Image description

কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি সিন্ডিকেটগুলোর অন্যতম প্রধান টার্গেট হয়ে উঠেছে হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। বিশেষ করে দুবাই-কেন্দ্রিক স্বর্ণ চোরাচালান চক্রগুলো সম্প্রতি অভিনব সব উপায়ে সক্রিয় হয়ে ওঠার চেষ্টা চালাচ্ছে।

ঢাকা কাস্টমস হাউস সূত্র জানিয়েছে, ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পরিচালিত শতাধিক অভিযানে বিমানবন্দর থেকে মোট ১ হাজার ৮৮০ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। একই সময়ে বৈধভাবে আসা স্বর্ণবার ও অলঙ্কার থেকে সরকার মোট ২৩৮ কোটি টাকা শুল্ক-কর আদায় করেছে।

এই ছয় বছরের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে স্বর্ণ চোরাচালান কমে আসলেও একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ উদ্ধারের পরও হয়তো এই রুটে চোরাকারবারিরা সফল হতে পারছে। সেকারণেই ঝুঁকি নিয়েও এই চক্র চোরাচালান চালিয়ে যাচ্ছে। গত ২৮ মার্চ দুবাই ফেরত বিমানের ফ্লাইটের টয়লেট থেকে ৪৭ কোটি টাকা মূল্যের ১৮ কেজি স্বর্ণবার জব্দের ঘটনাটি সেটাই প্রমাণ দেয়। আর দায়িত্বশীলরা বলছেন, আগের তুলনায় নজরদারি অনেক বেড়েছে। আর সেকারণেই প্রতিনিয়ত এই ঘটনাগুলো কমে আসছে।

৫ বছরের স্বর্ণ জব্দ ও মামলার পরিসংখ্যান

ঢাকার কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় ৬৯৮ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে। একইভাবে পরের ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫৫৫ কেজি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জব্দ স্বর্ণের পরিমাণ ৪১৭ কেজি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৬৯ কেজি স্বর্ণ জব্দ হয়েছে। আর চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, মার্চ মাস পর্যন্ত স্বর্ণ ধরা পড়েছে মাত্র ৪৩ কেজি ৫১১ গ্রাম।

 

ঢাকা কাস্টম হাউসের যুগ্ম কমিশনার (জেসি) কামরুল হাসান বলেন, ‘বিধিবহির্ভূতভাবে এই স্বর্ণগুলো নিয়ে আসে যাত্রী ও চোরাচালানি চক্র। চোরাচালান প্রতিরোধে কাস্টমস নজরদারিসহ বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। বিনা শুল্কে কোনও স্বর্ণ যেন পাচার না হতে পারে, সেজন্য সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে।’

অপরদিকে বিমানবন্দর থানার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত স্বর্ণ চোরাচালানের অভিযোগে মোট ৫৩৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে ১১৪টি, ২০২২ সালে ১৩৫টি, ২০২৩ সালে ১১২টি, ২০২৪ সালে ৮৪টি এবং ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের এখন পর্যন্ত ৮৯টি মামলা হয়েছে।

কেন বারবার এই বিমানবন্দর টার্গেট

মাদক কিংবা স্বর্ণ—দুটো পাচারের রুট হিসেবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্রগুলো শাহজালাল বিমানবন্দরকে ব্যবহার করছে। একের পর এক চালান ধরা পড়া সত্ত্বেও চক্রটি কেন বারবার এই রুটই ব্যবহার করতে চায়, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, দৃশ্যত অনেক চালান ধরা পড়লেও, হয়তো এর চেয়ে বড় বড় অনেক চালান তারা প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিরাপদে বের করে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এই সফলতার কারণেই বারবার তারা এই বিমানবন্দরকে বেছে নেয়।

এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার না করলেও বিষয়ে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগিব সামাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চোরাকারবারিদের দুরভিসন্ধি থাকে। তারা চেষ্টা করে কোনোভাবে যদি (স্বর্ণ) পার করা যায়। তবে আমাদের চেষ্টার ফলেই কিন্তু তারা ধরা পড়ে যাচ্ছে।’  

তিনি আরও বলেন, ‘আগমনী যাত্রীদের স্ক্যানিং করে কাস্টমস। হয়তো একসঙ্গে অনেকগুলো ফ্লাইট নামলে শতভাগ চেকিং হয় না। তারপরও তারা সন্দেহজনক যাত্রীদর তল্লাশি করে থাকে। বর্তমানে তল্লাশি আরও জোরদার করা হয়েছে।’

পাচারের অর্ধশতাধিক অভিনব কৌশল

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চোরাকারবারীরা স্বর্ণ পাচারের জন্য অন্তত অর্ধশতাধিক ভিন্ন ভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে থাকে। চক্রটি কখনও ফ্লাইটের পাইলট, কেবিন ক্রু, বিমানবালা, ইঞ্জিনিয়ার, ট্রলিম্যান কিংবা ক্লিনারকে ব্যবহার করে।

আবার কখনও যাত্রীবেশী বাহক দিয়ে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, ইলেকট্রিক মোটর, ট্রলির হ্যান্ডেল, হুইল চেয়ার, জুতো, বেল্টের কোমরবন্ধনী, শার্টের কলার, সাবানের কেস, সাউন্ড বক্সের অ্যাডাপ্টার, ওষুধের কৌটা, ল্যাপটপের ব্যাটারি এবং মলদ্বারে বা দেহের বিভিন্ন অংশে লুকিয়ে স্বর্ণ নিয়ে আসে। এমনকি স্বর্ণের বারের ওপর কালো অথবা সিলভার রঙের প্রলেপ দিয়ে কিংবা গলায় সাধারণ চেইনের সঙ্গে লকেট হিসেবে ঝুলিয়েও বার পাচারের চেষ্টা করা হয়।

প্রশাসনের তৎপরতা

মার্চে বিমানের ভেতরে ১৮ কেজি স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনার পর চোরাচালান ঠেকাতে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অভিযুক্ত কর্মীদের চিহ্নিত করে বড় ধরনের তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

বিমানবন্দরে কর্মরত একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, দৃশ্যত বিমানবন্দরের আগমনী ও বহির্গমনী নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিশ্বমানের। যখন একসঙ্গে একাধিক ফ্লাইট অবতরণ করে, তখন যাত্রীদের ওপর বিশেষ নজরদারি করা হয়। সোর্সের (তথ্যদাতা) মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে পৃথকভাবে তল্লাশি চালানো হয়। এর পরেও চোরাকারবারীদের এই তৎপরতা আমাদের কাছে উদ্বেগজনক মনে হয়।

আর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের এক কর্মকর্তা জানান, চোরাকারবারিরা যেন কোনোভাবেই বিমানবন্দরকে নিরাপদ রুট মনে করতে না পারে, সেজন্য সব সংস্থা সজাগ থেকে কাজ করছে।

শাহজালালের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ বলেন, ‘আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় বর্তমানে নজরদারি বেশি। কীভাবে নজরদারির আওতা আরও বাড়ানো যায়, আমরা সেদিকটা নিয়ে কাজ করছি। কাস্টমস, কাস্টমস গোয়েন্দা, এভসেকসহ সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।’