বাংলাদেশ চীনের পরীক্ষিত বন্ধু। আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নে বাংলাদেশকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করবে চীন। ব্যবসা, বাণিজ্য, অবকাঠামো, কৃষি, পর্যটনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার পাশাপাশি এসব ক্ষেত্রে চীনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পারে বাংলাদেশ। দুদেশের মধ্যে বিদ্যমান অংশীদারত্ব জোরদারে দুদেশকে আগামী দিনগুলোয় আরো ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে।
সম্প্রতি চীন সফরে যাওয়া বাংলাদেশ মিডিয়া ডেলিগেশনের সম্মানে দেওয়া ব্যাংকোয়েটে মতবিনিময়কালে শিনজিয়াং পররাষ্ট্র দপ্তরের উপমহাপরিচালক জিয়াং ইয়েন এসব মন্তব্য করেন। মতবিনিময়কালে পদস্থ এই কূটনৈতিক চীন-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বিশেষ করে শিনজিয়াং প্রদেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা বাড়ানো, আঞ্চলিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা, সংখ্যালঘু জনসংখ্যা, বিশেষ করে মুসলিমদের উন্নয়নে চীনা সরকারের নানামুখী কর্মসূচিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে খোলামেলা কথা বলেন।
ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের কথা তুলে ধরে জিয়াং ইয়েন বলেন, ‘বাংলাদেশ আমাদের পরীক্ষিত বন্ধু। চীন বাংলাদেশের প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। দুদেশের জনগণের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। ব্যবসা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, পর্যটন, কৃষি, শিক্ষা, সাংস্কৃতিকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের অংশীদারত্ব আগামীতে আরো বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করি।’ তিনি বলেন, ‘উন্নয়নের পূর্বশর্ত স্থিতিশীলতা। স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ছাড়া কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না। আমরা সবাইকে নিয়েই উন্নয়নের পথে হাঁটতে চাই। আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমরা বাংলাদেশকে সঙ্গে নিয়েই এগোব।’
শিনজিয়াং প্রদেশের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে এই কূটনীতিক বলেন, ‘একসময় শিনজিয়াংকে পিছিয়ে পড়া একটি জনপদ মনে করা হতো। কিন্তু বাস্তবতা বদলে গেছে। শিনজিয়াং এখন একটি বাণিজ্যিক হাট। এখানে আটটি দেশের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প, কৃষি, পর্যটনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। আমরা চাই বাংলাদেশ আমাদের এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাক। আমরা সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছি।’
শিনজিয়াং প্রদেশে বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতার ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘তৃতীয় পক্ষের উসকানিতে কিছু মানুষ বিপথগামী হয়েছিল। অনেক প্রাণহানি হয়েছে। সরকারের পদক্ষেপের পাশাপাশি সাধারণ জনগণের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত হওয়ায় এখন আর কোনো ধরনের বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা নেই। ২০২২ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি।’
তিনি আরও বলেন, শিনজিয়াং এখন এক নিরাপদ নগরী। শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে বলেই গত বছর-অর্থাৎ ২০২৫ সালে তিন কোটিরও বেশি বিদেশি পর্যটক এখানে ভিড় জমিয়েছে।
শিনজিয়াংয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিশেষ করে উইঘুর মুসলিমদের ধর্মচর্চা এবং তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে জিয়াং ইয়েন বলেন, পশ্চিমা গণমাধ্যম এ ব্যাপারে প্রায়ই অপপ্রচার চালিয়ে থাকে। এখানে ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক মানের ইনস্টিটিউট করা হয়েছে, যেখানে ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, ডালিমে যেখানে অসংখ্য বীজ ঘনভাবে একসঙ্গে থাকে, এটাকে চীনের জাতিগত নীতির একটি রূপক হিসেবে ধরা হয়। এই ধারণাটি এসেছে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নির্দেশনা থেকে। তিনি বলেছিলেন, সব জাতিগোষ্ঠীকে ডালিমের বীজের মতো একে অন্যকে আঁকড়ে ধরতে হবে এবং জাতিগত ঐক্যকে নিজেদের চোখের মতোই লালন করতে হবে। এটাই শিনজিয়াংয়ে চীনের নীতির ভিত্তি। যেখানে উইঘুর, হান, কাজাখ, মঙ্গোল, হুই, কিরগিজ, মানচু, তাজিক, উজবেক, তাতারসহ ১৩টি জাতিগোষ্ঠী নানা বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যবদ্ধভাবে বসবাস করে।
উরুমচির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত শিনজিয়াং ইসলামিক ইনস্টিটিউটের প্রধান মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোরআন ও হাদিসে স্নাতকোত্তর মোহাম্মদ ইয়াহিয়া বাংলাদেশি সাংবাদিকদের বলেন, সংবিধান অনুযায়ী মুসলিমরা ধর্মচর্চায় স্বাধীন। পশ্চিমা অপপ্রচার ঠিক নয়।
তিনি আরও বলেন, ঐতিহ্যবাহী ইসলামি পাণ্ডিত্য এবং আধুনিক সামাজিকব্যবস্থা একীকরণের মাধ্যমে, ধর্মীয় উৎকর্ষের কেন্দ্র হিসেবে এক নতুন পরিচয় গড়ে তুলছে এই ইসলামিক ইনস্টিটিউট।
চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে জিনজিয়াংয়ের ভূমিকা অব্যাহত থাকায় রাষ্ট্র পরিচালিত স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষা কীভাবে সহাবস্থান করতে পারে, তা একটি মডেল হিসেবে এই প্রতিষ্ঠানটি বিশেষভাবে আলোচিত।
রাষ্ট্র অনুমোদিত এই প্রতিষ্ঠানটি ইমাম ও ধর্মীয় পণ্ডিত হতে ইচ্ছুক এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি প্রধান গন্তব্যস্থল হিসেবে কাজ করে। এর পাঠ্যক্রম অত্যন্ত কঠোর, যা ইসলামের মূল ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে আধুনিক সমাজের বাস্তব চাহিদার ভারসাম্য রক্ষা করে।
এখানে কোরআন-হাদিস, শরিয়াহভিত্তিক আইন এবং আরবি ভাষার ওপর বিশেষায়িত কোর্স শিক্ষা দেওয়া হয়। স্নাতকরা যাতে সাংস্কৃতিক সীমানা পেরিয়ে কার্যকরভাবে যোগাযোগ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করার জন্য ম্যান্ডারিন এবং উইঘুর ভাষায়ও পাঠদান করা হয়।
মোহাম্মদ ইয়াহিয়া বলেন, তারা এমন একটি শিক্ষামূলক পরিবেশ তৈরি করেছেন, যেখানে ধর্মীয় জ্ঞান এবং আধুনিক সামাজিক ব্যবস্থার মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি সমাজে একটি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের জন্য প্রস্তুত করে। প্রতিষ্ঠানটির ক্যাম্পাসটি ধর্মীয় অবকাঠামোতে চীনের উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের প্রতিফলন ঘটায়। বর্তমানে এখানে তিনটি আধুনিক আবাসিক ছাত্রাবাসে ৩০০ শিক্ষার্থী থাকেন, যাদের ৬২ জন শিক্ষক ও গবেষকের একটি অনুষদ দল সহায়তা করে।
প্রতিষ্ঠানটির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো-এর গ্রন্থাগার, যেখানে ১৭ হাজার বইয়ের একটি সংগ্রহ রয়েছে। এর মধ্যে উইঘুর, ম্যান্ডারিন এবং আরবি ভাষার দুর্লভ ও অনূদিত গ্রন্থ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা এটিকে মধ্য এশিয়ায় ইসলামি অধ্যয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা কেন্দ্রে পরিণত করেছে।
তিনি উল্লেখ করেন, এই কাঠামোগত শিক্ষাব্যবস্থাটি সুশৃঙ্খল ধর্মীয় নির্দেশনা দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে, যা অতীতে এ অঞ্চলে দেখা দেওয়া চরমপন্থার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করেছে বলে প্রশাসন মনে করে।
চীনা দূতাবাসের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের মিডিয়া ডেলিগেশনের সদস্য হিসেবে শিনজিয়াং প্রদেশের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া এবং সরেজমিন পরিদর্শন অঞ্চলটির অভাবনীয় উন্নয়ন চোখে পড়েছে।
২০২৫ সালে শিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ৭০ বছর পূর্ণ হয়েছে। এ উপলক্ষে প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে বর্ণিল বিলবোর্ড টানানো হয়েছে। শহরের প্রাণকেন্দ্রে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বিশেষ এক্সিবিশন সেন্টার। যেখানে শিনজিয়াংয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বর্তমান উন্নয়নের চিত্র নিখুঁতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পুরো এলাকা ঘুরে সেই উন্নয়নের ছাপই চোখে পড়েছে।
শিনজিয়াং অঞ্চলে কৃষিপণ্য উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। কম সময়ে অধিক ফসল ফলানোর নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। শিনজিয়াংয়ের একটি আধুনিক গ্রিনহাউস ফ্যাক্টরি ঘুরে দেখা যায়, সেখানে নানা ধরনের শাকসবজি উৎপাদন করা হচ্ছে। সারা বছরই এ উৎপাদন অব্যাহত থাকে। শিনজিয়াং অঞ্চলে ফসল উৎপাদনে এখন ব্যাপকভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে।
শিনজিয়াং প্রদেশের রাজধানী উরুমচি শহরকে পুরোপুরি আধুনিক প্রযুক্তির আওতায় আনা হয়েছে। নাগরিকদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে শহর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ২৪ ঘণ্টা কাজ করছে। শহরের বাসিন্দাদের জন্য চালু করা হয়েছে বিশেষ একটি মোবাইল অ্যাপ। এই অ্যাপের মাধ্যমে নাগরিকরা নিজেদের যেকোনো সমস্যা জানালে কর্তৃপক্ষ দ্রুত সময়ে তা সমাধানে উদ্যোগ নেয়।