Image description

দেশে বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় সৃষ্ট অপরাধের বিরুদ্ধে কোনো আইন নেই। গত ১০ এপ্রিল সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের করা সাইবার সিকিউরিটি অধ্যাদেশ নাম পরিবর্তন করে সাইবার সুরক্ষা আইন হিসেবে জারি করা হয়েছে। কিন্তু এ আইন ভয়াবহভাবে বেড়ে যাওয়া সাইবার অপরাধ দমনে অক্ষম এবং অকার্যকর।

নিয়ন্ত্রণহীন সোশ্যাল মিডিয়া যেকোনো সমাজের জন্য ক্ষতিকর। সোশ্যাল মিডিয়া এখন পারস্পরিক যোগাযোগের চেয়ে অন্যকে নোংরা, কুৎসিত এবং কুরুচিপূর্ণ ভাষায় আক্রমণ করে ঘায়েল করার মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। এখানে একশ্রেণির বিকৃত মানসিকতার মানুষের প্রধান কাজ হলো বিভিন্ন মানুষের চরিত্র হরণ ব্ল্যাকমেল করে চাঁদাবাজি করা। নিয়ন্ত্রণহীন সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে আজ নাগরিক জীবন বিপন্ন। মানুষ আতঙ্কিত। নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ার নোংরা আক্রমণের শিকার হয়ে অনেক নারী আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। বহু সংসার ভেঙে যাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে। ব্যবসায়ীরা চরম আতঙ্কে। গোটা সমাজে চলছে এক ধরনের নৈরাজ্য ও অরাজকতা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষতিকর ব্যবহার প্রতিরোধে বিভিন্ন ধরনের আইন প্রণয়ন করেছে। এসব আইনের মাধ্যমে ওইসব দেশ নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়ার স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধে কোনো কার্যকর আইন নেই। জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে গত ১০ এপ্রিল সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ পাস করে। কিন্তু এই আইনটি অসম্পূর্ণ। সাইবার বুলিং, সোশ্যাল মিডিয়ার মিথ্যাচার প্রতিরোধে এ আইন কেবল অপর্যাপ্তই নয়, অসহায়ও বটে। ফলে সাইবার অপরাধীরা আরও দুর্বৃত্ত হয়ে উঠছে। তারা এখন বাধাহীনভাবে মানুষের চরিত্রহননের খেলায় মেতে উঠেছে।

বাংলাদেশে সাইবার স্পেসে বল্গাহীন স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা হয়। আইনটির ব্যাপক অপব্যবহারের কারণে এটি সমালোচিত হয়। এই আইনে কিছু অস্পষ্টতার কারণে পুলিশ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে বিপুল ক্ষমতা দেওয়া হয়। ভিন্নমত ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের উদ্দেশে এ আইনটি অপব্যবহার করা হয়। ফলে দ্রুতই আইনটি একটি গণবিরোধী আইন হিসেবে বিবেচিত হয়। যদিও এ আইনের মাধ্যমে সাইবার অপরাধগুলোকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। বিশেষ করে সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে নাগরিক সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল এ আইনে। ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে আক্রমণাত্মক, মিথ্যা, ভীতি প্রদর্শক তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ, মানহানিকর তথ্য প্রকাশ, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো, ঘৃণা প্রকাশ, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, প্রকাশ বা ব্যবহার করলে জেল জরিমানার বিধান রাখা হয়েছিল। এসব ক্ষেত্রে তিন থেকে সাত বছরের কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ড, দ্বিতীয়বার এরকম অপরাধ করলে ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছিল। আজকের বাস্তবতায় অনেকে মনে করেন আইনটিতে কিছু ত্রুটি ছিল বটে কিন্তু এ ধরনের অপরাধ দমনে আইনটি ছিল অত্যন্ত জরুরি। যেকোনো আইন কতটা ভালো বা খারাপ তা নির্ভর করে কীভাবে তার প্রয়োগ হচ্ছে। অপপ্রয়োগের কারণে এবং আইনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বাড়াবাড়ি রকমের ক্ষমতা দেওয়ার কারণে এটি একটি বিতর্কিত আইন হিসেবে পরিচিতি পায়। এই আইন সংশোধন দাবি করেন বিভিন্ন মহল। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৩ সালে সরকার সাইবার সিকিউরিটি আইন চালু করে। এটি আসলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভিন্নরূপ। সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট ২০২৩ সম্পর্কে প্রাথমিক উদ্বেগসমূহের মধ্যে একটি ছিল, এর অস্পষ্ট শব্দাবলি ও পরিভাষা। সমালোচকদের মতে এ অস্পষ্টতার কারণে এসব শব্দাবলিকে উদ্দেশ্যমূলক এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয় যা বাক স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করে। এ ধরনের ব্যাখ্যা সাংবাদিক এবং ভিন্নমত প্রকাশকারী সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে আইনটির অপব্যবহারের সম্ভাব্য ঝুঁকি তৈরি করে।

২০২৪ এর পাঁচ আগস্ট ক্ষমতার পালাবদলের পর সাইবার সিকিউরিটি আইন বাতিলের দাবি সামনে আসে। সেই সময় তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল কোনো রকম পরিকল্পনা ছাড়াই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের ঘোষণা দেন। বাস্তবতা পর্যালোচনা না করে, অংশীজনদের মতামত না নিয়েই ২০২৫ সালে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন বাতিল করা হয়। আসিফ নজরুল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বদলে সাইবার সিকিউরিটি আইন অধ্যাদেশ জারি করেন। অধ্যাদেশে বলা হয়েছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ২১ মে ২০২৫ তারিখে বর্ণিত প্রণীত নিম্নে উল্লিখিত অধ্যাদেশটি জনসাধারণের জ্ঞাতার্থে প্রকাশ করা হলো। অধ্যাদেশ নম্বর ২৫, ২০২৫। অধ্যাদেশে বলা হয়েছে সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ রহিত ক্রমে সাইবার সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং সাইবার স্পেসে সংগঠিত অপরাধ শনাক্তকরণ প্রতিরোধ দমন ও উক্ত অপরাধের বিচার এবং আনুষঙ্গিক বিষয়ে বিধান প্রণয়নকল্পে প্রণীত অধ্যাদেশ জারি করা হলো।

গেজেটে বলা হয়, ‘২০২৩ সালের সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল করা হয়েছে। তবে ওই আইনের ১৭, ১৮, ১৯, ২০, ২২, ২৩, ৩০, ৩২ ও ৩৫ ধারাসমূহ বলবৎ থাকবে। কিন্তু পরবর্তীতে আইনটি সংশোধন করা হয়। সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে সাইবার নিরাপত্তা আইনের ধারা ২১, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯, ৩১ ও ৩৪ বাদ পড়েছে’ অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, উল্লিখিত ধারাগুলোয় নিষ্পন্নাধীন কোনো মামলা বা অন্যান্য কার্যধারা ও তদন্ত বাতিল হবে এবং কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে না। এ ছাড়া এসব ধারায় আদালত বা ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত দণ্ড ও জরিমানা বাতিল হবে।

আইনের ষষ্ঠ অধ্যায়ে (১৭ থেকে ৩০) বিভিন্ন সাইবার অপরাধ এবং তার দণ্ড চিহ্নিত করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোতে বেআইনি প্রবেশ বা হ্যাকিং, কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার সিস্টেম, ইত্যাদিতে বেআইনি প্রবেশ, কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম ও সাইবার স্পেসের ভৌত অবকাঠামো, ইত্যাদির ক্ষতিসাধনের অপরাধ, সাইবার স্পেসে জুয়া, জালিয়াতি, প্রতারণা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেল, অশ্লীল ভিডিও প্রকাশ, ধর্মীয় উসকানি, জাতিগত বিদ্বেষ এবং ঘৃণা ছড়ানোকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু এ আইনে ব্যক্তিগত আক্রমণ, মিথ্যা অপপ্রচার, ভুয়া তথ্য ছড়ানো, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার ক্ষুণ্ন করার মতো বিষয়গুলো উপেক্ষিত হয়েছে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সাইবার সিকিউরিটি অধ্যাদেশে কিছু পরিবর্তন এনে সাইবার সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করেছে। যা ইতোমধ্যেই জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। এই আইনটিও নাগরিক সুরক্ষা প্রদানে সক্ষম নয়। সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আইনে একজন ব্যক্তিকে বিরামহীনভাবে সাইবার বুলিং করলে কোনো শাস্তি নেই। এআই দিয়ে কারও ছবির সঙ্গে অন্যের ছবি যুক্ত করে চরিত্রহননের চেষ্টা করা হলে তার বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার নেই। আইনে একজন ব্যবসায়ীর সুনাম নষ্ট করে মিথ্যা প্রচার করলে তার আইনি প্রতিকার নেই। একজন নারীকে অশালীন ভাষায় আক্রমণ করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো সুযোগ নেই। আসিফ নজরুল না জেনে না বুঝে সাধারণ মানুষকে একটি সাইবার ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছেন। সাধারণ মানুষকে কিছু সাইবার অপরাধীর কাছে জিম্মি করেছেন। এখন সাইবার অপরাধে বিচার নাই। সাইবার সন্ত্রাসীরা আইনের ঊর্ধ্বে। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব অবিলম্বে জনগণের সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। না হলে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, সরকারও এদের হাত থেকে রেহাই পাবে না।