নাটোরের বাগাতিপাড়ার জামনগর গ্রাম। প্রতিদিন ভোরে ওই গ্রাম থেকে ভেসে আসা এক অদ্ভুত ছন্দময় শব্দ দূরের অন্যান্য লোকালয় থেকে শোনা যায়। পাথর কিংবা মেশিনে শঙ্খ ঘষার ওই শব্দই বলে দেয়, জামনগরের শাঁখারিপল্লিতে আরও একটি ঐতিহ্যের সকাল শুরু হয়েছে। শত শত বছর ধরে চলা এই শিল্প এখন ‘জিআই’ স্বীকৃতির দোরগোড়ায়। তাই তো এখানকার শাঁখারিদের মনে অন্যরকম এক আনন্দ দোল খাচ্ছে।
জানা যায়, এই শিল্পের শুরুটা আজ থেকে কয়েকশ বছর আগে। ইতিহাস বলে, জীবন ও জীবিকার সন্ধানে মান্নার উপসাগরের তীর থেকে শঙ্খশিল্পীরা এসে প্রথম বসতি গাড়েন বরিশালের বাকেরগঞ্জে। ১৬১০ সালে বাংলার রাজধানী যখন সোনারগাঁ থেকে ঢাকায় আসে, তখন সুবেদার ইসলাম খাঁ তাদের নিয়ে আসেন নতুন নগর সাজাতে। কিন্তু সময়ের আবর্তে রাজধানী মুর্শিদাবাদে চলে গেলে, সেই কারিগররা বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়েন দেশের নানা প্রান্তে। এরই এক বড় অংশ আস্তনা গাড়েন নাটোরের জামনগরে। প্রায় দুইশ বছর ধরে বংশপরম্পরায় জামনগর ইউনিয়নকে তারা শাঁখার এক অনন্য তীর্থস্থান হিসাবে গড়ে তুলেছেন। এখানকার ৬০-৭০টি পরিবারের প্রায় সব সদস্য এই শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত। উৎসব-পার্বণ এলে তাদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। প্রবীণ কারিগর জয়দেব কুমার সেন জানান, একটি আস্ত শঙ্খ থেকে পরিধানযোগ্য শাঁখা হয়ে ওঠার গল্পটা মোটেও সহজ নয়। একটি শাঁখা পূর্ণতা পায় ৫টি ধাপ পেরিয়ে। শঙ্খের খোলস আলাদা করা, নির্দিষ্ট মাপে গোল করে পিস করা, খসখসে ভাব দূর করে মসৃণ করা, নিপুণ হাতে নকশা খোদাইয়ের পর শ্বেতশুভ্র উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে আনা। আগে যেখানে পাটায় ঘষে সারাদিনে ৫ জোড়া শাঁখা হতো, এখন যান্ত্রিক ছোঁয়ায় দিনে তৈরি হয় ৫০ জোড়া। ভারত ও শ্রীলংকা থেকে আসা কাঁচামাল দক্ষ পুরুষ ও নারী কারিগরদের হাতের জাদুতে হয়ে ওঠে শিল্প। জামনগরের শাঁখা এখন আর কেবল ধর্মীয় অলংকার নয়, এটি আভিজাত্যের প্রতীক। এখানে তৈরি হচ্ছে বিচিত্র সব নাম ও নকশার শাঁখা। এর মধ্যে রয়েছে সোনা শাঁখা, পাথর শাঁখাকড়ি শাঁখা, মান্তরা শাঁখাচড়া শাঁখা, ব্রেসলেট শাঁখা ও সাধারণ শাঁখা। এসব শাখা ২শ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। তবে স্বর্ণখচিত শাঁখার দাম ওঠে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত।
কারিগর সুমতি রানী জানান, পরিবারের সবাই মিলে তারা শাঁখা তৈরি করেন। প্রথমে মহাজনরা কাঁচামাল দিয়ে যান। পরে তৈরি শাঁখা মহাজনরাই নিয়ে যান। পূজার সময় কাজ অনেক বেশি থাকে। শাঁখারিপাড়ার আরেক কারিগর দুর্জয় কুমার ধর জানান, তারা বংশপরম্পরায় এ কাজ করে আসছেন। বিভিন্নরকম ডিজাইনের শঙ্খ তৈরি করেন তারা। শান্ত কুমার পাল নামে স্থানীয় প্রবীণ এক চা দোকানি জানান, জন্মের পর থেকেই তিনি দেখছেন এই গ্রামে শাঁখা তৈরি হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এখানে শাঁখা কিনতে আসেন। এখান থেকে শাঁখা সারা দেশে যায়। স্থানীয় ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান জানান, শুধু দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করেই এখানে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার শাঁখা বিক্রি হয়। জামনগরের এই শিল্পের প্রাণশক্তি হলো এখানকার নারীরা। সুমতি রানী ও নিপারানী দত্তের মতো কারিগররা দুই দশক ধরে এ পেশায় লড়ছেন। এই গ্রামের ইরানী সেন এখন আর কেবল পাইকারদের ওপর নির্ভরশীল নন। তিনি প্রযুক্তির ব্যবহার করে অনলাইনে সরাসরি ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন নিজের হাতে তৈরি শাঁখা। আষাঢ় থেকে আশ্বিন-এ কয়েক মাস কারিগরদের দম ফেলার সময় থাকে না। তৈরি শাঁখা থেকে অর্জিত আয়েই তাদের সংসার চলে। সন্তানদের শিক্ষার খরচও চলে এ আয় থেকে।
এদিকে জামনগরের এই ঐতিহ্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে প্রশাসন কাজ করছে। নাটোরের জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন জানান, শাঁখারিপল্লির সার্বিক তথ্য ও নমুনা সংগ্রহ করে তারা ঢাকায় পাঠিয়েছেন। পূর্ণাঙ্গ ডকুমেন্টেশন জমা দেওয়া হয়েছে। অনুমোদন পেলেই বাগাতিপাড়ার শাঁখা অফিশিয়াল ‘জিআই পণ্য’ হিসাবে স্বীকৃতি পাবে।
এই শিল্প নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও বেশ আশাবাদী। তারা মনে করেন, জিআই স্বীকৃতি পেলে জামনগরের প্রাচীন এই গৌরব শুধু নাটোর নয়, সারা বিশ্বের বাজারে বাংলাদেশকে উপস্থাপন করবে। বিয়েসহ যে কোনো উৎসবে যখন নতুন লাল পেড়ে শাড়ি আর শুভ্র শাঁখা পরে বাঙালি নারীরা সাজেন, সেই সৌন্দর্যের পেছনে মিশে আছে জামনগরের শাঁখারিদের শত বছরের সাধনা। জিআই স্বীকৃতি আসার পর এই শাঁখার উজ্জ্বলতা শুধু হাতে নয়, বিশ্বমঞ্চে জ্বলজ্বল করবে।