জীবিকার তাগিদে জীবন বাজি রেখে সুন্দরবন এলাকার নদী ও খালে মাছ ধরতে যান জেলেরা আর বনে মধু সংগ্রহ করতে যান মৌয়ালরা। এসব জেলে ও মৌয়ালই এখন বনদস্যুদের প্রধান লক্ষ্য।
সম্প্রতি সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খাল এলাকায় অপহরণের শিকার হন ২২ জন জেলে। গত ৪ ও ৫ মে আলিফ ওরফে আলিম, নানাভাই ও ডন বাহিনী পরিচয়ে অস্ত্রধারী দস্যুরা সুন্দরবনের চুনকুড়ি নদীর গোয়াল বুনিয়া দুনের মুখ, ধানো খালীর খাল, মামুন্দো নদীর মাধভাঙা খাল ও মালঞ্চ নদীর চালতে বেড়ের খাল থেকে তাদের তুলে নিয়ে যায়।
অপহৃতদের স্বজনরা জানান, দর-কষাকষির মাধ্যমে একপর্যায়ে দস্যুদের সঙ্গে সমঝোতা হয়। নির্ধারিত নম্বরে টাকা পাঠানোর পর জেলে ও মৌয়ালদের মুক্তি দেওয়া হয়। গত মঙ্গলবার (১২ মে) দুপুর পর্যন্ত ২০ জন জেলে ও মৌয়াল মুক্তিপণ দিয়ে বাড়ি ফেরেন।
ফিরে আসা জেলে ও স্থানীয় সূ্ত্রে জানা যায়, ডাকাতদলের হাতে অপহরণের শিকার মৌয়াল মুরশিদ আলম ৭০ হাজার, করিম শেখ এক লাখ ২০ হাজার, আবু ইসা ৫৫ হাজার, মমিন ফকির ৪৫ হাজার, আল-আমিন ২৫ হাজার, আবুল বাসার বাবু ৩০ হাজার, আবুল কালাম ৩০ হাজার, শাহাজান গাজী ৪০ হাজার, সিরাজ গাজী ৪০ হাজার, রবিউল ইসলাম বাবু ২০ হাজার, সঞ্জায় ২০ হাজার, আল-মামুন ২০ হাজার, হুমায়ুন ২০ হাজার, মনিরুল মোল্লা ২০ হাজার, রবিউল ইসলাম ২০ হাজার, হৃদয় মণ্ডল ২০ হাজার, আব্দুল সালাম ৪০ হাজার, ইব্রাহিম গাজী ৫৫ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ফিরেছেন।
এদিকে, না ফেরা জেলেদের পরিবারে চলছে আহাজারি। দিনের পর দিন তাদের বাড়িতে চুলা জ্বলছে না। সন্তানদের চোখে ঘুম নেই, স্বজনদের বুকফাটা কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে উপকূলের জনপদ।
২০১৮ সালে সরকারিভাবে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল। ওই সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে বহু দস্যু আত্মসমর্পণ করে। এতে নদী ও বনে অনেকটা স্বস্তি ফিরে আসে। তবে সেই স্বস্তি আবারও হারিয়ে গেছে।
সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় জেলে ও মৌয়ালরা জানান, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় নতুন ও পুরনো দস্যু বাহিনীর তৎপরতা বেড়েছে। বর্তমানে সুন্দরবনের প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটার নদী ও বনাঞ্চলজুড়ে অন্তত ১৬টি ছোট-বড় দস্যু বাহিনী সক্রিয়। এর মধ্যে করিম-শরীফ বাহিনী, নানা ভাই বাহিনী, ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী, ছোট সুমন বাহিনী, আলিফ বাহিনী, বুড়ো জাহাঙ্গীর বাহিনী, সবুজ-জাহাঙ্গীর বাহিনী, আল-আমীন বাহিনী, দুলাভাই বাহিনী, জনাব বাহিনী ও আসাবুর গ্রুপের নাম বেশি আলোচনায় এসেছে।
জেলেরা জানান, দস্যুরা গভীর বনাঞ্চল ও নদীপথকে ব্যবহার করছে। সুযোগ বুঝে মাছ ধরার ট্রলার ও নৌকা থামিয়ে জেলেদের অপহরণ করা হচ্ছে। পরে মুক্তিপণ দাবি করছে তারা। টাকা না পেলে নির্যাতনের ঘটনাও ঘটছে।
এদিকে, দস্যু আতঙ্ক এখন শুধু জেলেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন শিল্পেও। বিভিন্ন সময় পর্যটকবাহী ট্রলার কিংবা রিসোর্টে ডাকাতি চেষ্টার খবর পাওয়া যাচ্ছে। ফলে পর্যটকদের মাঝেও বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা।
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, সুন্দরবনে দ্রুত নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে পর্যটন খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে। তবে উপকূলবাসী শুধু আশ্বাস নয়, কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান চান। তাদের দাবি, দস্যু বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ও ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি এলাকার জেলে মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। নদীতে না গেলে অনাহারে থাকতে হয়। কিন্তু এখন নদীতে গেলেও ভয় ফিরে আসতে পারব তো? আমাদের পাড়া দিয়ে হাঁটলে শুনতে পাই, কোনো না কোনো লোককে ডাকাতদল তুলে নিয়ে গেছে।’
উপকূলীয় জেলেরা বলছেন, শুধু অভিযান চালিয়ে দস্যুতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এজন্য গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সমন্বয় এবং নদীপথে স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা খুলনার সমন্বয়কারী অ্যাড. মোমিনুল ইসলাম বলেন, ‘সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়, এটি উপকূলের লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার উৎস এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। সেই সুন্দরবন যদি দস্যুদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়, তবে তা শুধু উপকূলের মানুষের জন্য নয়, পুরো দেশের জন্যই অশনিসংকেত।’
পশ্চিম সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. মশিউর রহমান বলেন, জলদস্যু নির্মূলে কোস্টগার্ডের সঙ্গে যৌথ অভিযান চলমান রয়েছে। তবে অপহৃতদের পরিবার বা সহযোগীরা ডাকাতদলের জানমালের নিরপত্তার শঙ্কায় বিস্তারিত তথ্য দিয়ে আমাদের সহযোগিতা করে না। তারা জীবন বাঁচাতে নিজেদেও মতো করে ফিরে আসে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযানও জোরদার করেছে। কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী যৌথ অভিযান চালিয়ে গত দেড় বছরে বিভিন্ন অভিযানে ৬১ জন দস্যুকে আটক করেছে। উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ ও দেশি অস্ত্র।
সুন্দরবন পশ্চিম বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, প্রশাসনকে সহযোগিতায় জেলেদেরও এগিয়ে আসতে হবে। কোনো জেলে অপহরণের শিকার হলে, তার পরিবার যদি থানায় অভিযোগ না দেয়, তাহলে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের সমস্য হয়। এ ব্যাপারে জেলে-মৌয়াল ও তাদের পরিবারকে সচেতন হতে হবে।