Image description

গত ১৪ মে সিনিয়র সাংবাদিক নঈম নিজাম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে প্রকাশ করা একটি পোস্ট নিয়ে ঢাকার সাংবাদিক মহলে আলোচনা চলছে। নঈম নিজাম তার “মাহফুজ আনামকে নিয়ে সাঈদ ইস্কান্দারের বাসায় গিয়ে শেখ হাসিনার দুঃখ প্রকাশ” শিরোনামে লেখায় যেসব দাবি করেছেন সেগুলোর একটিকে কেন্দ্র করে কয়েকজন সাংবাদিক ফেসবুকে সমালোচনামূলক পোস্টও করেছেন।

বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর সাবেক সম্পাদক নঈম নিজাম তার লেখায় দাবি করেছেন, খালেদা জিয়ার ১৯৯১-৯৬ সালের সরকারের আমলে কোন এক সময় জিয়া পরিবার ও শেখ হাসিনার পরিবারের মধ্যকার একটি বিবাদের ঘটনা মীমাংসার উদ্দেশ্যে সাংবাদিক মাহফুজ আনাম ((বর্তমানে ডেইলি স্টার পত্রিকার সম্পাদক) হাসিনার গাড়িতে করে খালেদা জিয়ার ছোট ভাই সঈদ ইস্কান্দারের বাসায় গিয়েছিলেন।

নঈম আরও দাবি করেছেন, মাহফুজ আনাম তখন সাঈদ এস্কান্দারের স্ত্রীর সাথে শেখ হাসিনার মুখোমুখি আলাপ (সাঈদের স্ত্রীর অজান্তে) রেকর্ড করতে হাসিনার বিশেষ সহকারী মৃণাল কান্তি দাসকে পরামর্শ দেন।

নঈম নিজাম লিখেছেন, “...আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, শেখ হাসিনা নিজেই সাঈদ ইস্কান্দারের বাসায় যাবেন। শেখ হাসিনা ফোন করেন ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামকে। তিনিও যোগ দেন। মৃণাল সঙ্গে নেন ক্যামেরাম্যান স্বপন সরকারকে। সবাইকে নিয়ে শেখ হাসিনা যান সাঈদ ইস্কান্দারের বাসায়। মাহফুজ আনাম ওঠেন শেখ হাসিনার গাড়িতে। দরজা খুলে দিলে শেখ হাসিনা সবাইকে নিয়ে সামনের অতিথিকক্ষে বসেন। সে সময় মিসেস ইস্কান্দার শাওয়ারে ছিলেন। সাঈদ ইস্কান্দার তখন বাসায় ছিলেন না। দুই ছেলে সামনে আসতেই শেখ হাসিনা তাদের জড়িয়ে ধরেন। চকলেট দেন। কোলে তুলে নিয়ে গল্প শুরু করেন। মাহফুজ আনামের পরামর্শে মৃণাল একটি ছোট টেপ রেকর্ডার চালু করে দেন, যাতে শুরু থেকে পুরো কথোপকথন রেকর্ডে রাখা যায়। স্বপন সরকার ক‍্যামরা দিয়ে ছবি তোলেন।”

এর প্রেক্ষিতে সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়। বেশ কয়েকজন সাংবাদিক প্রশ্ন তুলেন, নঈমের দাবি সত্য হয়ে থাকলে একজন সাংবাদিক কী করে কারো অজান্তে তার বক্তব্য রেকর্ড করার পরামর্শ দিতে পারেন।

সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের লিখেছেন, “তাহলে কি মাহফুজ আনাম সাহেবের কাজ ছিলো শেখ হাসিনার পিআর দেখা? কোন পেশাদারি এখতিয়ারে উনি হাসিনার ফোন কল পেয়ে তার সাথে ঐ বাসায় গেলেন? হাসিনার সাথে কারো বিরোধ মীমাংসা কি উনার পেশাগত দায়িত্বের মধ্যে পড়ে?

এবং অভিভাবকদের বিনা অনুমতিতে সাঈদ ইসকান্দারের কিশোর সন্তানদের কথা রেকর্ড করার বুদ্ধি একজন সম্পাদক কি করে দেয়? বিস্ময়কর! আপনি এটার সাথে বেগম জিয়ার কল রেকর্ড করে ছড়ানোর বেশ মিল খুঁজে পাবেন।”

সাংবাদিক মুক্তাদির রশীদ লিখেছেন, “সংবাদকর্মী হিসেবে বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে। একজন সম্পাদক কিভাবে বিরোধীদলের হয়ে অন্যে গোয়েন্দাগিরি করতে রাজনীতিদের পরামর্শ দিচ্ছেন। নৈতিকভাবে এটা গর্হিত। কারন তিনি এখানে নেগোশিয়েটরের ভুমিকায় কেবল অবতীর্ণ হননি বরং সাধারন নাগরিকের উপর গোয়েন্দাগিরি করতে রাজনীতিবিদদের উস্কেছেন।”

নঈম নিজামের দাবির বিষয়ে ডেইলি স্টার পত্রিকার সম্পাদক মাহফুজ আনামের বক্তব্য জানতে চেয়েছিলেন দ্য ডিসেন্ট।

তিনি বলেছেন, “আমার এখানে যাওয়া শুধু অসত্য না, একেবারে কাল্পনিক।”

নঈমের পোস্টে অসত্য তথ্য পেয়েছে দ্য ডিসেন্ট
নঈম নিজামের পোস্টে অন্তত একটি অসত্য তথ্য থাকার বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে দ্য ডিসেন্ট। নঈম লিখেছেন, “রাজনীতিতে সর্বোচ্চ নেতারও অনেক সময় সঠিক পরামর্শের প্রয়োজন হয়। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সালের সংসদ যেমন প্রাণবন্ত ছিল, তেমনি সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পারস্পরিক সম্মানও ছিল। দুই নেত্রীর রাজনৈতিক বিরোধ যেমন ছিল, তেমনি সংসদে অনেক বিষয়ে তাদের মধ্যে ঐকমত্যও দেখা যেত। এরশাদকে গুলশানের সাব জেল থেকে  কারাগারে পাঠানোর সিদ্ধান্ত সংসদে বিতর্কের ভিতরে হয়েছিলো। একবার দুই নেত্রীর মাঝে একটি কঠিন ভুলবোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। বিষয়টি ছিল সাঈদ ইস্কান্দারের দুই সন্তানের ওপর ধানমন্ডিতে হামলার ঘটনাকে ঘিরে। সাঈদ ইস্কান্দার শুধু প্রধানমন্ত্রীর ভাই নন, তিনি এমপি ছিলেন। তার দুই ছেলে ধানমন্ডির একটি স্কুলে পড়তো।তারা যেত ধানমন্ডি ৩২ নাম্বারের সামনে দিয়ে। ৩২ নাম্বারের সামনে দিয়ে তারা হেঁটে গিয়ে গাড়িতে চড়তো। রাজনৈতিক অনুষ্ঠান থাকলে সড়কটি বন্ধ থাকতো। তখন গাড়ি ঘুরিয়ে নিতে হতো। তেমনই একদিন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। তখন কোন অনুষ্ঠান ছিলো না। তবে সড়ক বন্ধ ছিলো। সাঈদ ইস্কান্দরের সন্তানরা নেমে পড়ে । তারা সড়ক বন্ধের জন্য বকা দেয়। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে কটুক্তি করে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে বাড়ির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা দুই জন বেরিয়ে এসে তর্কে জড়িয়ে পড়ে। কার সন্তান, তা না জেনেই দুই কিশোরকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। কাঁদতে কাঁদতে দুই কিশোর গিয়ে তাদের ফুফু প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছে বিচার দেয়। পুরো ঘটনা খুলে বলে। প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হন। কষ্ট পান । তিনি আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেন। একটা অস্বস্তি তৈরি হয়।”

এখানে তিনি খালেদা জিয়ার ৯১ থেকে ৯৬ সালের শাসনামলের কথা বলছিলেন। এবং একইসাথে দাবি করেছেন ওই সময়ে “সাঈদ ইস্কান্দার শুধু প্রধানমন্ত্রীর ভাই নন, তিনি এমপি ছিলেন”।

এই তথ্যটি অসত্য। কারণ, একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাঈদ এস্কান্দার জীবনে একবার এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন ২০০২ সালে; বোন খালেদা জিয়ার ছেড়ে দেয়া আসনে উপনির্বাচন করে।

২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে বিডিনিউজ২৪ এ প্রকাশিত “খালেদার ভাই সাঈদ এস্কান্দারের মৃত্যু" শিরোনামের এক খবরে বলা হয়, “২০০১ সালে বোন খালেদা জিয়ার ছেড়ে দেয়া ফেনী-১ আসনে উপনির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সংসদ সদস্য হন সাঈদ। সাঈদ বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ছিলেন। ফেনী জেলা বিএনপির সভাপতিও ছিলেন তিনি।”

শামস এস্কান্দার বললেন নঈম ‘বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন’
সাঈদ এস্কান্দারের ছেলে শামস ইস্কান্দারের সাথে নঈমের লেখায় দেয়া তথ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি নিশ্চিত করেন, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে আক্রান্ত সাঈদ ইস্কান্দারের সেই ছেলেটি আসলে তিনি ছিলেন।

শামস বলেছেন, তখন তার বাবা এমপি ছিলেন না। নঈম নিজামের পুরো ঘটনাটির বর্ণনা তিনি পড়েছেন বলে জানিয়ে শামস বলেছেন, কয়েক জায়গায় ‘বিভারন্তিকর তথ্য দিয়েছেন এবং ঘটানটি লঘু করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন’ নঈম। 

শামস দ্য ডিসেন্টকে বলেন, "ঘটনাটি ১৯৯২ সালের, আমি তখন ক্লাস টু'তে পড়ি। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় তিনি সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেন, তাই তার ব্যক্তিগত গাড়িটি দিয়ে আমি স্কুলে যেতাম। যেহেতু, খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত গাড়িটি অনেক আন্দোলন সংগ্রামের কারণে সকলের কাছে পরিচিত। ফলে গাড়িটি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবর রহমানের বাড়ির সামনে এলে খালেদা জিয়ার গাড়ি ভেবে বাড়ির সামনে অবস্থান করা কিছু রাজনৈতিক কর্মী গাড়িতে হামলে পড়ে"।

নঈম নিজামের বর্ননামতে, শামস ৩২ নম্বরের সামনে বকাঝকা করায় বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে লাঞ্ছনা করেছেন– এই দাবির বিষয়ে নির্দিষ্টভাবে জানতে চাইলে শামস ইস্কান্দার বলেন, "প্রথমত আমার বয়স ছিল ১১, ক্লাস টুতে পড়ি, আমি একা ছিলাম গাড়িতে। অথচ নঈম নিজাম বলছেন আমরা দুই ভাই ছিলাম, যা সত্য নয়। দ্বিতীয়ত, একজন ক্লাস টু'তে পড়া ছেলের বকাঝকা করার বয়স হয়েছে কিনা, পাঠকরা যাচাই করবেন। তৃতীয়ত, নিরাপত্তা কর্মীদের সাথে বাকবিতণ্ডার মত করে বর্ণনা করে তিনি ব্যাপারটিকে লঘু করে ফেলার চেষ্টা করেছেন বলে মনে করি। কেননা, সেদিন ৩২ নম্বরের কর্মীরা আমাকে প্রায় ৬ ঘণ্টা সেই বাড়িতে আটকে রেখে গালিগালাজ এবং আমাদের ড্রাইভারকে শারিরিকভাবে প্রহার করে; যা তার বর্ণনায় নেই।"