Image description

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগে শিক্ষাগত যোগ্যতা, গবেষণা কিংবা প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার কোনো সুস্পষ্ট ও কার্যকর মানদণ্ড নেই। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দলীয় বিবেচনাই এসব নিয়োগের প্রধান ভিত্তি— এমন অভিযোগ করা হচ্ছিল। সরকার পরিবর্তন হলেও এ অবস্থা খুব একটা বদলায়নি।

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে ভিন্নধারার আভাস মিলেছিল। সার্চ কমিটি গঠনের উদ্যোগও নেওয়া হয়। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, সেই প্রক্রিয়া কার্যকর হয়নি। সে সময় নিয়োগে একক রাজনৈতিক প্রভাব কিছুটা কম থাকলেও অধিকাংশ উপাচার্যই কোনো না কোনো রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নতুন রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই ধারা আরও স্পষ্ট হয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পর বড় রদবদল হয়েছে উচ্চশিক্ষা প্রশাসনে। ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট), বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পেয়েছে নতুন উপাচার্য। একই সময়ে পরিবর্তন আনা হয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান পদেও। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার একসঙ্গে ১১টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ভিসি নিয়োগ দিয়েছে সরকার। সব মিলিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর এখন পর্যন্ত নিয়োগ পেয়েছেন ১৮ জন উপাচার্য।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, উচ্চশিক্ষা প্রশাসনে পরিবর্তনের প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে আগের ধারাই বহাল। নতুন নিয়োগ পাওয়া অধিকাংশ উপাচার্যই বিএনপিপন্থী শিক্ষক হিসেবে পরিচিত। তাদের মধ্যে কেউ কেউ অতীতে দলটির নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিয়েছেন, আবার কেউ সরাসরি ছিলেন দলীয় পদে। একাধিক সূত্র জানায়, শুধু উপাচার্য পদেই নয়, একই রাজনৈতিক বিবেচনা চলছে উপ-উপাচার্য, ট্রেজারার, এমনকি ডিন নিয়োগ ও নির্বাচনে।

১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী পরিচালিত চারটি স্বায়ত্তশাসিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান— ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজ নিজ আইনে বিধান রয়েছে যে, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট নির্বাচন করার পর রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগ পাবেন। যদিও এটিও মানা হয় না। আর অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের কোনো মানদণ্ডই নেই। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি উপাচার্য নিয়োগ দিলেও তার আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা পাঠানোর পর প্রধানমন্ত্রীর সম্মতিক্রমে তা চূড়ান্ত হয়। দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলছে একই ধারা।

কারা পেয়েছেন নিয়োগ

গত ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। তিনি ঢাবির পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং বিএনপির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার তাকে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য করেছিল। ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় প্রচারে অংশ নিতেও দেখা গেছে ওবায়দুল ইসলামকে। এ ছাড়া ২০১৮ সালে বাগেরহাট-৪ আসন থেকে বিএনপির হয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্রও কিনেছিলেন তিনি।

একই দিনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান ঢাবির উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মামুন আহমেদ। তিনি বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের আহ্বায়কের দায়িত্বে ছিলেন। প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের এই অধ্যাপক বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা এবং বিএনপির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা-জাসাসের সভাপতিও ছিলেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-১ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন চেয়েছিলেন বলেও জানা যায়।

ঢাবির উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক আব্দুস সালাম, তিনি ঢাবি সাদা দলের বর্তমান যুগ্ম আহ্বায়ক। উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) হয়েছেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী। তিনি জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা, জীববিজ্ঞান অনুষদ সাদা দলের সাবেক আহ্বায়ক, ন্যাশনালিস্ট রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সাবেক মহাসচিব।

এ ছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক মো. ফরিদুল ইসলাম। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া পরিষদের সাধারণ সম্পাদক। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য নিয়োগ পেয়েছেন মোহাম্মদ আল-ফোরকান। জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগের এই অধ্যাপক জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সিনিয়র সহসভাপতি।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ পেয়েছেন ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রইস উদ্দিন। তিনি বর্তমানে শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সাদা দলের সাধারণ সম্পাদক।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক একেএম মতিনুর রহমান। তিনি সাদা দলের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ছিলেন। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক এম এম শরীফুল করীম। তিনি জাতীয়তাবাদী শিক্ষক সংগঠন ‘ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ (ইউট্যাব)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে রয়েছেন। এ ছাড়া নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ, ডিনসহ অন্য প্রশাসনিক পদগুলোতেও বসেছেন বেশিরভাগ বিএনপিপন্থী শিক্ষক।

সার্চ কমিটি নিয়েও প্রশ্ন

২০২৫ সালের মে মাসে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের জন্য সুপারিশ করতে গঠন করা হয়েছিল একটি ‘সার্চ কমিটি’। কমিটির সুপারিশে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে আর সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। বিএনপি সরকার গঠনের পর গত এপ্রিলে সার্চ কমিটি পুনর্গঠন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ছয় সদস্যের এ কমিটিতে সভাপতি করা হয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেককে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন ঢাবির উপাচার্য ওবায়দুল ইসলাম, রাবির উপাচার্য মো. ফরিদুল ইসলাম, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান ও ঢাবির মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক মো. মোর্শেদ হাসান। মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়) কমিটির সদস্য সচিব হয়েছেন।

এই সার্চ কমিটি নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। বিতর্ক হয়েছে কমিটিতে সচিবকে রাখা নিয়ে। শিক্ষাবিদদের মতে, সার্চ কমিটির সভাপতির দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানের ওপর অর্পণ করা হলে তা আরও যুক্তিযুক্ত হতো। কারণ, ইউজিসি দেশের উচ্চ শিক্ষার কেন্দ্রীয় সংস্থা এবং এর নেতৃত্ব সাধারণত অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদদের হাতেই থাকে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাস্তব সংকট, গবেষণার সীমাবদ্ধতা ও অ্যাকাডেমিক চাহিদা সম্পর্কে গভীরভাবে অবগত। একইভাবে কোনো অবসরপ্রাপ্ত স্বনামধন্য অধ্যাপক বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষককে এই দায়িত্ব দিলে কমিটি আরও নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হতে পারত।

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদিও নতুন নিয়োগ পাওয়া অনেক শিক্ষক ব্যক্তিগতভাবে ভালো গবেষক ও অ্যাকাডেমিক হিসেবে পরিচিত, তবু নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব স্পষ্ট থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

তাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদগুলোতে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পেলে অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা ও ভিন্নমতের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও দলীয় প্রভাব বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে উচ্চশিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

শিক্ষাবিদ ড. মনসুর আহমেদ বলছিলেন, ‘শুধু একজন ব্যক্তি ভালো শিক্ষক বা গবেষক হলেই হবে না, তাকে কী প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। যদি রাজনৈতিক পরিচয় নিয়োগের মূল মানদণ্ড হয়ে যায়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় ধীরে ধীরে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে তার চরিত্র হারাবে। রাজনৈতিক প্রভাব কমানো না গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলা কঠিন হবে।’

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার মান বাড়াতে যোগ্যদের সমন্বয়ে উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং উচ্চশিক্ষা কমিশন প্রয়োজন জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন বলছিলেন, ‘এই মন্ত্রণালয় বা কমিশনের অধীনে একটি সার্চ কমিটি উপাচার্য নিয়োগে কাজ করবে। কমিটিতে দেশি ও বিদেশি সদস্য থাকবেন। সেখান থেকে সৎ ও যোগ্যদের উপাচার্য হিসেবে বেছে নেওয়া হবে।’

তার মতে, ‘নির্বাচনের মাধ্যমে কখনো যোগ্য উপাচার্য পাওয়া যাবে না। কারণ, নির্বাচন করতে গেলে নানা সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েই তাদের ভোটে জিতে আসতে হবে এবং সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান কম্প্রোমাইজ করতে হবে।’

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেছেন, বাংলাদেশে অতীতে যে দলই ক্ষমতায় এসেছে, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে নিজেদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদেরই নিয়োগ দিয়েছে। তার ভাষায়, ‘সরকার বদলেছে, দল বদলেছে; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় নিয়োগের সংস্কৃতি বদলায়নি।’

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় উপাচার্য নিয়োগ রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া হয়েছে কি না— সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক বলেছেন, “একজন লোকের রাজনীতি করা কি অপরাধ?’ শিক্ষাগত যোগ্যতাকে সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সর্বোচ্চ ‘পারফরম্যান্স’ দেখে বিশ্ববিদ্যালয় অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।”