ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্র্বর্তী সরকার এসে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই ১১ জন ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের কল্পিত অভিযোগ আনে। কোনো ধরনের তদন্ত ছাড়াই তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়, অনেকের সম্পত্তি ক্রোক করা হয়, বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
তথাকথিত অর্থ পাচারের অভিযোগ বেসরকারি খাতের বিভিন্ন উদ্যোক্তার ৫৭ হাজার কোটি টাকার বেশি সম্পদ জব্দ করা হয়। আহসান এইচ মনসুর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে বেসরকারি খাতের গলা টিপে ধরেন।
অন্তর্র্বর্তী সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে অর্থ পাচারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে বলা হয়, আসলে দেশের অর্থনীতির ক্ষতি করার জন্য। এর পর থেকে জোরেশোরে তদন্ত শুরু করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বয়ে যৌথ তদন্ত দল। সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করে আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। বাংলাদেশ ব্যাংকে বিশেষ নিরাপত্তাবিশিষ্ট কক্ষে চলে তদন্তের নথিপত্র প্রস্তুতের কাজ। কিন্তু এক বছরের বেশি সময় তদন্ত নাটকের পর ১১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পাঁচটির বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রাথমিক তদন্তেই পাওয়া যায়নি। যৌথ তদন্ত দল ৬টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। বাকি ৫টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আপাতত তদন্ত না করার সিদ্ধান্ত নেয় যৌথ তদন্ত কমিটি। কিন্তু অভিযোগ থেকে মুক্তি মিললেও এসব প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তির জব্দ হওয়া অ্যাকাউন্ট খুলে দেওয়া হয়নি। তাদের বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহার করা হয়নি। তারা যে বিনা অপরাধে সাজা ভোগ করছেন তার ক্ষতিপূরণ কে দেবে?
শুধু এই পাঁচটি শিল্প পরিবারই নয়, ৩ শতাধিক ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছিল ইউনূস সরকারের অন্যায় সিদ্ধান্তের কারণে। দুদক তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে, সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এসব জব্দকৃত অ্যাকাউন্টের শতকরা নব্বই ভাগই ক্লিন। দুদক তাদের তদন্ত শুধু নথিভুক্ত করে রেখেছে। কিন্তু বিনা অপরাধে হয়রানির শিকার এসব ব্যক্তি এখনো ন্যায়বিচার পায়নি। তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এখনো বন্ধ।
কারণ দুর্নীতি দমন কমিশনে এখন কমিশন নেই। এসব অভিযোগ থেকে মুক্তি পেতে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুমোদন প্রয়োজন। কিন্তু সেই অনুমোদন দেওয়ার কেউ নেই। দুদক অচল কিন্তু হয়রানি সচল আছে।
প্রায় তিন মাস হতে চলেছে দুর্নীতি দমন কমিশন অভিভাবকহীন। গত তিন মার্চ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন এবং দুদকের দুই কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহ্সান ফরিদও পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে দুদক নেতৃত্বাধীন। দুদক আইনের ১৭ ধারা অনুযায়ী দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটি যাবতীয় কার্যক্রম কমিশনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। একটি অভিযোগের তদন্ত থেকে শুরু করে মামলার চার্জশিট বা চূড়ান্ত প্রতিবেদন, প্রতিটি ধাপে কমিশনের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। কিন্তু তিন মাস দুদকের চেয়ারম্যান এবং অন্যান্য সদস্য পদ খালি থাকায় দুর্নীতি দমন কমিশন কার্যত একটি অচল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন নিরীহ মানুষ সীমাহীন হয়রানির শিকার হচ্ছে অন্যদিকে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান মুখ থুবড়ে পড়েছে। দুদক সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রমের বড় একটি অংশ আটকে আছে অনুমোদনের অভাবে। নতুন মামলা দায়ের, চার্জশিট অনুমোদন, এমনকি সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিদেশযাত্রা নিষিদ্ধ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও নেওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সময়মতো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এটাকে নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, এর ফলে সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। কমিশনার পদ শূন্য হলে দুদক আইনে ৩০ দিনের মধ্যে নিয়োগের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু দুই মাস পার হলেও সরকারের পক্ষ থেকে কমিশন গঠনের ব্যাপারে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় হতাশসংশ্লিষ্ট সবাই। তারা বলছেন, কমিশন না থাকায় আইনি কাঠামোর কারণেই শূন্যতা তৈরি হয়েছে। দুদক আইন ও বিধিমালায় কমিশনের অনুপস্থিতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোনো বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়নি। কর্মকর্তারা পুরোনো অনুসন্ধান ও তদন্ত নিয়ে আছেন। কিন্তু কীভাবে সেসব অনুসন্ধান ও তদন্তের নিষ্পত্তি হবে, এর দিকনির্দেশনা না থাকায় তারাও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছেন না।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ২০০৪ সালে জন্মের পর থেকেই দুদকের স্বাধীনতা ও অকার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ ও জন-আস্থার সংকট চলে আসছে। এত দীর্ঘ সময়ের জন্য কমিশনহীন অবস্থা এবং অনিশ্চয়তা আগে কখনো হয়নি। বিষয়টি হতাশাজনক। তবে খুব বেশি অবাক হওয়ার মতো কিছু নয়। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের দেশে দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে ক্ষমতার জবাবদিহিহীন চর্চার ক্ষেত্রে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অন্তর্র্বর্তী সরকার আইনি বাধ্যবাধকতা ও জনপ্রত্যাশা পদদলিত করে তথ্য কমিশন ও মানবাধিকার কমিশন মাসের পর মাস গঠন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে বর্তমান সরকার তো জনগণের ভোটে নির্বাচিত। বিশেষ করে দুদকসহ সব নজরদারি প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জোরালো অঙ্গীকারের ভিত্তিতেই এই সরকার নির্বাচিত হয়েছে।
তিনি বলেন, তাদের অজানা নয় যে কমিশন না থাকায় দুদক রুটিন প্রশাসনিক কাজের বাইরে এর মূল ম্যান্ডেট সংক্রান্ত কোনো কাজই বাস্তবে করতে পারছে না। পদত্যাগের আগে অনুমোদিত তদন্ত বা মামলা চলতে পারলেও নেতৃত্বহীন অবস্থায় সেগুলো বিভিন্নভাবে দুর্বলতা ও স্থবিরতায় ভুগছে। বাস্তবে এ অবস্থা দুর্নীতিসহায়ক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে নতুন কমিশন গঠনের আইনগত বাধ্যবাধকতা যে লঙ্ঘিত হয়েছে, তা সরকারের জন্য বিব্রতকর। বিগত অন্তর্র্বর্তী সরকারের দুদক সংস্কার-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের আলোকে আইন মন্ত্রণালয় থেকে দুদক আইন-২০০৪-এর অধিকতর সংশোধনের জন্য প্রজ্ঞাপন জারি করে গত ২৩ ডিসেম্বর। নতুন সরকার গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর সংসদের অধিবেশন শুরু হয় গত ১২ মার্চ। এই দিনেই দুদক-সংক্রান্ত অধ্যাদেশসহ ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদ অধিবেশনে উত্থাপন করা হয়।
ওই ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে পাস হয় ১১৩টি, বাতিল হয় সাতটি। বাকি ১৩টি অধ্যাদেশের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আইন অনুযায়ী, গত ১২ মার্চ অধিবেশনে উত্থাপনের দিন থেকে গত ১১ এপ্রিল পর্যন্ত ৩০ দিন পার হওয়ার পর ওই ১৩টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারিয়েছে। গত ১১ এপ্রিল থেকেই দুদক আইন-২০০৪ পূর্ণাঙ্গভাবে বহাল হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সরকার অন্তর্র্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ গ্রহণ না করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ ওই অধ্যাদেশ ছিল সংবিধানের মূল চেতনার পরিপন্থি। এতে তদন্ত ও বিচার ছাড়াই সম্পদ জব্দ করাসহ চরম স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। কাউকে বিনাবিচারে সাজা দেওয়া কেবল বেআইনি নয়, রীতিমতো অপরাধ। কিন্তু ইউনূস সরকার দেড় বছর ধরে এই কাজটি করছে এই অধ্যদেশ জারি করে। বর্তমানে বহাল দুদক আইন-২০০৪ অনুযায়ী, পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটিতে যারা থাকবেন তারা হলেন- সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি, হাই কোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতি, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সদ্য বিদায়ি সচিব এবং সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই সার্চ কমিটি গঠিত হয়নি। সরকারের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, শিগগিরই একটি সার্চ কমিটি গঠন করা হতে পারে।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন