গাইবান্ধা জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ভয়াবহ কালবৈশাখী ঝড়ে তিনটি উপজেলা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। রবিবার ও সোমবার (১৮ মে) দফায় দফায় আঘাত হানা এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে সুন্দরগঞ্জ, সদর ও ফুলছড়ি উপজেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পুরো সুন্দরগঞ্জ উপজেলা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে, সদর ও ফুলছড়ির চরাঞ্চলে চার শতাধিক পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন।
রবিবার (১৭ মে) গভীর রাতে প্রথম আঘাত আসে সুন্দরগঞ্জে। রাত আড়াইটার দিকে শুরু হয়ে ভোর ৪টা পর্যন্ত স্থায়ী হয় দেড় ঘণ্টাব্যাপী এই কালবৈশাখী ঝড়। প্রচণ্ড বেগে বাতাস আর অতি ভারী বর্ষণে পৌরশহরসহ পুরো উপজেলা লন্ডভন্ড হয়ে যায়।
ঝড়ের তাণ্ডবে পৌর শহরের মীরগঞ্জ বাজারের একটি বিশাল বটগাছ আংশিক হেলে পড়ে। গাছটির বড় বড় ডালপালা ভেঙে আশপাশের ১০ থেকে ১২টি দোকানঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে আরেকটি পুরোনো বটগাছ সম্পূর্ণ উপড়ে আছড়ে পড়ে সুন্দরগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ওপর। এতে বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষ ও চারটি শ্রেণিকক্ষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উপজেলার বিভিন্ন সড়কে অসংখ্য গাছ উপড়ে পড়ায় সড়ক যোগাযোগও বিঘ্নিত হয়।
কৃষি খাতেও আঘাত এসেছে ব্যাপকভাবে। ঝড়ের সঙ্গে মুষলধারে বৃষ্টি হওয়ায় কৃষকের অবশিষ্ট পাকাধান ও বিভিন্ন পাটক্ষেত সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন উপজেলার কৃষকেরা। বিভিন্ন গ্রামে অসংখ্য বসতবাড়িও আংশিক বা সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে।
সবচেয়ে বড় বিপর্যয় নেমে আসে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায়। সুন্দরগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্রে জানা গেছে, ঝড়ে ১২টি বৈদ্যুতিক খুঁটি সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে, ৬টি খুঁটি মারাত্মকভাবে হেলে পড়েছে, প্রায় ৩০টি স্থানে বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে এবং শতাধিক স্পটে গাছ ভেঙে লাইনের ওপর আছড়ে পড়েছে। এছাড়া ৬টি ট্রান্সফরমার সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। পুরো উপজেলা এখন অন্ধকারে নিমজ্জিত।
সুন্দরগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডিজিএম মো. আব্দুল বারী জানিয়েছেন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ব্যাপক হওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে বেশ সময় লাগবে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিসহ বিভিন্ন অফিসের ২১টি টিম বর্তমানে মাঠে কাজ করছে। জোনাল ম্যানেজারের নির্দেশনায় একটি টেকনিক্যাল টিমও তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। সদর দপ্তর থেকেও নতুন বৈদ্যুতিক খুঁটি আনা হয়েছে।
সুন্দরগঞ্জের এই দুর্ভোগের মধ্যেই সোমবার (১৮ মে) ভোরে আরেক দফা আকস্মিক ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে গাইবান্ধা সদর ও ফুলছড়ি উপজেলার বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলে। ভোররাতে হঠাৎ করেই তীব্র বেগে বয়ে যাওয়া এই ঝড় মূহূর্তেই লন্ডভন্ড করে দেয় সদর উপজেলার কামারজানী ইউনিয়নের খারজানী চর এবং ফুলছড়ি উপজেলার ফজলুপুর ইউনিয়নের বুলবুলির চর ও চর চৌমোহনী এলাকা।
স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের বরাতে জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে চার শতাধিক ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। অসংখ্য গাছপালা উপড়ে গেছে এবং ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঘরবাড়ি হারিয়ে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে অনেক পরিবার এখন খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।
খারজানী চরের বাসিন্দা কুলছুম বেগম একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। তিনি বলেন, ঝড়ে তাঁর ঘরবাড়ি সব শেষ হয়ে গেছে। ঘরে থাকা ৪০ হাজার টাকা আর কাপড়চোপড় সব বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে গেছে। এখন মাথা গোঁজার কোনো ঠাঁই নেই, নতুন করে ঘর তোলার সামর্থ্যও নেই।
একই চরের জবা বেগম জানালেন তার অসহায়ত্বের কথা। ছোট ছোট শিশুদের নিয়ে রাত কাটানোর কোনো উপায় নেই। ঘর তো নেই-ই, রান্না করে খাওয়ার মতো ন্যূনতম অবস্থাও অবশিষ্ট নেই।
ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ার সময় বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। খারজানী চরের তৈবন বেগম নামের এক নারী ঘর ধসে পড়ার সময় বাঁ চোখে মারাত্মক আঘাত পান। তবে চরাঞ্চল হওয়ায় এবং যাতায়াতের জন্য পর্যাপ্ত নৌকার অভাব থাকায় তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।
কামারজানী ও ফজলুপুর ইউনিয়নের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত চরাঞ্চলের মানুষের জন্য জরুরি ভিত্তিতে শুকনো খাদ্য, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং ঘর মেরামতের জন্য ঢেউটিন বা নগদ অর্থ সহায়তা প্রয়োজন। দীর্ঘ মেয়াদে এই বিধ্বস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।