Image description
সেদিন যা লিখতে চেয়েছিলাম, তা হয়নি। ভিন্ন এক লেখা হয়ে যায়। আমি আসলে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাচমেট বন্ধু ইসলাম ভাইয়ের (এন আই খান) একটি স্মৃতি নিয়ে শুরু করবো ভেবেছিলাম। সেটি খাদ্যগ্রহণ নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারের ডাক্তারা তখন যে ক’জন ছিলেন, রোগীর সমস্যা শোনার আগেই তারা প্রেসক্রিপশন লিখে ফেলতেন এমন অভিযোগ ছিল। জ্বর, ঠান্ডা নিরাময়ে ওষুধ, পেটফাঁপা, বদহজম, আমাশয়, ব্লোটিং বন্ধ করা ওষুধ এবং ডায়ারিয়ার হলে সেলাইন পুশ করার জন্য তিনতলার ওয়ার্ডে পাঠিয়ে হতো অন্তত একরাত কাটানোর জন্য।
ইসলাম ভাই কোনো শারীরিক সমস্যায় মেডিকেল সেন্টারের যান, তাকে দেওয়া ডাক্তারের সব অ্যাডভাইসের মধ্যে তার অন্যতম ছিল: ‘গলা গলা খাবেন না’, অর্থ্যাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন ‘খাদ্যে পাকস্থলী টইটম্বুর হয়ে পর যাতে খাদ্যনালীর পুরোটা খাবারে ভরে না ফেলেন। কথাটি কারও ভালো লাগার কথা নয়। এহেন অ্যাডভাইসে কথাটি ইসলাম ভাইয়ের ইগোতে লাগে। সম্ভবত ডাক্তারকে এই বলে ধমক দেন যে আমরা তো হাঁভাতে ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসিনি যে, আমাকে কতটুকু খাবার খেতে হবে, তা আমি জানি না। ইসলাম ভাইয়ের আপত্তি যথার্থ ছিল। নিজে থেকে উপলব্ধি করতে পারলেই হলো, কোন খাবার কখন কতটুকু খেতে হবে।
আমার খাদ্যাভাস, অর্থ্যাৎ ডায়েট ও কোন খাদ্য পুষ্টিগুণে কতটা সমৃদ্ধ তা জানতে আমি কোনো ডায়েটিশিয়ান বা নিউট্রিশনিস্টের পরামর্শ গ্রহণ করিনি। আমি সহজাতভাবেই জানি লতাপাতা কাঁচা বা সেদ্ধ করে খাওয়ার উপকারিতা কি এবং কোন খাবার কতটুকু খাওয়া প্রয়োজন। কোনো খাবারে স্টমাক আপসেট হতে পারে, এমন খাবার ঘরে-বাইরে কখনও খাই না। কোন্ খাবার কোন্ ব্যাধি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে তা কমবেশি জানি। নিয়ন্ত্রিত খাবার খেয়ে দীর্ঘজীবনের অধিকারী হওয়ার আকাঙ্খা নেই, তবে সুস্থ থেকে হাতে থাকা কাজগুলো শেষ করে যাওয়ার আকাংখা আছে।
আমার নানা সখাউদ্দিন আহমেদ একজন নামকরা কবিরাজ ছিলেন। ছোটকালে নানার বাড়ি বেড়াতে গেলে দৌড়াদৌড়ি, বিশাল দীঘিতে সাতার কাটার বাইরে প্রায় পুরো সময় তার দাওয়াই প্রস্তুতপ্রণালী দেখতাম, অচেনা উপকরণের নাম জানতে চাইত । চ্যাবনপ্রাস প্রস্তুত শেষপর্যায়ে আমি এবং আমার তিন মামাতো ভাই -- রাজু, বাচ্চু ও দিনার ছোট ছোট বাটি হাতে কড়াইয়ের চারদিক তওয়াফ করতাম, কখন নানা আমাদের বাটিতে এই সুগন্ধিযুক্ত, মিষ্টিস্বাদের চ্যাবনপ্রাস নিয়ে দীঘির পাশে ঘুরতাম আর ধীরে চেটে চেটে খেতাম, যাতে দ্রুত শেষ না হয়। চ্যাবনপ্রাসের সে কি স্বাদ!
নানার চার কন্যার তৃতীয়া, আমার আম্মা সম্ভবত নানার প্রিয়পাত্রী ছিলেন। নানার দাওয়াই প্র্রস্তুতের উপকরণ তার মুখস্থ ছিল। সেগুলো আমাদের ওপর প্রয়োগ করতেন। যে অসুখই হোক না, বাড়ির ভেতরে-বাইরে নানা গাছের শেকড় বাটর বেটে রস খাওয়াতেন, আমরা সেরে উঠতাম।
ওই যে লতাপাতা, শেকড়-বাঁকড় চিনেছিলাম, সেগুলো বহুদিন যাবত আমার খাবার প্লেটে স্থান পায় স্বল্প পরিমাণে অন্য খাবারও খাই। আয়েশ করে খাই এবং গুণাগুণ বর্ননা করে বন্ধুদের জানাই। আমার বয়স ৭২ বছর। আমার মরহুমা মায়ের দোয়ার পাল্লা ভারি হওয়ায় এখনও আল্লাহর রহমতে শরীর ভালো। বার্ধক্যজনিত কিছু সমস্যা সহনীয় পর্যায়ে আছে। দীর্ঘপথ বেশ জোরে হাঁটতে পারি। লেখালেখির চাপে প্রতিদিন হাঁটা হয় না।
ডাক্তাররা বলেন, সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত খাবারে দীর্ঘজীবন লাভের কথা বলেন।
দীর্ঘজীবনের জন্য একটি প্রাচীন উপদেশ হলো:
১) পেট পূর্ণ করে খাবেন না;
২) ঘন্টাখানেক হাঁটবেন এবং আমার বয়সীরা দৌড়াবেন না;
৩) রাগারাগি করবেন না।
মাঝবয়সীরা জীবনের স্থিতিশীল পর্যায়ে থাকেন; বৃদ্ধরা অবক্ষয়ের পর্যায়ে থাকেন। তাদের বেশির ভাগের দৈহিক শ্রমের কাজ কমে যায়। বেশির ভাগ সময় তাদের বাড়িতেই কাটাতে হয বলে কতটুকু ক্যালোরি খাদ্যগ্রহণ তার জন্য প্রয়োজন এবং সেগুলোর পুষ্টিগুণ কতটুকু তা বিবেচনায় রাখা জরুরী। বেশি খেলে কর্মহীনতার কারণে তাদের ওজন বেড়ে যেতে পারে, যা যে কারও বার্ধক্যে সবচেয়ে বড় দুশমন। যেহেতু শারীরিক তৎপরতা ও বিভিন্ন অঙ্গ অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত হয়, সেক্ষেত্রে খাদ্যগ্রহণের মাত্র নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে হজম সমস্যা বাড়বে এবং গ্যাস্ট্রোইনটেসটাইনাল রোগের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাবে।
খাবার খেতে ভালোভাবে চিবোতে সময় নিন। মানুষের লালার কাজ হলো সেই উপাদানগুলো নির্মূল করে, যেগুলো ক্যান্সারে আক্রাস্ত হওয়ার কারণ ঘটায়। এক মুঠি খাবার মুখে নিয়ে ৩০ বারের বেশি চিবোনো প্রয়োজন।কারণ লালার বিভিন্ন এনজাইম খাদ্যে মিশে ক্যান্সারের কারণ ঘটায় যে উপকরণগুলো, তা দূর বা হ্রাস করতে জোরাল প্রভাব খাটায়।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন। প্রস্রাব করা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। বেশি পানি পান করলে কিডনি থেকে কিডনি দ্বারাউৎসারিত প্রস্রাবের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। আমরা যেভাবে পানি পান করি, সেটি একটি অভ্যাস। স্বল্প পানি পানে কোষ্ঠকাঠিণ্য সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পাবে।
শেষ কথা: সকল বয়সের বন্ধুদের বলছি, “জিহ্বা সংযত করুন, চোখের ক্ষুধা কমান!”
 
-আনোয়ার হোসেইর মঞ্জু