Image description

দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে খুব একটা স্বস্তিতে নেই বিএনপি সরকার। সঙ্গে আছে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট আর আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া ঋণের বোঝা।

তারওপর ‘হানিমুন পিরিয়ড’ পার হওয়ার আগেই মন্ত্রীদের ‘বেফাঁস মন্তব্যে’ বিব্রত সরকার। ভাবমূর্তি রক্ষায় মন্ত্রিসভায় আসতে পারে রদবদল।
মন্ত্রিসভায় বেশ কয়েকজন প্রবীণ ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ যুক্ত হতে পারেন বলে জানিয়েছে বিএনপি ও সরকারের একাধিক সূত্র।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরামের এক নেতা বলেন, মন্ত্রীদের অতি উৎসাহী বক্তব্যে দল বিব্রত।

বিষয়টি খোদ প্রধানমন্ত্রীরও দৃষ্টি এড়ায়নি। অনেকের ওপর হয়তো অধিক দায়িত্বের বোঝা চেপে আছে।
সঙ্গত কারণেই বেশ কিছু মন্ত্রীর দায়িত্ব পুনর্বণ্টন হওয়ার বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে।
বিএনপির এই নেতা বলেন, যাদের হাতে দুই থেকে তিনটি মন্ত্রণালয় রয়েছে তাদের ক্ষমতা কমবে।

মন্ত্রিসভা থেকে কেউ বাদ পড়ছেন কিনা এমন প্রশ্নে সরাসরি জবাব না দিয়ে বিএনপির এই প্রভাবশালী নেতা বলেন, একথা বলা যায় নতুন মুখ আসছে।

বিএনপি ও সরকারের একাধিক সূত্র জানায়, মন্ত্রিপরিষদে জায়গা পেতে যাচ্ছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান এবং সেলিমা রহমান।

এ ছাড়া দলের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রশিক্ষণ সম্পাদক এবিএম মোশাররফ হোসেন, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল ও সাবেক আন্তর্জাতিক সম্পাদক ও বর্তমান চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহিদুর রহমানের নামও শোনা যাচ্ছে।

মন্ত্রীদের ‘বেফাঁস মন্তব্য’
বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভার নবীন এবং প্রবীণ বেশ কয়েকজন মন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে চলছে আলোচনা-সমালোচনা।

সম্প্রতি লোডশেডিং এবং বিদ্যুতের চাহিদা নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু’র বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল হয়। বিশেষ করে গ্রামে লোডশেডিং নিয়ে তার বক্তব্য বিভিন্ন মহলে ‘হাস্যরসের’ খোরাক জোগায়।

গত ৫ মে গ্রামে লোডশেডিং নিয়ে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘গ্রামে কোনো লোডশেডিং নেই, যেটা হয় সেটা পল্লীবিদ্যুতের লম্বা লাইনের জন্য। কারণ সেখানে ত্রুটি হলে খুঁজে সংস্কার করতে সময় লাগে। এ জন্য বিদ্যুৎটা আসে না। আবার লাইন ঠিক হয়ে গেলে বিদ্যুৎ চলে আসে।’

গরমে তীব্র লোডশেডিংয়ে গ্রাম এলাকার মানুষের মধ্যে ক্ষোভেরও জন্ম দেয়। অনেকে এটিকে গ্রামের মানুষের কষ্টের সঙ্গে মশকরা বলেও অভিহিত করেন।

এর আগে সংসদে বিদ্যুৎ মন্ত্রী বলেছিলেন, চাহিদা অনুযায়ী বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই।

দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি নিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের একটি বক্তব্য ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

তিনি বলেছিলেন, পরিবহন খাতে মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে টাকা তোলা-কে সরাসরি ‘চাঁদাবাজি’ বলা ঠিক হবে না। এটি মূলত সংগঠন পরিচালনার জন্য একটি ‘সার্ভিস চার্জ’।

সড়কে দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ গাড়িচালক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ মন্ত্রীর এই ধরনের বক্তব্যে হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়।

ঈদুল ফিতরের আগেও ‘ঈদযাত্রায় কোথাও বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে না’ বক্তব্য দিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন সড়ক মন্ত্রী।

গত ১৫ মার্চ রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনাল পরিদর্শনে গিয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘কোথাও কেউ বেশি ভাড়া নিচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও ২০, ৩০ বা ৫০ টাকা কম নেওয়া হচ্ছে।’

মন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পর সাধারণ যাত্রী, ভোক্তা অধিকার সংগঠন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়।

সে সময় সাধারণ যাত্রীরা প্রতিটি রুটেই নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি নেওয়ার অভিযোগ করেছিলেন।

‘এই তোমরা কেমন আছো? ভালো? পড়ালেখা কর তো? করতে হবে, নকল আর হবে না।’ শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের এই বক্তব্য নিয়েও ব্যাপক ট্রল হয়।

বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় অতীতের মতো নকলের কোনো সুযোগ না থাকলেও, মন্ত্রীর গৎবাঁধা বক্তব্যে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন মহলে হাস্যরসের সৃষ্টি হয়।

মন্ত্রীদের বেফাঁস মন্তব্য নিয়ে বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাবেক প্রেস সচিব সিনিয়র সাংবাদিক মারুফ কামাল খান বলেন, রাজনীতিতে অভিজ্ঞতা একটা বড় ব্যাপার। সব কথা রাজনীতিতে বলা যায় না, কূটনীতির যেমন পরিভাষা আছে রাজনীতিরও তেমনি কিছু পরিভাষা আছে। কোথায় কখন কী বলা উচিত, কী বলা উচিত নয় এসব বিষয়ে কিছুটা ঘাটতি থাকলেই এমন সমস্যা হয়।

বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার বলেন, মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অনেক সময় অনেক কথা বলে ফেলে, তার মধ্যে শব্দচয়নে যদি ছোটখাটো দু-একটা ভুলত্রুটি হয়ে যায়, তা বড় করে দেখার কিছু নেই।

মন্ত্রিসভায় রদবদল নিয়ে তিনি বলেন, মন্ত্রিসভায় নতুন করে কাউকে নেওয়া এবং পুরোনো কাউকে বাদ দেওয়া এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। একটি নির্বাচিত সরকারের মন্ত্রিসভায় কখন কাকে মন্ত্রী বানাবে অথবা কাকে মন্ত্রিত্ব থেকে বাদ দেবে, এটি নিতান্তই প্রধানমন্ত্রীর বিষয়।

‘বেফাঁস মন্তব্য’ ইস্যুতে রাজনীতি বিশ্লেষক মেজর (অব.) ইমরান বলেন, বিরোধী দলের কর্মীরা পিলার নাড়াচাড়া করে রানা প্লাজা ধসিয়ে দিয়েছে, ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়নি, বন্ধ হয়ে গেছে ইত্যাদি নানা মনগড়া প্রলাপ আমরা অতীতে আওয়ামী আমলের মন্ত্রীদের কাছে শুনেছিলাম। কিন্তু ফ্যাসিস্টের পতনের পরও যদি মন্ত্রীদের কাছে এসব শুনতে হয়, তাহলে পরিবর্তনটা হলো কোথায়?

দু-চারজন মন্ত্রীর বক্তব্যে পুরো মন্ত্রিসভা তথা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং জনগণের মাঝে ভুল বার্তা যেতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।

সিনিয়র সাংবাদিক এবং চর্চা ডট কমের সম্পাদক সোহরাব হাসান বলেন, অতিকথন সব সময়েই বিপদ। বিশেষ করে দায়িত্বশীল জায়গায় থেকে অনেক বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। অতীতেও আমরা দেখেছি অনেক মন্ত্রী-এমপিকে এই অতি উৎসাহী বক্তব্যের জন্য খেসারত দিতে হয়েছে, কিন্তু দুঃখজনক সত্য হচ্ছে আমরা কেউই অতীত থেকে শিক্ষা নিচ্ছি না।