Image description

আহমেদ সোহেল বাপ্পী

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের শুরুতে আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া বন্দর থেকে একটি ক্রুজশিপ রওনা দেয় এন্টার্কটিকার উদ্দেশ্যে। ২৩টি দেশের প্রায় ১৫০ যাত্রী নিয়ে সে যাত্রা শুরু হয়েছিল আনন্দ ও উদ্যমের মধ্য দিয়ে। কিন্তু যাত্রার পাঁচ দিন পরই একজন ৭০ বছর বয়সী ডাচ যাত্রী প্রচণ্ড জ্বর ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হন এবং মারা যান। এরপর ১১ এপ্রিল থেকে ২ মের মধ্যে আরও দুজন মারা যান।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) মে মাসের ২ তারিখে বিষয়টি অবহিত হয় এবং পরীক্ষার পর নিশ্চিত হয়; ভয়াবহ হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে সেই জাহাজে। ১০ মে পর্যন্ত ১০টি আক্রান্তের ঘটনা নিশ্চিত হয় এবং ৩ জন মৃত্যুবরণ করেন। শুরু হয় বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের ঢেউ। এই ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এটি আমাদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।

হান্টাভাইরাস কী এবং এর উৎপত্তির ইতিহাস হান্টাভাইরাস কোনো একটি নির্দিষ্ট ভাইরাস নয়, বরং এটি একটি ভাইরাস পরিবার (হান্টাভিরিডি)। এই পরিবারে অনেক প্রজাতি রয়েছে এবং এগুলো মূলত ইঁদুর জাতীয় প্রাণীর মধ্যে বাস করে। বিভিন্ন প্রজাতির ইঁদুর বিভিন্ন ধরনের হান্টাভাইরাস বহন করে এবং সেখান থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমণ ঘটতে পারে।

 

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে হান্টাভাইরাস প্রথম আলোচনায় আসে ১৯৫০’র দশকে কোরিয়ান যুদ্ধের সময়। সেই যুদ্ধে মার্কিন সেনারা দক্ষিণ কোরিয়ায় যুদ্ধ করছিল। হঠাৎ করে তিন হাজারেরও বেশি সৈনিক এক অজানা রোগে আক্রান্ত হয় উচ্চ জ্বর, মাথাব্যথা, বমি এবং তারপর কিডনি বিকল হয়ে পড়া। তাদের মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ মারা যান। চিকিৎসকরা এটিকে তখন ‘কোরিয়ান হেমোরেজিক ফিভার’ নামে চিহ্নিত করেন। কিন্তু এটি যে স্বাভাবিক রোগ, নাকি রাসায়নিক অস্ত্র; তা কেউ বুঝতে পারছিলেন না। এই রহস্যের সমাধান হতে প্রায় ৩০ বছর লেগে যায়। ১৯৮০ সালের কাছাকাছি সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার ভাইরোলজিস্ট ড. হো ওয়াং লি শনাক্ত করেন, এই রোগটি ইঁদুর থেকে আসা একটি ভাইরাসের কারণে হয়। উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হান্টান নদীর নাম অনুযায়ী এই ভাইরাসের নামকরণ করা হয় 'হান্টাভাইরাস'। (তথ্যসূত্র: লি এইচডব্লিউ, এট অল., কোরিয়ান জার্নাল অব ইন্টারনাল মেডিসিন, ১৯৮২; ডব্লিউএইচও হান্টাভাইরাস ফ্যাক্টশিট)

 
 

হান্টাভাইরাসের সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনা ঘটে ১৯৯৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। মে মাসে নাভাহো জাতির ১০ জন সদস্য কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মারা যান। অদ্ভুত বিষয় ছিল, তারা সবাই তরুণ ও সুস্থসবল ছিলেন। প্রাথমিক মৃত্যুহার ছিল ৭৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতি চারজনে তিনজন মারা যাচ্ছিল। বিজ্ঞানীরা বহু চেষ্টার পরও রহস্য উদ্ধার করতে পারছিলেন না। অবশেষে আদিবাসী প্রবীণরা জানালেন, এই রোগ নতুন নয়; তাদের মৌখিক ইতিহাসে এর বিবরণ আছে। ভারী বৃষ্টিতে পাইন বাদাম প্রচুর জন্মায়, তা ইঁদুরের খাবার হয়, ইঁদুরের সংখ্যা বাড়ে, এবং রোগ ছড়ায়। ১৬ জুন ইঁদুর পরীক্ষা করে একই ভাইরাস পাওয়া যায়। এই প্রাদুর্ভাব ১৯৯১-৯২ সালের এল নিনো আবহাওয়া ঘটনার কারণে ত্বরান্বিত হয়েছিল, যা অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ঘটিয়েছিল। (তথ্যসূত্র: সিডিসি এমএমডব্লিউআর, জুন ১৯৯৩; নিকল এসটি এট অল., সায়েন্স, ১৯৯৩)

 

হান্টাভাইরাস মানবদেহে মূলত দুটি ভিন্ন রোগ সৃষ্টি করে। প্রথমটি হলো ‘হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিনড্রোম’ (এইচএফআরএস) যা এশিয়া ও ইউরোপে বেশি দেখা যায়। এতে কিডনি বিকল হয়ে পড়ে এবং শরীরের ভেতরে রক্তপাত ঘটে। ডব্লিউএইচওর তথ্যমতে বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর প্রায় ২ লাখমানুষ এইচএফআরএসে আক্রান্ত হন। দ্বিতীয়টি হলো ‘হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম’ (এইচপিএস) যা উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় বেশি দেখা যায়। এটি ফুসফুসে তরল জমায়, শ্বাসকষ্ট সৃষ্টি করে এবং শেষ পর্যন্ত শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যু হতে পারে। এই সিনড্রোমের মৃত্যুহার ৩৮ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। (তথ্যসূত্র: সিডিসি হান্টাভাইরাস স্ট্যাটিসটিকস; ডব্লিউএইচও হান্টাভাইরাস ফ্যাক্ট শিট, ২০২২)

হান্টাভাইরাস সংক্রমণের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো— এখন পর্যন্ত এফডিএ বা ডব্লিউএইচও অনুমোদিত কোনো ভ্যাকসিন বা সুনির্দিষ্ট চিকিৎসাপদ্ধতি নেই। সংক্রামিত হলে চিকিৎসকরা কেবল সহায়ক চিকিৎসা (সাপোর্টিভ কেয়ার) দিতে পারেন; অর্থাৎ রোগীর উপসর্গ কমানোর চেষ্টা করতে পারেন। এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই সম্পূর্ণ নির্ভর করে রোগীর নিজের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার উপর। এটি একটি ভয়াবহ বাস্তবতা, কারণ ৭০ বছর ধরে পরিচিত হওয়া সত্ত্বেও আমরা এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর ওষুধ বা টিকা তৈরি করতে পারিনি। (তথ্যসূত্র: জনসন সিবি, এট অল., ক্লিনিক্যাল মাইক্রোবায়োলজি রিভিউস, ২০১০)

১৯৯৬ সালে দক্ষিণ আর্জেন্টিনার একটি ঘটনা বিজ্ঞানীদের প্রচলিত ধারণা ভেঙে দেয়। এতদিন বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতেন যে হান্টাভাইরাস ইঁদুর থেকে মানুষে ছড়াতে পারে, কিন্তু মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না। ১৯৯৬ সালে আর্জেন্টিনায় ‘আন্দেস ভাইরাস’ (অ্যান্ডিজ ভাইরাস: এএনডিভি) নামক হান্টাভাইরাস পরিবারের একটি বিশেষ প্রজাতি মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের প্রমাণ দেয়। সমগ্র হান্টাভাইরাস পরিবারে এটিই একমাত্র প্রজাতি যেখানে নিশ্চিতভাবে মানুষ-থেকে-মানুষ সংক্রমণ (হিউম্যান-টু-হিউম্যান ট্রান্সমিশন) নথিভুক্ত হয়েছে। (তথ্যসূত্র: এনরিয়া ডিএ এট অল., মেডিসিনা, ১৯৯৬; মার্টিনেজ ভিপি এট অল., ইমার্জিং ইনফেকশাস ডিজিজেস, ২০০৫)

তবে আশার কথা হলো, এই ভাইরাস কোভিড-১৯ বা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো বায়ুবাহিত (এয়ারবর্ন) নয়। এটি ছড়ানোর জন্য দীর্ঘক্ষণ ঘনিষ্ঠ শারীরিক সম্পর্ক প্রয়োজন। একই বিছানায় শোয়া বা শারীরিক তরলের সংস্পর্শ। সাধারণত পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বা সংক্রামিত রোগীর কাছে থেকে সেবা দেওয়ার সময় এটি ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া এই ভাইরাসের সংক্রমণ উইন্ডো অত্যন্ত ছোট; মাত্র একদিন। অর্থাৎ কেউ আক্রান্ত হলে তার প্রথম এক দিনেই সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। এই কারণে কোভিডের মতো ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনের প্রয়োজন পড়ে না। সেই সাথে ডব্লিউএইচও এখন পর্যন্ত বলছে যে, এই ভাইরাসের বৈশ্বিক ঝুঁকি কম। তবে আক্রান্তদের জন্য এটি অত্যন্ত মারাত্মক।

বৈশ্বিক পরিসংখ্যানের দিক থেকে হান্টাভাইরাস একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য হুমকি। ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ২ লাখ মানুষ হান্টাভাইরাসজনিত রোগে আক্রান্ত হন। এর মধ্যে এইচএফআরএসের মৃত্যুহার শূন্য দশমিক ১ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে প্রজাতিভেদে এবং এইচপিএসের ক্ষেত্রে এই মৃত্যুহার ৩৮ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। চীনে প্রতি বছর গড়ে ৪০ হাজার থেকে ১ লাখ পর্যন্ত এইচএফআরএস কেস রিপোর্ট হয়। (তথ্যসূত্র : ভাহেরি এ এট অল., নেচার রিভিউস মাইক্রোবায়োলজি, ২০১৩; ডব্লিউএইচও, ২০২২)

বিশিষ্ট সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ড. কলিন বাউটিস্তা (ডক্টর কলিন বাউটিস্তা, ইউএস নেভাল মেডিক্যাল রিসার্চ ইউনিট) বলেছেন, হান্টাভাইরাস বিশ্বব্যাপী একটি উপেক্ষিত হুমকি। এটি কেবল আঞ্চলিক সমস্যা নয়, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন এবং এল নিনোর ফলে এর প্রকোপ বাড়ছে।

ভাইরোলজিস্ট ড. স্টুয়ার্ট নিকল (স্টুয়ার্ট নিকল, সিডিসি), যিনি ১৯৯৩ সালের প্রাদুর্ভাব তদন্তে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি বলেন, এই ভাইরাস মানুষকে খুব দ্রুত মেরে ফেলতে পারে। ১৯৯৩ সালে আমরা দেখেছিলাম সুস্থ-সবল তরুণরাও ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মারা যাচ্ছেন। (তথ্যসূত্র : নিকল এসটি এট অল., সায়েন্স ২৬২:৯১৪, ১৯৯৩)

জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৬ সালে একটি শক্তিশালী এল নিনোর আশঙ্কা রয়েছে, যা অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ঘটাবে, ইঁদুরের সংখ্যা বাড়াবে এবং হান্টাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে।

দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন ভারতীয় উপমহাদেশে হান্টাভাইরাস নেই। কিন্তু ২০০৫ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে ভারতের তামিলনাড়ুর ভেলোর জেলায় একটি বহু-প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণায় ২৮টি নিশ্চিত কেস পাওয়া যায়। আক্রান্তদের মধ্যে ছিলেন দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগীরা, গুদামঘরে কর্মরত শ্রমিকরা এবং ইঁদুর ধরার পেশায় নিযুক্ত ইরুলা উপজাতির সদস্যরা। গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষিত ৬৬১ জনের মধ্যে প্রায় ৪ শতাংশ মানুষের শরীরে হান্টাভাইরাস-নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি বিদ্যমান। যারা ইঁদুরের কাছাকাছি থাকেন বা কাজ করেন, তাদের মধ্যে এই হার আরও বেশি ছিল। (তথ্যসূত্র : চ্যান্ডি এস এট অল., জার্নাল অব মেডিক্যাল ভাইরোলজি, ২০০৯)

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই তথ্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ, যেখানে শহর ও গ্রাম উভয় এলাকায় ইঁদুরের উপদ্রব প্রবল। দেশের গুদামঘর, বস্তি, বন্যাকবলিত এলাকা, এমনকি হাসপাতালের আশপাশেও প্রচুর ইঁদুরের উপস্থিতি রয়েছে। প্রতি বছর বন্যায় মানুষ ও ইঁদুর একই স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়, যা সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশের হাওর এলাকা, চরাঞ্চল এবং পাহাড়ি এলাকাগুলো বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। এই সব এলাকায় বন্যার পানি নামলে ইঁদুরের উপদ্রব বাড়ে এবং মানুষ ইঁদুরের বিষ্ঠা ও মূত্রের সংস্পর্শে আসে। হান্টাভাইরাস ইঁদুরের মূত্র, বিষ্ঠা এবং লালার মাধ্যমে ছড়ায়; বিশেষত শুকনো অবস্থায় ধুলোর সাথে শ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশে হান্টাভাইরাস পরিস্থিতি নিরীক্ষণের জন্য কোনো পদ্ধতিগত নজরদারি ব্যবস্থা (সিস্টেমেটিক সার্ভেইল্যান্স) না থাকাটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

হান্টাভাইরাসের মতো একটি বিরল কিন্তু মারাত্মক রোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতা বিশ্লেষণ করলে একটি মিশ্র চিত্র পাওয়া যায়। ইতিবাচক দিকে বলা যায়, বাংলাদেশ সম্প্রতি কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবেলায় উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা দেখিয়েছে ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (আইইডিসিআর) দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে এবং রোগ নজরদারি কার্যক্রম জোরদার করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‌‌‌‌‘ইন্টারন্যাশনাল হেলথ রেগুলেশন’ (আইএইচআর ২০০৫) অনুযায়ী বাংলাদেশ বেশকিছু সক্ষমতা অর্জন করেছে।

তবে দুর্বলতার দিকগুলোও স্পষ্ট। প্রথমত, বাংলাদেশে হান্টাভাইরাস শনাক্তকরণের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত ল্যাবরেটরি সুবিধা সীমিত। পিসিআর-ভিত্তিক হান্টাভাইরাস নির্ণয় পরীক্ষা এখনো ব্যাপকভাবে সরকারি হাসপাতালে পাওয়া যায় না। দ্বিতীয়ত, সাধারণ চিকিৎসক ও মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে হান্টাভাইরাস সম্পর্কে সচেতনতা প্রায় নেই বললেই চলে। এইচএফআরএস বা এইচপিএস’র লক্ষণ দেখলে সাথে সাথে হান্টাভাইরাস সন্দেহ করার মতো প্রশিক্ষণ নেই। তৃতীয়ত, ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি বাংলাদেশে নামমাত্র। কৃষি মন্ত্রণালয় ফসল রক্ষার জন্য ইঁদুর দমনে কিছু পদক্ষেপ নেয়, কিন্তু জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে নগরাঞ্চলে ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত দুর্বল। ঢাকার পুরান ঢাকা, মিরপুর, এবং কামরাঙ্গিরচরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ইঁদুরের উপদ্রব মারাত্মক। চতুর্থত, রোগতাত্ত্বিক নজরদারি ব্যবস্থায় হান্টাভাইরাস তালিকাভুক্ত নেই। বাংলাদেশে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, নিপাহ, ম্যালেরিয়ার মতো রোগের জন্য পৃথক নজরদারি রয়েছে। কিন্তু হান্টাভাইরাসের মতো একটি সম্ভাব্য হুমকি এখনো সেই তালিকায় আসেনি।

বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও মেঘালয়ে ইঁদুরের আধিক্য রয়েছে এবং এই অঞ্চলগুলোতে হান্টাভাইরাস নজরদারি দুর্বল। যেহেতু বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত পার হয়ে মানুষ, পণ্য ও প্রাণীর চলাচল চলমান থাকে, তাই সীমান্তীয় স্বাস্থ্য নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি। এছাড়া কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলো উচ্চ ঘনত্বে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অবস্থিত। এই শিবিরগুলোতে ইঁদুরের প্রকোপ মারাত্মক এবং স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সীমিত। এখানে একটি হান্টাভাইরাস প্রাদুর্ভাব মারাত্মক পরিণতি ডাকতে পারে।

যেহেতু হান্টাভাইরাসের কোনো অনুমোদিত ভ্যাকসিন বা প্রমাণিত চিকিৎসা নেই, তাই প্রতিরোধই হলো একমাত্র কার্যকর উপায়। ব্যক্তিগত পর্যায়ে বাড়িতে ইঁদুর প্রবেশ বন্ধ করতে ফাঁক-ফোকর বন্ধ করতে হবে। গুদামঘর, পুরোনো বন্ধ ঘর, বা ইঁদুর-প্রবণ স্থানে প্রবেশের সময় এন-নাইনটি-ফাইভ মাস্ক ও গ্লাভস পরতে হবে। ইঁদুরের বিষ্ঠা, মূত্র বা মৃত ইঁদুর দেখলে সতর্কতার সাথে পরিষ্কার করতে হবে এবং খাবার খোলা রাখা যাবে না। বর্জ্য সঠিকভাবে নিষ্পত্তি করতে হবে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সরকারকে আইইডিসিআর’র মাধ্যমে হান্টাভাইরাসের জন্য পৃথক নজরদারি কার্যক্রম চালু করতে হবে। শহর ও গ্রামে ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারত, মিয়ানমারসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে তথ্য আদান-প্রদান বাড়াতে হবে। দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে হান্টাভাইরাস গবেষণায় বিনিয়োগ করতে হবে।

হান্টাভাইরাস এমন একটি হুমকি যা বিশ্বজুড়ে দশকের পর দশক ধরে নীরবে মানুষকে সংক্রামিত করছে। এটি কেবল শিরোনামে আসে যখন অনেক মানুষ মারা যায়। ২০২৬ সালের ক্রুজশিপ ঘটনা এই ভাইরাসের বিপদের একটি বাস্তব প্রদর্শনী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখন পর্যন্ত বৈশ্বিক ঝুঁকি কম বললেও, মৃত্যুহার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হওয়া এবং কোনো ভ্যাকসিন না থাকার বিষয়টি একটি দেশের জন্য; বিশেষত ঘনবসতিপূর্ণ ও দুর্বল স্বাস্থ্য অবকাঠামোর দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে ইঁদুরের আধিক্য, বন্যার প্রকোপ, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিপুল উপস্থিতি এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সেখানে হান্টাভাইরাসকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সচেতনতা ও প্রতিরোধই আমাদের হাতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।

লেখক: মানবাধিকার কর্মী, গবেষক ও পর্যবেক্ষক; ডেমোক্রেসি উইদাউট বর্ডার্স, প্যারিস, ফ্রান্স

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ] দৈনিক কালবেলা