমেরিকান প্রতিষ্ঠান জেনারেল ইলেকট্রনিক্সের ‘এলএমএস-১০০’ মডেলের অত্যাধুনিক অ্যারো-ডেরিভেটিভ গ্যাস টারবাইন বসানো হয়। চুক্তি অনুযায়ী ২০২০ সালের জুনে উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ওই বছরের মার্চে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে জেনারেল ইলেকট্রনিক্সের প্রকৌশলীরা নিজ দেশে ফিরে গেলে কাজ পিছিয়ে পড়ে।

শাহজিবাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক এ কে মফিজউদ্দিন আহমেদ জানান, করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর ২০২১ সালের জানুয়ারিতে কেন্দ্রটি চালু করে নির্ভরযোগ্যতা পরীক্ষা (আরটিআর) সম্পন্ন করার পরপরই চলন্ত অবস্থায় গ্যাস টারবাইনের ব্লেড ভেঙে যায়। মেরামত শেষে ওই বছরের ২৯ অক্টোবরে আবারও চালু করা হলেও পুনরায় যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। এরপর ‘সুপার কোর মেশিন’ পরিবর্তন করে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবারও উৎপাদনে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ২ মাস ভালোভাবে চলার পর ২০২৪ সালের ২৯ এপ্রিলে আবারও প্লান্টের ব্লেড ভেঙে যায়। এরপর থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সম্পূর্ণ অচল অবস্থায় পড়ে আছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই কেন্দ্রটি থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৪ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করার কথা ছিল, যার দৈনিক আর্থিক মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা। সময়মতো উৎপাদনে যেতে পারলে গত ৬ বছরে এই কেন্দ্র থেকে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ পাওয়া যেত। কিন্তু বাস্তবে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে এ পর্যন্ত মাত্র ৩৪ কোটি টাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে।

এদিকে, কাজের অগ্রগতি বিবেচনা করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ইতোমধ্যে ৭০ শতাংশ বিল দেওয়া হলেও পিডিবি জানিয়েছে, প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ হিসেবে বাকি ১০ শতাংশ (প্রায় ৯০ কোটি টাকা) অর্থ আটকে রাখা হয়েছে।

প্রধান প্রকৌশলী মো. আবদুল মান্নান জানান, দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রটির কার্যক্রম ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে জটিলতা চলছে। পিডিবি যেহেতু ইতোমধ্যে ৭০ শতাংশ বিনিয়োগ করে ফেলেছে, তাই যেকোনো মূল্যে এটি চালু করা হবে। পিডিবি এই প্রকল্প থেকে সরে আসবে না। তবে নির্ধারিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রত্যাশিত সক্ষমতা দেখাতে ব্যর্থ হলে, সরকার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর উদ্যোগ নিতে পারে। সরকারি উদ্যোগে কেন্দ্রটি পরিচালিত হলে অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন হবে না এবং উৎপাদন ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।

বর্তমানে প্লান্টটি মেরামতের জন্য চীনা ও মার্কিন উভয় প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করা হচ্ছে। যন্ত্রাংশ মেরামত ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে আলোচনা ফলপ্রসূ হলে আগামী ২০২৭ সালের জুন মাসের দিকে প্লান্টটি পুনরায় চালু করা সম্ভব হতে পারে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।