Image description

বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথা এখন আর শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নয়, দিনভর সময় ভাগ করে দখল নেওয়ার এক অঘোষিত ‘শিফট বাণিজ্য’ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ঘড়ির কাঁটা অনুযায়ী বদলে যায় দখলদারদের চেহারা, আর সেই সঙ্গে বদলায় যানজট ও জনদুর্ভোগের চিত্র।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সকাল থেকেই সাতমাথার সাতটি সড়কজুড়ে ভ্রাম্যমাণ ফল ব্যবসায়ীদের দখল শুরু হয়। রাস্তার পাশে ও ফুটপাতজুড়ে বসানো এসব দোকানের কারণে পথচারীদের চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে তাদের মূল সড়কে নেমে হাঁটতে হয়।

 

দুপুর গড়াতেই দখলের চিত্র আরও ঘন হয়। জিলা স্কুলের সামনে থেকে জলেশ্বরীতলা পর্যন্ত গড়ে ওঠে ভ্রাম্যমাণ কাপড়ের দোকান, ফুচকা, শিক কাবাব, সবজি ও ফলের অস্থায়ী বাজার। একই সঙ্গে সাতমাথার বিভিন্ন পয়েন্টে অঘোষিত অটোরিকশার স্ট্যান্ড সক্রিয় হয়ে ওঠে, যা যানজটকে আরও তীব্র করে।

 

এছাড়া বিকেল নামলেই শুরু হয় নতুন দখলদারদের পালা। সমবায় ব্যাংকের সামনে ও নিচে ২০-২৫টি ভ্যানে কাপড় বিক্রেতারা অবস্থান নেয়। একই সময়ে ৩৬ জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের সামনে বসে চটপটি, লটপটি, মুড়ি মাখা ও ভাজা পোড়ার দোকান। চেয়ার-টেবিল বসিয়ে জমে ওঠে বেচাকেনা।সপ্তপদী মার্কেটের সামনেও বিকেল থেকে শুরু হয় ভাজাপোড়া, বুট মাখা ও ফল মাখার দোকান।

 

এদিকে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দখলের ধরন বদলায় আবারও। রাত ১০টার পর কিছুটা ফাঁকা তৈরি হলে সেখানে ঢুকে পড়ে চা-নাস্তার দোকানগুলো, যা ভোর ৭টা পর্যন্ত চালু থাকে। এভাবে ২৪ ঘণ্টার একটি বড় অংশ জুড়েই বিভিন্ন ধাপে দখলে থাকে সাতমাথা।

 

শুধু ভ্রাম্যমাণ দোকানই নয়, সাতমাথা লোটো সংলগ্ন ট্রাফিক বক্সের সামনে গড়ে উঠেছে ইজিবাইক ও রিকশার স্ট্যান্ড। ‘সাংবাদিক ছাউনি’ খ্যাত এলাকাতেও রয়েছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের অস্থায়ী স্ট্যান্ড। গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা এসব যানবাহন প্রায়ই রাস্তার মাঝখানে যাত্রী ওঠানামা করে, ফলে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট।

 

জানা গেছে, সাতমাথা ও আশপাশ এলাকায় প্রায় ৯৯০টি অস্থায়ী দোকান বসে। এর মধ্যে রয়েছে ২৫৪টি ফলের দোকান, ৩৫টি ফুচকার দোকান, ৬৩৭ জন ভ্যানে কাপড় বিক্রেতা, ২৯টি ফাস্টফুড দোকান এবং ৩৫টি চায়ের দোকান। এত বিপুল সংখ্যক দোকানের চাপে ফুটপাত দিয়ে হাঁটা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

 

মাহাবুব হাসান নামে এক শিক্ষক বলেন, ফুটপাত বলে কিছু নেই। সব জায়গায় দোকান। বাধ্য হয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হয়, এতে ঝুঁকিও থাকে।

 

স্থানীয় এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা জানি এটা নিয়মের মধ্যে পড়ে না। কিন্তু জীবিকার জন্য বসতে হয়। মাঝে মাঝে উচ্ছেদ অভিযান হয়, তখন সরে যাই। কয়েকদিন পর আবার আগের জায়গায় ফিরে আসি।

 

আরেক ভ্রাম্যমাণ কাপড় বিক্রেতা বলেন, সামনে ঈদ। তাই আমাদের ব্যবসার জন্য বাধ্য হয়েই বসতে হয়। সংসার তো চালাতে হবে।

 

স্থানীয় বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন একই অবস্থা। যানজটে আটকে থাকতে হয়। জরুরি কাজেও সময়মতো পৌঁছানো যায় না। সমস্যার স্থায়ী সমাধান দরকার।

 

এদিকে থানা রোড, কাঁঠালতলা, স্টেশন রোড ও জলেশ্বরীতলা এলাকায় দেখা গেছে, অনেক স্থায়ী দোকান মালিক নিজেদের দোকানের সামনে ফুটপাতে টেবিল বসিয়ে পণ্য বিক্রি করছেন। আবার কেউ কেউ ফুটপাতের অংশ ভাড়া দিয়ে অস্থায়ী দোকান বসানোর সুযোগ দিচ্ছেন। সাতমাথার ট্রাফিক ফাঁড়ির দেয়াল ভেঙে অনুমোদন ছাড়াই গড়ে তোলা হয়েছে একটি ফুচকা মার্কেটও।

 

সারাদিন সেখানে যানজট লেগে থাকলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সব মিলিয়ে সময়ভিত্তিক দখলের এক জটিল চক্রে আটকে পড়েছে শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই মোড়। আর এই চক্র ভাঙতে সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত ও স্থায়ী উদ্যোগের অপেক্ষায় সাধারণ মানুষ। মাঝে মাঝে প্রশাসনের অভিযান চালানো হলেও দীর্ঘস্থায়ী সমাধান আনতে পারছে না। কয়েকদিন শৃঙ্খলা ফিরলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আগের অবস্থায় ফিরে যায় পুরো এলাকা।

 

এ বিষয়ে বগুড়ার ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) সালেকুজ্জামান খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, বগুড়া পৌরসভা ও জেলা পুলিশের যৌথ উদ্যোগে শহরে যানজট নিরসনে কাজ করা হচ্ছে। যানজটের মূল কারণ হচ্ছে অধিক পরিমাণ অবৈধ ইজিবাইক ও অটোরিকশা বেড়ে যাওয়া। এছাড়াও শহরের রাস্তার ধারণ ক্ষমতার অধিক যানবাহন চলাচলের কারণে যানজটের সৃষ্টি হয়। আর দখলদারের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান আছে।