Image description

আওয়ামী লীগ আমলের শেষ আট বছরে বৈদেশিক খাতের আয়-ব্যয়ের হিসাবে অস্বাভাবিক ঘাটতি পাওয়া গেছে। ওই সময়ে (২০১৬-২৪) এর অঙ্ক দাঁড়িয়েছে পৌনে ৮ লাখ কোটি টাকা (৬৩.২৩ বিলিয়ন ডলার)। দেশ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচার, বৈদেশিক মুদ্রার অব্যবস্থাপনা ও আর্থিক অনিয়মের কারণেই মূলত সৃষ্টি হয়েছে এমন পরিস্থিতির। খোদ অর্থ বিভাগের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য।

অর্থ বিভাগের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স থেকে ডলার আয় বাড়লেও সেই বৈদেশিক মুদ্রা অর্থনীতিতে টেকসই হচ্ছে না। অর্থাৎ রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও সেবা খাত থেকে আয় করা ডলারের চেয়ে আমদানি ব্যয়, ঋণের সুদ ও মুনাফার নামে বৈদেশিক মুদ্রা বেরিয়ে গেছে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক পথে।

বৈদেশিক খাতের আয়-ব্যয়ের হিসাবে যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকে, সেগুলো হলো— আমদানি, রপ্তানি, রেমিট্যান্স, সেবা ও প্রাথমিক আয়। এটি ‘চলতি হিসাব’ নামে পরিচিত।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশ্বের একাধিক দেশে একই ধরনের পরিস্থিতি বড় অর্থনৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে শ্রীলঙ্কার কথা উল্লেখ করা যায়। দেশটি কয়েক বছর ধরে বড় চলতি হিসাব ঘাটতি ও বৈদেশিক ঋণের চাপে ছিল। রিজার্ভ কমে যাওয়ার পর আমদানি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং শেষ পর্যন্ত জ্বালানি ও খাদ্যসংকটে সরকার দেউলিয়াত্বের মুখে পড়ে। পাকিস্তানও দীর্ঘদিন ধরে চলতি হিসাব ঘাটতি, বৈদেশিক  ঋণনির্ভরতা ও দুর্বল রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনার কারণে মুখোমুখি হয়েছে আইএমএফের কঠিন শর্তের। যদিও বাংলাদেশ সে ধরনের কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েনি। কারণ, দেশের রপ্তানি খাত এখনো কার্যকর, প্রবাসী আয় প্রবাহও উল্লেখযোগ্য। তবে এ বিষয়ে সতর্ক না হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মতো বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে— এমন আশঙ্কা অর্থনীতিবিদদের।

এদিকে টানা কয়েক বছরের চলতি হিসাবে ঘাটতির কারণে প্রথম ধাক্কা লাগে মুদ্রার মানে। বাংলাদেশেও গত কয়েক বছরে টাকার অবমূল্যায়ন দ্রুত বেড়েছে। এক ডলারের মূল্য উঠেছে ৭৯ থেকে ১২২ টাকায়। ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে আমদানি ব্যয় বেড়েছে, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি হয়েছে তীব্র। বিশেষ করে ওই সময় পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির হার বেড়েছে প্রায় ৯১ শতাংশ। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বাজারে ডলার বিক্রি করে রিজার্ভ কমাতে হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত চাপের মধ্যে ফেলছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের আর্থিক খাতের চালক হিসেবে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন। এর আগে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব শেষ করেন। তবে চলতি হিসাবে বড় ঘাটতির পেছনে অর্থ পাচার ও আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনার বিষয়টি সাবেক অর্থ উপদেষ্টা নিজেই শনাক্ত করেছেন। অর্থ উপদেষ্টার মেয়াদ শেষে বিদায়ের আগে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর একটি গোপন নথি রেখে গেছেন বর্তমান অর্থমন্ত্রীর জন্য। সেখানে অর্থ পাচার ও আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনার কারণে গত আট বছরের যে চলতি হিসাবের ঘাটতি ছিল, সেটি তুলে ধরেছেন।

ওই নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত ৬৩.২৩ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি ধরা পড়ে চলতি হিসাবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয়েছে ২০২১-২২ অর্থবছরে (১৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার)।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঘাটতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১১.৬০ বিলিয়ন ডলার এবং তৃতীয় হচ্ছে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৯ দশমিক ৫৬ ডলার। এ ছাড়া ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সোয়া ৫ বিলিয়ন ডলার এবং ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫ বিলিয়ন ডলারের নিচে ছিল। আর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ঘাটতি ছিল ২ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালে ৫ আগস্ট ক্ষমতার পটপরিবর্তন হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতায় আসার আগের অর্থবছরে (২০২৩-২৪) এ ঘাটতি হয়েছিল ৬.৬ বিলিয়ন ডলার।

গত কয়েক বছর বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের বিষয়টি বিভিন্ন গবেষণা বা আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে আসে। কিন্তু সরকারি কোনো প্রতিবেদনে কখনোই অর্থ পাচারে বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। সরকারের প্রতিবেদনে বড় অঙ্কের ডলারের ঘাটতির নেপথ্যে অর্থ পাচার ও আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনার স্বীকারোক্তিকে সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

‘অনেকেই বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে নিয়ে গিয়ে সেখানেই রেখে দিয়েছেন’— আগামীর সময়ের কাছে এমন মন্তব্য করেছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তার মতে, ওই উল্লিখিত সময়ে কৃত্রিমভাবে ডলারের বিনিময় হার ধরে রাখা হয়। এতে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট এবং চলতি হিসাবের ঘাটতি আরও বেড়ে যায়। তিনি মনে করেন, ট্রেড ব্যালান্স বরাবরই ঋণাত্মক থাকে। তবে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স সেই ঘাটতি অনেকটা সামাল দেয়। কিন্তু বাস্তবে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের বাইরে বা অবৈধ উপায়ে দেশে এসেছে। অর্থ পাচার, অবৈধ পথে অর্থ স্থানান্তর, দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং ডলারের বিনিময় হার নিয়ে অস্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণের কারণে হিসাবে এ ঘাটতি সৃষ্টি হয়।

এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার ভাষ্য, সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, এ সংকট এমন সময়ে সামনে আসছে, যখন দেশের আর্থিক খাত রয়েছে নিজেই দুর্বল অবস্থায়। খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে, মূলধন ঘাটতি বাড়ছে ব্যাংকগুলোর এবং আর্থিক খাতে সুশাসনের অভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও উদ্বেগ জানাচ্ছে। ফলে চলতি হিসাবের ঘাটতি শুধু বৈদেশিক খাতের সমস্যা নয়; এটি পুরো অর্থনীতির ভঙ্গুরতা বাড়িয়ে তুলছে।

চলতি হিসাবের বড় ঘাটতির পেছনে অর্থ বিভাগের ধারণা, বিদেশে অর্থ পাচার হয়েছে। আর দেশ থেকে অর্থ পাচারের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে আমদানি ও রপ্তানির পথ। সরকারের নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৬-২৪— এই আট বছরে রপ্তানিতে আয় ৩২ হাজার ৭৩৫ কোটি মার্কিন ডলার হলেও আমদানির নামে চলে গেছে ৫১ হাজার ৭১২ কোটি ডলার। প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলার আমদানি বেশি হয়েছে।

জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি আগামীর সময়কে বলেছেন, চলতি হিসাবে বড় ধরনের ধারাবাহিক ঘাটতি অর্থনীতিতে বড় কয়েকটি ঝুঁকি তৈরি করে। প্রথমত, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ, রপ্তানি আয় ও রিজার্ভ কমে গেলে সরকারের জন্য ঋণের কিস্তি পরিশোধ ব্যয়বহুল হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মনে করেন, ডলার সংকট থাকলে ভবিষ্যতে মুনাফা দেশে নিতে সমস্যা হতে পারে। তৃতীয়ত, ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট বাড়ে। আমদানিকারকদের এলসি খোলা কঠিন হয়ে পড়ে, শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং প্রবৃদ্ধি কমে যায়।