যৌথ নদী কমিশনে (জেআরসি) বাংলাদেশের পক্ষে সদস্য পদে পদায়নে নজিরবিহীন তদবিরের অভিযোগ উঠেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) প্রধান প্রকৌশলী ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীসহ ২৩ জনকে ডিঙিয়ে যাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তিনি একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী। নাম আনোয়ার কাদির। পদটি সরকারের যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মোকাব্বির হোসেন বিধি লঙ্ঘন করে তাকে এই পদে বদলি করে গেছেন। ১১ নভেম্বর পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে অভিজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আবুল হোসেনকে সরিয়ে মো. আনোয়ার কাদিরকে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হয়।
জানা যায়, জেআরসি ‘সদস্য’ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ। এ পদে আসীন ব্যক্তিরা ভারতের সঙ্গে সাচিবিক সহায়তা দেওয়া ছাড়াও এ সংক্রান্ত বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে থাকেন। এছাড়া জেআরসি স্বতন্ত্র সংস্থা হিসাবে নেপাল, ভুটান ও চায়নার সঙ্গে পানি বণ্টন বিষয়ে যৌথ আলোচনায় অংশ নেন। সাধারণত পাউবোর মহাপরিচালক, অতিরিক্ত মহাপরিচালক বা প্রধান প্রকৌশলী পদের কর্মকর্তারা যৌথ আলোচনায় প্রতিনিধিত্ব করেন। জেআরসিতে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করছেন শরদ চন্দ্র। তিনি সে দেশের কেন্দ্রীয় পানি কমিশনের প্রধান প্রকৌশলী ও কমিশনার। তিনি নরওয়ে থেকে উচ্চতর ডিগ্রিধারী।
জানতে চাইলে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব মোকাব্বির হোসেন যুগান্তরকে বলেন, যাচাই-বাছাই করেই জেআরসির সদস্য পদে আনোয়ার কাদিরকে পোস্টিং দেওয়া হয়। এর আগে যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার কোনো কর্মকর্তাকে এই পদে দেওয়ার কোনো তথ্য আমার জানা ছিল না।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৩ জুন যৌথ নদী কমিশনে (জেআরসি) নিয়োগ বিধিসংক্রান্ত গেজেট প্রকাশিত হয়। নিয়োগ বিধিতে জেআরসির ‘সদস্য’ পদের যোগ্যতা হিসাবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রকৌশল ডিগ্রি ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সরকারের যুগ্ম সচিব বা প্রধান প্রকৌশলী বা অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে কর্মরত কর্মকর্তাকে পদায়নের কথা বলা হয়েছে। অথচ এই নিয়োগ বিধি লঙ্ঘন করে গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদটিতে আনোয়ার কাদিরকে বসানো হয়। যে আবুল হোসেনকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে তিনি পাউবোতে একজন সৎ ও মেধাবী প্রকৌশলী হিসাবে পরিচিত। তিনি সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের ‘প্লাইমাউথ ইউনিভার্সিটি’ থেকে মাস্টার্স ও অস্ট্রেলিয়ার ‘ইউনিভার্সিটি অব সাউথ অস্ট্রেলিয়া থেকে আন্তঃনদী পানি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে’ পিএইচডি করেন।
জানা যায়, আনোয়ার কাদিরকে নিয়োগ দিয়ে জেআরসিতে কর্মরত সিনিয়র একাধিক কর্মকর্তাকে রীতিমতো অপমান করা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে একজন কর্মকর্তা বলেন, এর আগে আনোয়ার কাদির জেআরসিতে নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন। সেখানে পরিচালক আবু সাঈদের অধীনে তিনি কাজ করতেন। এই কর্মকর্তার এসিআর (বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন) নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর পদোন্নতি পেয়েছেন। এখন তাকেই আবু সাইদের সিনিয়র করে জেআরসিতে পোস্টিং দেওয়া হয়। বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি আবু সাইদ।
পাউবো কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জেআরসির সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ এ বছরই শেষ হচ্ছে। তিস্তা ও ফেনী চুক্তির খসড়া স্বাক্ষরিত হয়েছে ২০১১ সালে। কুশিয়ারা নদীর সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে ২০২২ সালে। যার মাধ্যমে বাংলাদেশ ৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ প্রদান করবে। এটা বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ ১৫৩ কিউসেক পানি পাবে শুষ্ক মৌসুমে। এরকম সংকটময় ও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে জেআরসিতে অনভিজ্ঞ সদস্য নিয়োগ দেওয়া ঠিক হবে না। কারণ পানি বণ্টনের ন্যায্য হিস্যা আদায়ে প্রতিবেশী দেশকে আন্তর্জাতিক আইনকানুন দিয়েই চেপে ধরতে হয়। বাংলাদেশের প্রতিনিধিকে এসব বৈঠকে সাহসের সঙ্গে কথা বলতে জানতে হবে।
পাউবোর একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক যুগান্তরকে বলেন, নিয়মানুযায়ী দ্বিতীয় ও তৃতীয় গ্রেডের সংস্থা প্রধান নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধান উপদেষ্টা বা প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি লাগে। বিগত সরকারের সময় এই পদায়নের ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি।
এ বিষয়ে মো. আনোয়ার কাদির বলেন, ‘তদবির করে আমি এখানে আসিনি। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে জেআরসির সদস্য পদে বদলির পরই বিষয়টি আমি জানতে পারি। এখানে যেরকম সরকারি দায়িত্ব পালন করছি, একই ভাবে পানি উন্নয়ন বোর্ডেও একই কাজ করতে হয়েছে আমাকে।’