কোরবানির ঈদ ঘিরে দেশের বিভিন্ন এলাকার খামারে খামারে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা। রাজধানীসহ দেশের সর্বত্র প্রস্তুত হচ্ছে পশুর হাট। তবে এবারের কোরবানির বাজারে স্বস্তির চেয়ে অস্বস্তিই বেশি। পশুখাদ্য, শ্রমিক, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খরচ লাগামহীন থাকায় পশুর ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন খামারিরা।
সরকার বলছে, দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর সংকট নেই। বরং চাহিদার চেয়ে প্রায় ২২ লাখ বেশি পশু প্রস্তুত রয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ের খামারিরা বলছেন, ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, পশু আছে ঠিকই, কিন্তু উৎপাদন খরচ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, কাঙ্ক্ষিত দাম না পেলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বেন তারা। ফলে কোরবানির পশুর দাম গতবারের চেয়ে বেশ বাড়তে পারে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর দাম বাড়ার শঙ্কাই বেশি। খামারিরা যেমন খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায়, তেমনি সাধারণ ক্রেতারাও অপেক্ষায় আছেন শেষ পর্যন্ত কোরবানির পশুর দাম কোথায় গিয়ে ঠেকে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দেশে কোরবানির পশুর সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে এক কোটি এক লাখ ছয় হাজার ৩৩৪টি। এর বিপরীতে প্রস্তুত রয়েছে এক কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। এর মধ্যে গরু-মহিষ ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি, ছাগল-ভেড়া ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি এবং অন্যান্য প্রজাতির পশু পাঁচ হাজার ৬৫৫টি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মাঠ পর্যায়ে কত পশু হাটে ওঠে, কত বিক্রি হয়, আর কত পশু অবিক্রীত থেকে খামারে ফেরত যায়– সেই বিষয়ে নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। ফলে উৎপাদনের সরকারি হিসাব বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতাও খামারিদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, করোনার আগে দেশে বছরে এক কোটির বেশি পশু কোরবানি হতো। তবে করোনার পর থেকে সেই সংখ্যা কমে গেছে। ২০২১ সালে কোরবানিযোগ্য পশু ছিল প্রায় এক কোটি ১৯ লাখ, অথচ কোরবানি হয়েছিল ৯০ লাখের কিছু বেশি পশু। প্রায় ২৮ লাখ পশু বিক্রি হয়নি। গত বছরও ৩৩ লাখের বেশি পশু অবিক্রীত ছিল। ফলে এবারও অনেক খামারি শঙ্কা করছেন, চাহিদা প্রত্যাশার চেয়ে কম হলে আবারও লোকসান গুনতে হতে পারে।
ঢাকায় ঘাটতি, উত্তরাঞ্চলে উদ্বৃত্ত
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামে এবার কোরবানির পশুর ঘাটতি রয়েছে। ঢাকায় সম্ভাব্য চাহিদা ২১ লাখ ৫৮ হাজার ৮৬৯টি হলেও প্রাপ্যতা ধরা হয়েছে ১৪ লাখ ৪৩ হাজার ৯৪২টি। অর্থাৎ, ঘাটতি প্রায় সাড়ে সাত লাখ। চট্টগ্রামেও প্রায় ৫০ হাজার পশুর ঘাটতির তথ্য রয়েছে। অন্যদিকে, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও ময়মনসিংহ বিভাগে বড় ধরনের উদ্বৃত্ত রয়েছে। শুধু রাজশাহী বিভাগেই চাহিদার চেয়ে প্রায় ১৯ লাখ বেশি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। ফলে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলো থেকেই মূলত রাজধানীর বাজারে গরু আসবে।
খাদ্যের দামেই বাড়ছে ব্যয়
খামারিদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ পশুখাদ্যের বাজার নিয়ে। তারা বলছেন, গত দুই বছরে দানাদার খাদ্যের দাম বস্তাপ্রতি ৪০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ভুসি, খইল, খুদ, খড়, ঘাসসহ সবকিছুর দাম বেড়েছে। পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরি ও বিদ্যুৎ খরচও বেড়েছে।
রাজধানীর মেরাদিয়া এলাকার আদিল ডেইরি ফার্মের মালিক আদিল হোসেন জানান, কুষ্টিয়া থেকে গরু এনে খামারে রাখা হচ্ছে। এবার তাঁর খামারে ১৫০ থেকে ২০০ গরু তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে মাঝারি আকারের গরুর দাম এবার বেশি থাকবে। তিনি বলেন, পশুখাদ্যের খরচ বাড়ার কারণে আগে যে গরু এক লাখ টাকার একটু বেশি দামে বিক্রি হতো, এবার সেই গরু দেড় লাখের কাছাকাছি যেতে পারে।
ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় সামারাই ক্যাটল ফার্ম লিমিটেডেও এখন কোরবানির প্রস্তুতি চলছে। খামারটির মালিক ও বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি নিলয় হোসেন বলেন, আমার এখানে ২০০ থেকে এক হাজার ১০০ কেজি ওজনের গরু রয়েছে। তবে বড় গরুর চাহিদা এবার কম থাকবে। তিনি বলেন, গরুর খাদ্যের দাম, পরিবহন খরচ, শ্রমিকের মজুরিসহ সবকিছু বেড়েছে। আগে যে মাঝারি গরু এক লাখ টাকায় পাওয়া যেত, এবার সেটি দেড় লাখে যেতে পারে। তিনি বলেন, অতীতে দেখা গেছে বড় গরু কিনলে ক্রেতাকে নানা ঝামেলায় পড়তে হয়েছে। ফলে বড় গরুর ক্রেতারা খামারে আসছেন না। এতে বড় খামারিরা লোকসানে পড়বেন। অনেক খামারি খামার বন্ধ করে দিয়েছেন।
পাবনার বেড়া উপজেলার খামারি লালচাঁদ মোল্লা বলেন, গত বছরের চেয়ে গমের ভুসির বস্তা ৩০০ টাকা, মসুরের ভুসি ২০০ টাকা, ধানের গুঁড়া ৩০০ টাকা বেড়েছে। খড়ের দামও অনেক বেশি। তাঁর হিসাবে, প্রতি মণ গরু পালনে এখন খরচ পড়ছে প্রায় ২৮ হাজার টাকা। শ্রমিক রেখে পালন করলে সেই খরচ আরও বাড়ে। তিনি বলেন, ৩৩ থেকে ৩৪ হাজার টাকা মণ দর না পেলে লাভ করা সম্ভব নয়।
নওগাঁর খামারি একরামুল হাসান বলেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা দানাদার খাবারের বাজার নিয়ন্ত্রণ নেই। তিন মাসে বস্তাপ্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা বেড়েছে।
গাইবান্ধার খামারিরাও একই অভিযোগ তুলেছেন। তাদের ভাষ্য, আগে যে খাবার ৪০ টাকায় কেনা যেত, এখন সেটি ৬০ টাকা। চুয়াডাঙ্গার খামারিরা বলছেন, এবার তীব্র গরম ও লোডশেডিং নতুন করে ব্যয় বাড়িয়েছে। গরুকে সুস্থ রাখতে সারাক্ষণ বৈদ্যুতিক পাখা চালানো, পানি ছিটানো ও ঠান্ডা পরিবেশ নিশ্চিত করতে হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ বিল ও শ্রম খরচ বেড়েছে কয়েক গুণ।
পরিবহন, হাটের হাসিল, মধ্যস্বত্বভোগীর কমিশনসহ সবকিছু যোগ হয়ে রাজধানীর বাজারে দাম আরও বাড়বে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। গাবতলীর গরু ব্যবসায়ী তৈয়ব আলী বলেন, খামার থেকেই দাম বেশি। মাঝারি গরুতে অন্তত ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা বাড়তি পড়ছে। ছোট আর বড়– দুই ধরনের গরুতেই এবার দাম বাড়বে।
বড় গরুতে ঝুঁকি, বাড়ছে ছোট গরুর চাহিদা
বাজার বিশ্লেষক ও খামারিরা বলছেন, বড় গরুর চেয়ে এবার ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা বেশি থাকবে। কারণ, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
জয়পুরহাটের খামারি সাগর হোসেনের অভিজ্ঞতা এখন অনেকের জন্য সতর্কবার্তা। ২০২৪ সালে প্রায় এক হাজার কেজি ওজনের একটি গরু বিক্রি না হওয়ায় তিনি আরও এক বছর লালন-পালন করেন। পরে সেটি আগের চেয়ে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। এতে দেড় লাখ টাকার বেশি অতিরিক্ত খরচ গুনতে হয়েছে তাঁকে। তিনি বলেন, এত বড় গরু পালার সাহস এখন আর পাই না।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন জয়পুরহাটের আরেক খামারি সুমন হোসেন। তিনি বলেন, এবার বড় গরু কম রেখেছি। ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি।
খামারিদের বড় উদ্বেগ ভারতীয় গরুর অবৈধ প্রবেশ। তারা বলছেন, সীমান্ত দিয়ে গরু ঢুকলে দেশি খামারিরা ন্যায্যমূল্য পাবেন না। পাবনার খামারি লালচাঁদ মোল্লা বলেন, ভারতের গরু এলে স্থানীয় খামারিরা বড় ক্ষতিতে পড়বেন।
কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সীমান্তবর্তী হাট বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে বিদেশি গরু বাজারে প্রবেশ করতে না পারে। তিনি বলেন, খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার কাজ করছে। উৎপাদন খরচ বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু অযৌক্তিকভাবে দাম যেন না বাড়ে সে বিষয়েও নজর রাখা হবে।
গতকাল রোববার বগুড়ায় প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প আয়োজিত এক সেমিনারে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, খামারির স্বার্থ সুরক্ষা এবং স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থাকে টেকসই করতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। সরকারের লক্ষ্য এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যেখানে একদিকে খামারিরা তাদের উৎপাদিত পশুর ন্যায্যমূল্য পাবেন, অন্যদিকে সাধারণ ভোক্তারাও সহনীয় দামে কোরবানির পশু কেনার সুযোগ পাবেন।