প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি বক্তব্যের কথা উল্লেখ করে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলছেন, ওই কথাটা অত্যন্ত সুমধুর, সুরের মতো শোনায়। এই গুরুত্বপূর্ণ নীতি-নির্দেশনা দেশের অগ্রযাত্রার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য আমাদের নতুন পথে যাত্রা শুরু করাতে পারে। ওই বক্তব্য আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে।প্রধানমন্ত্রীর ‘সরল জীবনযাপন’ দর্শন প্রয়োগের মাধ্যমে এখন থেকেই প্রশাসনিক ব্যয় কমানো শুরু করা যেতে পারে। মুক্ত গণমাধ্যম হিসেবে এসব ক্ষেত্রে আমাদের পেশাগত সহযোগিতা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করছি।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার জন্য এমন দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা আরও বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে অপ্রয়োজনীয় অপচয় কমিয়ে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে আরও বেশি বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে। তার মতে, রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যক্তিগত আচরণ ও জীবনধারা দেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
মাহফুজ আনাম জানান, তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পবিত্র রমজান মাসে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। রাত পর্যন্ত কাজ করায় সহকর্মীদের নিয়ে তিনি অফিসেই ইফতার করতেন। প্রধানমন্ত্রী দেখলেন, পর্যটন হোটেল থেকে আনা ইফতারের খরচ পড়ত জনপ্রতি ৯০০ টাকা। তিনি ইফতারের বিভিন্ন সামগ্রীর খোঁজ নেন এবং মাত্র ১৫০ টাকায় স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর ইফতারের ব্যবস্থা করেন। এরপর থেকে সেটিই ছিল তার অফিসে ইফতারের জনপ্রতি খরচ।
তিনি বলেন, এই উদ্যোগ শুধু ব্যয় কমানোর উদাহরণ নয়, বরং সরকারি ব্যবস্থাপনায় বাস্তবমুখী চিন্তারও প্রতিফলন। অল্প খরচে কীভাবে স্বাস্থ্যসম্মত ও মানসম্পন্ন আয়োজন করা যায়, সেটি প্রধানমন্ত্রী নিজেই দেখিয়ে দিয়েছেন। তার এই উদ্যোগে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যেও সাশ্রয়ী মানসিকতা গড়ে উঠবে বলে মনে করেন মাহফুজ আনাম। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সরকারি ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে এমন উদ্যোগ অন্যান্য দপ্তরের জন্যও অনুসরণযোগ্য হতে পারে।
মাহফুজ আনাম জানান, প্রধানমন্ত্রী এক অনুষ্ঠানে সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠনের নেতাদের চমকে দিয়ে বলেন, তাদের জন্য দুপুরে খাবারের যে আয়োজন করা হয়েছে, সেখানেও জনপ্রতি খরচ হবে ১৫০ টাকা। খাবারে ছিল সাদা ভাত, সবজি, লাউ-চিংড়ি (ছোট চিংড়ি) ও ডাল। মাহফুজ আনামের মতে, একদম গরম-গরম ও টাটকা খাবার পরিবেশন করা হয়েছিল। খরচ কম হলেও সেদিনের মধ্যাহ্নভোজ ছিল হালকা, স্বাস্থ্যকর এবং সুস্বাদু।
তিনি বলেন, সাধারণ অথচ পরিপাটি এই আয়োজন উপস্থিত অতিথিদের মাঝেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। খাবারের মান বজায় রেখেও কীভাবে সীমিত ব্যয়ে আয়োজন সম্পন্ন করা যায়, সেটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাস্তবে দেখিয়েছেন।
মাহফুজ আনাম বলেন, কয়েক সপ্তাহ আগে মতবিনিময়ের জন্য সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সদস্যদের আমন্ত্রণ জানান তারেক রহমান। বৈঠকে তিনি ছিলেন আন্তরিক ও বিনয়ী। তার ব্যক্তিগত একটি গল্প দিয়ে সেদিনের আলোচনা শুরু করায় আমরাও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।
তিনি আরও বলেন, আলোচনার পুরো পরিবেশ ছিল খোলামেলা ও ইতিবাচক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মনোযোগ দিয়ে সবার মতামত শুনেছেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক মন্তব্য করেছেন। এতে সংবাদপত্র মালিকদের মধ্যেও পারস্পরিক আস্থা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন মাহফুজ আনাম। আজ শুক্রবার, ১৫ মে ডেইলি স্টারের মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত এক উপসম্পাদকীয়তে মাহফুজ আনাম এসব কথা বলেন।
লেখার শুরুতে তিনি বলেন, লেখার শিরোনামে প্রধানমন্ত্রীর একটি বক্তব্য ব্যবহার করেছি, ‘পুলিশ কোনো রাজনৈতিক দলের নয়’। কথাটা অত্যন্ত সুমধুর। কেননা, এই গুরুত্বপূর্ণ নীতি-নির্দেশনা দেশের অগ্রযাত্রার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। দেশের অধিকাংশ প্রত্যন্ত এলাকায় জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রথম সংযোগস্থল পুলিশ। সেখানে যদি জনগণের অভিজ্ঞতা সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ হয়, তাহলে সরকারের প্রতি তাদের আস্থা বহুগুণে বেড়ে যায়।
তিনি লেখেন, পুলিশ সপ্তাহে বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার বার্তা স্পষ্ট, পুলিশ কোনো রাজনৈতিক দলের নয়, বরং বিধিবদ্ধ আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে।’ এরপর গত মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক র্যাংকিং এত নিচে থাকার প্রধান কারণ হলো ‘রাজনৈতিক প্রভাবে শিক্ষক নিয়োগ, একাডেমিক পারফরম্যান্সের প্রতি পর্যাপ্ত গুরুত্বের অভাব ও গবেষণার ঘাটতি।’
এরপর তিনি লেখেন, জাতি গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান দুটি সম্পর্কে তার এই মন্তব্যগুলো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তার বক্তব্য আমাদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। মুক্ত গণমাধ্যম হিসেবে এসব ক্ষেত্রে আমাদের পেশাগত সহযোগিতা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করছি।
প্রবীণ সাংবাদিক মাহফুজ আনামের লেখা নিয়ে অনেক সমালোচকের প্রধান অভিযোগ হলো, তিনি ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তির প্রতি অতিরিক্ত সহানুভূতিশীল অবস্থান গ্রহণ করেন এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার রাজনৈতিক মূল্যায়ন নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। তার আজকের লেখায়ও সেই প্রবণতার প্রতিফলন দেখা যায়। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য “অত্যন্ত সুমধুর, সুরের মতো” বলে বর্ণনা করার মতো মন্তব্যে সাংবাদিকসুলভ বিশ্লেষণের চেয়ে ব্যক্তিগত মুগ্ধতাই বেশি প্রকাশ পেয়েছে। একই প্রবণতা অতীতেও দেখা গেছে।
সমালোচকদের মতে, একজন সম্পাদক বা জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের কাজ হলো ক্ষমতার প্রতি সমালোচনামূলক দূরত্ব বজায় রাখা। কিন্তু মাহফুজ আনামের লেখাগুলোতে প্রায়ই ক্ষমতাসীনদের প্রতি প্রশংসা, আবেগ এবং ব্যক্তিগত সমর্থনের সুর এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে, তা নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার সীমা অতিক্রম করে “তোষামোদী সাংবাদিকতা” বা “তেলবাজি” হিসেবে প্রতীয়মান হয়।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য ইকোনমিস্ট পত্রিকায় শেখ হাসিনাকে ‘দক্ষিণ এশিয়ার লৌহমানবী’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে উল্লেখ করে মাহফুজ আনাম বলেন, এই মুহূর্তে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর হয়ে তিনি প্রকৃতপক্ষেই হয়ে উঠতে পারেন সেই লৌহমানবী, যাকে আমাদের প্রয়োজন। ২০২৪ সালের ১৯ জানুয়ারি ‘হোয়্যার দ্য পিএম শুড রিয়েলি বি অ্যান আয়রন লেডি’ শিরোনামের লেখায় তিনি এসব কথা বলেন।
২০২৪ সালের ২৯ জুন প্রকাশিত ‘ফ্রম পিপল টু আ বাবল’ শিরোনামের এক লেখায় মাহফুজ আনাম বলেন, টানা ১৫ বছরের শাসনামলে শেখ হাসিনা দেশের অর্থনীতিতে অসামান্য উন্নয়ন অর্জন করেছেন। অবকাঠামো নির্মাণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে (যদিও ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়টি বড় আকারে প্রশ্নবিদ্ধ) তার অসাধারণ অর্জন প্রশংসার দাবিদার। উন্নয়নের ধারায় দেশের প্রশংসনীয় অগ্রগতি অবশ্যই রাষ্ট্র পরিচালনায় শেখ হাসিনার যোগ্য ও অবিচল নেতৃত্বের ফল।
তার ওই লেখার মাত্র দেড় মাসেরও কম সময়ের মধ্যে জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। এর আগে আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা সম্পর্কে মাহফুজ আনামের যে মূল্যায়ন ছিল, দলটি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তা রাতারাতি পাল্টে যায়।
২০২৫ সালের ১৮ এপ্রিল ডেইলি স্টারে ‘আনহেলদি ইলেকশন কন্ট্রুভার্সি মাস্ট বি রিসলভড’ শিরোনামে প্রকাশিত এক কলামে ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের ‘আজীবন শুভাকাঙ্ক্ষী’ হিসেবে নিজেকে ঘোষণা দেন ডেইলি স্টারের প্রকাশক মাহফুজ আনাম। এ দেশের আর কোনো সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের কোনো সরকারের পক্ষে কলাম লিখে এভাবে ঘোষণা দেওয়ার নজির নেই।
ড. ইউনূস সরকারপ্রধানের পদ থেকে কথিত পদত্যাগের হুমকি দিলে মাহফুজ আনাম নিজের পত্রিকায় ‘অভিমানী’ সরকারপ্রধানের ‘মান ভাঙাতে’ কলাম লেখেন, ‘প্লিজ ডোন্ট রিজাইন: অ্যাপিল টু প্রফেসর ইউনূস’। এর বাংলা অর্থ দাঁড়ায়—‘দয়া করে পদত্যাগ করবেন না: ড. ইউনূসের প্রতি আবেদন’।
স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কোনো সরকারপ্রধান বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানকে নিয়ে এমন প্রশংসাযুক্ত ‘কলাম’ মাহফুজ আনামের মতো নামকরা ও প্রথম সারির কোনো সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক লিখেছেন বলে জানা যায়নি।