Image description

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার খর্ণিয়া ইউনিয়নের পাঁচপোতা কমিউনিটি ক্লিনিক। ৫ মিনিটের মধ্যেই স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে ওষুধ নিতে এলেন তিন রোগী। একেক জনের একেক সমস্যা। কিন্তু কাউকেই প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া গেল না।

ঘটনাটি গত ২০ এপ্রিল দুপুরের। ৪৫ বছর বয়সী জিয়াউর জোয়ার্দ্দার গিয়েছিলেন ব্যথার ওষুধ নিতে, ষাটোর্ধ্ব আবুল হোসেন শরীরে দুর্বলতা কমানোর এবং হীরা বেগম (৩০) অ্যালার্জির ওষুধ নিতে গিয়েছিলেন। ব্যথানাশক, অ্যালার্জি প্রতিরোধী কিংবা ভিটামিন; কোনো ধরনের ওষুধই সে সময় ছিল না ওই কমিউনিটি ক্লিনিকে।

এটি শুধু একটি ক্লিনিকের চিত্র নয়, খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় জ্বর, কাশি-সর্দি, দুর্বলতা ও গ্যাস্ট্রিক সমস্যা নিয়ে শত শত মানুষ আশপাশের কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসা ও বিনামূল্যের ওষুধ নিতে যাচ্ছেন। কিন্তু তাদের ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। ফলে বাধ্য হয়ে দূরের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে বা বেসরকারিভাবে চিকিৎসক দেখিয়ে ওষুধ নিচ্ছেন তারা। এতে ভোগান্তির পাশাপাশি ব্যয় হচ্ছে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ।

প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে গ্রামীণ জনপদে শুরু হওয়া সরকারের এ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে ওষুধ সরবরাহের অভাবে। অথচ এই কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতেই সরকারিভাবে ২১ ধরনের ওষুধ সরবরাহ হওয়ার কথা। স্বাস্থ্য বিভাগ খুলনার পরিচালকের দপ্তর থেকে জানা গেছে, বিভাগে ১ হাজার ৭২১টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এর মধ্যে খুলনা জেলায় ২১৪টি, বাগেরহাটে ২১৫, সাতক্ষীরায় ২৩২, যশোরে ২৮৪, ঝিনাইদহে ১৮৫, মাগুরায় ৯৯, নড়াইলে ৯৬, কুষ্টিয়ায় ২০৪, চুয়াডাঙ্গায় ১২০ ও মেহেরপুরে ৭২টি ক্লিনিক রয়েছে। বাগেরহাট জেলায় চারটি ও যশোর জেলায় একটি ক্লিনিক বন্ধ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোয় দীর্ঘদিন ধরে মানুষ গিয়ে কোনো ধরনের ওষুধ পাচ্ছেন না। স্বাভাবিকভাবেই তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অসন্তোষ।

অভিযোগের সত্যতা মেলে যশোরের শার্শা উপজেলার গোগা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের আমলাই কমিউনিটি ক্লিনিকে। জ্বর ও কাশি নিয়ে গত ২২ এপ্রিল সেখানে গিয়েছিলেন আব্দুস সাত্তার (৬২) এবং গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ নিতে যান হামিদা বেগম (৪৫)। কারও সমস্যার ওষুধই মেলেনি।

ক্ষোভের সঙ্গে আব্দুস সাত্তার বললেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। ছোটখাটো অসুখ হলি কিলিনিক থেকে ওষুধ পাতাম। কিন্তু অনেক দিন ওষুধ পাচ্ছিনে। আইজও এসে পাইনি। কবে পাব, কেউ কিছু বলতিও পারে না।’

দূর-দূরান্তে গিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ কিনে খাওয়া বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে সরকারি ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ সংগ্রহ করা এলাকার দরিদ্র ও অশিক্ষিত মানুষের পক্ষে দুঃসাধ্য— এমনটাই বলছিলেন দুই রোগী।

ক্লিনিকটির হেলথ প্রোভাইডার তহিদুর রহমান জানালেন, গত ১৯ আগস্ট নানা ধরনের ওষুধ পাওয়া গিয়েছিল তিন কার্টন। এরপর আর কোনো ওষুধ সরবরাহ নেই। জ্বর, সর্দি, কাশি, গ্যাস এবং অ্যালার্জি সমস্যা নিয়ে প্রতিদিনই ৪৫ থেকে ৫০ রোগী এসে ফিরে যাচ্ছেন।

সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা কমিউনিটি ক্লিনিকে আসা রোগী শরিফুল ইসলাম জানালেন, এই কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসা ও ওষুধ নিতে আসেন ইউনিয়নের চারটি ওয়ার্ডের মানুষ। সবশেষ গত বছর ওষুধ পাওয়া গিয়েছিল। এরপর আর ওষুধ মিলছে না। ফলে প্রাথমিক ও জরুরি চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন উপকূলীয় এ উপজেলার মানুষ।

যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা জানালেন, কমিউনিটি ক্লিনিক সহায়তা ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে অপারেশনাল প্ল্যানে (ওপি) ওষুধ বরাদ্দ দেওয়া হতো। কিন্তু সেই বরাদ্দ বন্ধ আছে। বর্তমান সরকার আবার তা চালুর চেষ্টা করছে, বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।

আগামী দেড় মাসের মধ্যে ওষুধ সরবরাহ চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানালেন তিনি।

ক্লিনিকগুলোয় ওষুধ না থাকার কথা স্বীকার করলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের খুলনার বিভাগীয় (ভারপ্রাপ্ত) পরিচালক ডা. মো. মুজিবুর রহমান। তিনি বললেন, ‘অপারেশনাল প্ল্যান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওষুধ সরবরাহ নেই। তবে ফের ওষুধ সরবরাহ চালুর জন্য আলোচনা চলছে ট্রাস্টি বোর্ড ও মন্ত্রণালয়ের মধ্যে, চেষ্টা করা হচ্ছে দ্রুত সমাধানের।’