Image description

রাজধানীর মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজে শিক্ষক এখন ৬৭৬ জন । তাঁদের মধ্যে ৬৬২ জনের নিয়োগে মানা হয়নি কোনো নিয়মনীতি । সব প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে ইচ্ছেমতো তাঁদের নিয়োগ দিয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ । পাশাপাশি একাডেমিক উন্নয়ন ও নগর ভাতা , পরিচালনা কমিটির সম্মানী ভাতা , ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন খাতে মোট ৬০০ কোটি টাকার বেশি অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে । অবৈধভাবে শিক্ষক নিয়োগ ও ভয়াবহ

মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ » মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিবেদন । » ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এসব অনিয়ম । » প্রতিষ্ঠানটি ছিল সাবেক মন্ত্রী কামাল মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে ।

এসব অনিয়মের তথ্য পেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর ( ডিআইএ ) । অধিদপ্তরের সাত কর্মকর্তা গত বছরের অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে দুই দফায় এই তদন্ত

কার্যক্রম পরিচালনা করেন । তদন্ত প্রতিবেদনটি গতকাল রোববার মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো হয়েছে । প্রতিবেদনে নিয়োগ , ভ্যাট

ফাঁকি , একাডেমিক উন্নয়ন ও নগর ভাতা এবং সম্মানী বাবদ নেওয়া ভাতা সরকারি কোষাগারে জমা , প্রতিষ্ঠানপ্রধানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে । এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম গতকাল আজকের পত্রিকাকে বলেন , নিয়মানুযায়ী তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে । এখন মন্ত্রণালয় বিধি মোতাবেক পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে ।

শিক্ষকদের ৯৮ ভাগ অবৈধ অনিয়ম ৬০০ কোটির

তবে অধিদপ্তরের প্রতিবেদন নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি মনিপুর উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ( ভারপ্রাপ্ত ) মো . সিরাজুল ইসলাম । আর প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডির সভাপতি ম . হামিদুল হক মানিককে একাধিকবার ফোন ও এসএমএস করা হলেও তিনি সাড়া দেননি । ১৯৬৯ সালে রাজধানীর মিরপুরে প্রতিষ্ঠিত মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের ছয়টি শাখা ক্যাম্পাস রয়েছে । বর্তমানে এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ২৯ হাজার ২০৯ জন । আর শিক্ষক আছেন ৬৭৬ জন এবং কর্মচারীর সংখ্যা ১১৮ জন ।

অভিযোগ রয়েছে , বিগত আওয়ামী লীগ ( বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সরকারের সময়ে প্রতিষ্ঠানের পুরো নিয়ন্ত্রণ ছিল গভর্নিং বডির সাবেক সভাপতি , আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার এবং তাঁর পরিবারের । ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর একাধিক মামলায় কামাল মজুমদার কারাগারে রয়েছেন । শিক্ষক নিয়োগে মানা হয়নি নিয়ম শিক্ষক পদে নিয়োগ পেতে হলে প্রার্থীকে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আবেদন করতে হয় । থাকতে হয় প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের ( এনটিআরসিএ ) শিক্ষক নিবন্ধন সনদ । নিয়োগের আগে জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশও বাধ্যতামূলক । এ ছাড়া নিয়োগ বোর্ডে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের ( মাউশি ) প্রতিনিধির উপস্থিতি , লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার টেবুলেশন শিট সংরক্ষণসহ পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে । কিন্তু রাজধানীর মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজে ৬৬২ জন শিক্ষক নিয়োগে এসব নিয়মের কোনোটিই মানা হয়নি বলে তদন্তে উঠে এসেছে । তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী , বেশির ভাগ শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে শিক্ষক নিবন্ধন সনদ ছাড়া । আর অনেক শিক্ষক নিয়োগের জন্য আবেদনই করেননি । অনেক শিক্ষকের নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র তদন্তকালে পাওয়া যায়নি । কেউ কেউ নিয়োগ পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ পেয়েছেন । ভাতার নামে লোপাট ৯০ কোটি টাকা ২০১০ সাল থেকে হওয়া এসব নিয়মবহির্ভূত নিয়োগের পাশাপাশি একাডেমিক উন্নয়ন ও নগর ভাতা , পরিচালনা কমিটির সম্মানী ভাতা , ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন খাতে মোট ৬০৫ কোটি ৯৮ লাখ ৮৬ হাজার ৪২ টাকার অনিয়মের তথ্য পেয়েছে তদন্ত

দল ।

প্রতিবেদনের তথ্য বলছে , ২০০৯- ১০ থেকে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ৮১৯ শিক্ষক - কর্মচারীকে একাডেমিক উন্নয়ন ও নগর ভাতার নামে মোট ৮৭ কোটি ৮৪ লাখ ৮৭ হাজার ১৬৪ টাকা দেওয়া হয়েছে । এর মধ্যে একাডেমিক উন্নয়ন

ভাতা ৬৩ কোটি ৪৮ লাখ ৪৬ হাজার ৪২৮ টাকা এবং নগর ভাতা ২৪ কোটি ৩৬ লাখ ৪০ হাজার ৭৩৬ টাকা । প্রতিবেদনে বলা হয় , বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একাডেমিক উন্নয়ন এবং নগর ভাতা দেওয়ার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কোনো নির্দেশনা নেই । এসব অর্থ আদায় করে প্রতিষ্ঠানের তহবিলে জমা দিতে প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে । এর বাইরে আর্থিক বিধিতে প্রভিশন না থাকলেও গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের নিয়মবহির্ভূতভাবে ২ কোটি ৪৩ লাখ ২০ হাজার ৭৬৪ টাকা সম্মানী নেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে তদন্ত প্রতিবেদনে । এসব অর্থ প্রতিষ্ঠানের তহবিলে ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে । নির্মাণে অনিয়ম ৪৩৬ কোটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী , ২০০৯ - ১০ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নির্মাণ / মেরামত ও উন্নয়ন খাতে মোট ৪৩৬ কোটি ১২ লাখ ৮ হাজার ৪৪২ টাকা খরচ করা হয়েছে । তবে তদন্ত দল এসব অর্থ ব্যয়ের ভাউচার , ব্যয়ের প্রক্রিয়া , গভর্নিং বড়ির রেজল্যুশনসংক্রান্ত কোনো তথ্য পায়নি । প্রতিবেদনে নির্মাণ / উন্নয়ন খাতে করা বিপুল অর্থ ব্যয়ের ভাউচার প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষণ না করায় দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা অথবা রেকর্ডপত্র উদ্ধারে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে ।

ছাপাখানা থাকলেও খরচ ১১ কোটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী , মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজে নিজস্ব প্রিন্টিং প্রেস রয়েছে । এরপরেও এ খাতে ১১ কোটি ৪৩ লাখ ৭৭ হাজার ৭১২ কোটি খরচ দেখানো হয়েছে । এসব অর্থ আত্মসাৎ হিসেবে গণ্য বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে । প্রতিবেদনে বলা হয়েছে , মুদ্রণ খাতে আত্মসাৎকৃত অর্থ সংশ্লিষ্ট অধ্যক্ষের কাছ থেকে আদায় করে প্রতিষ্ঠানের সাধারণ তহবিলে জমা করতে হবে । ব্যর্থতায় দায়ী অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হলো । আর্থিক নয়ছয়ের চিত্র প্রতিবেদনের তথ্য বলছে , মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের ইব্রাহিমপুর শাখায় আদায় করে মোট ৬৬ লাখ ৫৩ হাজার ৪৭০ টাকা ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়নি । এ ছাড়া ক্যানটিন বাবদ আদায় করা ৭৯ লাখ ২০ হাজার টাকাও ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়নি । এসব অর্থ প্রতিষ্ঠানের তহবিলে জমা দিতে সুপারিশ করা হয়েছে । এ ছাড়া বিজ্ঞাপন খাতে ব্যয় করা ৪ কোটি ১ লাখ ৪৭ হাজার ৪৯৭ টাকা এবং ছয়টি গাড়ি ক্রয় বাবদ ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭২ হাজার কোনো ভাউচার তদন্তকালে প্রদর্শন করা হয়নি । এ জন্য অধ্যক্ষ / প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে । এর বাইরে বার্ষিক ম্যাগাজিন

প্রকাশ না করেও ৫ কোটি ২৫ লাখ ৭৬ হাজার ২০০ টাকার খরচ দেখানো হয়েছে । বাড়িভাড়া - চিকিৎসা বাবদ নেওয়া ৫৯ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ টাকা এবং ইব্রাহিমপুর ক্যাম্পাসের উন্নয়ন খাতে ব্যয় করা ১ কোটি ১৭ লাখ ৬৭ ১৯১০ টাকা প্রতিষ্ঠানের তহবিলের জমা দেওয়া হয়েছে ।

পদে পদে ভ্যাট ফাঁকি তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে , প্রশ্নপত্র ছাপা , বিজ্ঞাপন , আসবাবপত্র ও বিভিন্ন খরচে বিপুল অঙ্কের ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া হয়েছে । প্রতিবেদনে বলা হয়েছে , ভ্যাট বাবদ ৩৬ কোটি ৭৫ লাখ ৪২ হাজার ৩৪৬ টাকা ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা করে চালানের কপি মন্ত্রণালয়ে দাখিল করতে হবে । এর বাইরে সম্পত্তি ভ্যাট ও আইটি বাবদ ১৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা , বিশেষ ক্লাস ও পরিচালনা কমিটির সম্মানীর আয়কর বাবদ ১ কোটি ৫৬ লাখ ২৯ হাজার ৯৮৭ টাকা এবং উন্নয়নকাজ বাবদ ১ কোটি ৫৩ লাখ ৯০ হাজার ৪৯১ টাকা এবং ঠিকাদারকে দেওয়া বিল থেকে ১০ কোটি ৫২ লাখ ২১ হাজার ৯৫৬ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে ।

১০ টি শিফটই অবৈধ প্রতিবেদনের তথ্য বলছে , মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ প্রভাতি ও দিবা মিলিয়ে মোট ১৪ শিফট চালু রয়েছে । এর মধ্যে মাত্র ৪ টি শিফট অনুমোদিত অর্থাৎ বাকি ১০ টি শিফটেরই অনুমোদন নেই । প্রতিবেদনে বলা হয়েছে , মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজে ছয়টি শাখায় ২৯ হাজার ২০৯ জন শিক্ষার্থী নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে , যা অত্যন্ত জটিল , তাই ছয়টি শাখাকে আলাদা প্রতিষ্ঠানে পরিচালনা করার সুপারিশ করা হলো ।

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে , মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ প্রকৃত অর্থে শিক্ষা প্রদানের প্রতিষ্ঠান থেকে সরে গিয়ে একটি বৃহৎ শিক্ষার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে রূপ লাভ করেছে । বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শুরু হওয়া দুর্নীতি , অব্যবস্থাপনা , নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সীমাহীন অর্থ আদায় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করছে । শিক্ষক- কর্মচারীদের মাত্রাতিরিক্ত বেতন / ভাতা গ্রহণের ক্ষেত্রে ঐকমত্য পরিলক্ষিত হয়েছে । আরও বলা হয়েছে , এ প্রতিষ্ঠানকে ইতিবাচক ধারায় ফিরিয়ে আনতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটির মাধ্যমে তদারকির ব্যবস্থা চালু করতে হবে । জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব ( নিরীক্ষা অধিশাখা ) মোহাম্মদ আশরাফুল আলম গতকাল আজকের পত্রিকাকে বলেন , ‘ তদন্ত প্রতিবেদনটি এখনো আমার কাছে আসেনি । প্রতিবেদন পেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে । '