Image description

ফারাক্কার প্রভাবে রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের কমপক্ষে ৪০টি নদী অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। সেই সঙ্গে বিলুপ্ত হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণী, ডলফিন, ঘড়িয়াল।

পদ্মার ইলিশ এখন প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। বিরূপ প্রভাব পড়েছে প্রমত্তা পদ্মাসহ পরিবেশের ওপরও। শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা এখন ধু ধু বালুচরে রূপ নিচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী বিভাগে ৪০টিরও বেশি নদ-নদী ও খাল বর্তমানে দখল ও দূষণের কারণে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে।

দুই যুগ আগেও এসব নদীতে পর্যাপ্ত নাব্যতা ও পানিপ্রবাহ ছিল। কিন্তু ফারাক্কার প্রভাবে শুষ্ক ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

এদিকে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লং মার্চের ৫০ বর্ষপূর্তি উপলক্ষে গত শনিবার রাজশাহীর বড়কুঠী পদ্মাপারে গণজমায়েত করে নদী বাঁচাও আন্দোলন কমিটি। এই গণজমায়েতে বক্তারা নতুন গঙ্গাচুক্তিতে বাংলাদেশের ন্যায্য পানির হিস্যা নিশ্চিত করার দাবি জানান।

এ সময় বক্তারা বলেন, পদ্মার পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন-জীবিকা মারাত্মক সংকটে পড়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৬ সালের ১৬ মে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত ফারাক্কা লং মার্চ বাংলাদেশের পানি অধিকার আন্দোলনে অন্যতম বড় গণজাগরণ তৈরি করে। সেদিন রাজশাহীর মাদরাসা ময়দান থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট পর্যন্ত লাখো মানুষ পদযাত্রায় অংশ নিয়েছিল।

জানা গেছে, পাঁচ দশকে ফারাক্কার প্রভাবে গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় নেমে এসেছে। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীর তলদেশ পলি ও বালুতে ভরাট হচ্ছে।

নদীকেন্দ্রিক জীবিকা হারিয়েছে লাখো মানুষ। জানা গেছে, ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি গঙ্গায় পানিপ্রবাহ ছিল ৯০ হাজার ৭৩০ কিউসেক। ২০২৪ সালের একই দিনে তা কমে দাঁড়ায় ৭৫ হাজার ৪০৯ কিউসেকে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে প্রবাহ কমেছে ১৫ হাজার ৩২১ কিউসেক।

পরিবেশবিদ ও নদী বাঁচাও আন্দোলন কমিটি রাজশাহীর আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট এনামুল হক বলেন, ‘ফারাক্কার প্রভাবে উত্তরাঞ্চলে সেচ সংকট তীব্র হয়েছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের বেশির ভাগ গভীর নলকূপ প্রায় অকেজো হয়ে পড়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দিনের পর দিন নিচে নেমে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা অনেক আগে থেকেই নদী বাঁচাও আন্দোলন করে যাচ্ছি। তবে মূল বিষয়টি হলো, ভারত আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করে গঙ্গাসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানি একতরফাভাবে সরিয়ে নিচ্ছে। এ কারণে পদ্মা থেকে শুরু করে শাখা-উপশাখা নদীগুলো শুষ্ক মৌসুমের আগেই শুকিয়ে যাচ্ছে। আর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এ অঞ্চলের মানুষের ওপর। এ ছাড়া শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে রাজশাহী অঞ্চলে কয়েক হাজার হেক্টর জমির চাষাবাদ বিঘ্নিত হচ্ছে।

জানা গেছে, পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এরই মধ্যে এ প্রকল্পের অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে মরা পদ্মা প্রাণ ফিরে পাবে বলেও মনে করছেন নদী বিশ্লেষকরা। রাজশাহী বিভাগের মৃতপ্রায় নদী ও খাল পুনরুদ্ধারে দখলমুক্তকরণ, সংস্কার ও খনন শুরু করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বিভাগের আটটি জেলার নদী ও খাল খননের কাজও শুরু করেছে সরকার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, ‘ফারাক্কার মারাত্মক প্রভাব পড়েছে নদী অববাহিকার জীবনযাত্রায়। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পানি না পেয়ে পদ্মা মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। পদ্মা ব্যারাজ নির্মিত হলে রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্যন্ত নদীর পানির স্তর উঁচু রাখা সম্ভব হবে। সংরক্ষিত পানি বিভিন্ন নদীপথে সরবরাহ করে শুকনো মৌসুমেও পানিপ্রবাহ সচল রাখা যাবে।’

রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, ‘আমরা এখন ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। পদ্মা ব্যারাজ হলে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করে সেচ দেওয়া সম্ভব হবে। এতে কৃষক যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি দীর্ঘদিনের পানির সংকটও অনেকটা কমবে।’