Image description

তপ্ত দুপুর। এক হাতে বইখাতা কাঁধে চেপে নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোতে ধীরে ধীরে পা ফেলছে চতুর্থ শ্রেণির রিয়াদ। আরেক হাতে শক্ত করে ধরে আছে বাঁশের হাতল। নিচে বইছে বুড়াইল নদী। তাকালেই নাকি মনে হয়, এই বুঝি সব কেঁপে উঠল, এই ফসকালো পা। এতসব ভয় নিয়ে অতি সাবধানে প্রতিদিন সাঁকো পার হয় ছেলেটি। কারণ, স্কুলে যাওয়া-আসার এটিই পথ।

এই বুড়াইল নদী গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তারাপুর ইউনিয়নে। কোনো স্থায়ী সেতু নয়, চরখোর্দ্দা, নিজাম খা ও লাটশালা গ্রামের মানুষের চলাচলের জন্য নদীর ওপর আছে বাঁশের কয়েকটি জীর্ণ সাঁকো। নিত্যদিনের চলাফেরায় তো বটেই, সাঁকোর কারণে এসব গ্রামে বিয়ে নিয়েও পোহাতে হয় ঝক্কি। 

চরখোর্দ্দা গ্রামের আব্দুল জলিল অনেকদিন ধরেই মেয়ের জন্য খুঁজছেন পাত্র। হতাশ কণ্ঠে বললেন, ‘মেয়ের বিয়ের কথা বলতে গেলে প্রথমেই রাস্তার কথা জিজ্ঞেস করে। যখন শুনে বাঁশের সাঁকো পার হয়ে যেতে হয়, তখন অনেকে আর আগ্রহ দেখায় না।’

নিজাম খা গ্রামের রহিমা বেগম জানালেন আরেক ঝামেলার কথা। বিয়ে কোনোভাবে হয়ে গেলেও ‘বরযাত্রী আনা-নেওয়া নিয়ে অনেক সমস্যা হয়। বর্ষাকালে মানুষ আসতেই চায় না। যোগাযোগ ভালো না থাকায় আমাদের সামাজিকভাবেও ভোগান্তি পোহাতে হয়’- বিরক্তি নিয়েই বললেন তিনি।

তিন গ্রাম ঘুরে চোখে পড়ল সাঁকোগুলোর নাজুক হাল। বিভিন্ন অংশে পচে গেছে বাঁশ। কোথাও পাটাতন উঠে তৈরি হয়েছে বড় বড় ফাঁকা। দড়ি দিয়ে বাঁশ বেঁধে কোনোরকম টিকিয়ে রাখা হয়েছে কাঠামো। একসঙ্গে দুইজন উঠলেই দুলতে শুরু করে পুরো সাঁকো। প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হচ্ছে প্রায় ৫০০ পরিবারের অন্তত ২০ হাজার মানুষ।

স্থানীয় কৃষক আব্দুল হাকিম প্রতিদিন জমিতে কাজ করতে যান নদীর ওপারে। হাতে সরঞ্জাম আর কাঁধে ফসলের বোঝা নিয়ে পার হতে হয় সাঁকো।

‘ভয় তো সবসময়ই লাগে। কিন্তু উপায় কী? এই সাঁকো ছাড়া অন্য রাস্তা নাই। বর্ষাকালে আরও ভয়ংকর অবস্থা হয়’- বললেন তিনি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি স্থায়ী সেতুর দাবি জানিয়ে আসছেন প্রায় ৪০ বছর ধরে। নির্বাচন এলেই মেলে জনপ্রতিনিধিদের প্রতিশ্রুতি, যা পরে মিলিয়ে যায় হাওয়ায়। গ্রামবাসীর মনে বাড়ছে ক্ষোভ ও হতাশা।

সম্প্রতি স্থানীয় চেয়ারম্যানের উদ্যোগে কয়েকটি সাঁকোর কিছু সংস্কার হয়। নতুন বাঁশ বসিয়ে আপাতত চলাচলের উপযোগী করা হলেও সেটিকে সাময়িক সমাধান হিসেবে দেখছেন এলাকাবাসী। বলছেন, বর্ষা এলেই আবার বেহাল হবে সাঁকো।

স্থানীয় ব্যবসায়ী নুর ইসলাম মনে করছেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় এসব গ্রামের কৃষিপণ্য পরিবহন, দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড এমনকি সামাজিক জীবনেও পড়ছে বিরূপ প্রভাব। একটি পাকা সেতু বদলে দিতে পারে পুরো এলাকার জীবনমান। 

তারাপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম লেবু জানালেন, আপাতত কিছু সংস্কার করে সাঁকোগুলো চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে। 

‘তবে বুড়াইল নদীর ওপর একটি পাকা সেতু নির্মাণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে এবং বিষয়টি বাস্তবায়নের জন্য ধারাবাহিকভাবে যোগাযোগ করা হচ্ছে’- আশ্বাস এই জনপ্রতিনিধির।