রাজধানীর ফুটপাত থেকে শুরু করে বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, পরিবহন সেক্টরসহ বিভিন্ন খাতে জেঁকে বসেছে চাঁদাবাজদের থাবা। এই চাঁদাবাজদের নির্মূল করতে বিশেষ অভিযান শুরু করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশেষ অভিযান শুরুর পর রাজধানীর চিহ্নিত চাঁদাবাজরা গাঢাকা দেওয়ায় ১৪ দিনে তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজের মাত্র ১৮৪ জনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা মতিঝিল।
মতিঝিল বিভাগের সাতটি থানা (মতিঝিল, পল্টন, খিলগাঁও, সবুজবাগ, শাহজাহানপুর, মুগদা ও রামপুরা) এলাকায় তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজের সংখ্যা ১২৭ জন। এই তালিকা ও তালিকার বাইরে থাকা ৪৪ জন চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মতিঝিল বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ।
এই পুলিশ কর্মকর্তার কথার সত্যতা মিলেছে গুলিস্তান এলাকার হকারদের সঙ্গে কথা বলে।
গত ৪ মার্চ ডিএমপি সদর দপ্তরে এক মতবিনিময়সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ রাজধানীর চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশের পর ঢাকা মহানগর পুলিশ, গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা যৌথভাবে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করে। তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পর রাজধানীতে এক হাজার ২৮৫ জন চাঁদাবাজের প্রাথমিক একটি তালিকা করা হয়।
জানা গেছে, বিশাল এই চাঁদাবাজ বাহিনীর পেছনে কলকাঠি নাড়ছে ৩১২ জন প্রভাবশালী। এদের বেশির ভাগ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত। পুলিশ সূত্র জানায়, তালিকায় নাম থাকা চাঁদাবাজদের ওপর কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে। রাজনৈতিক পরিচয় যাই থাকুক, অপরাধী হিসেবে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। পুলিশ এও জানিয়েছে, নতুন কোনো চাঁদাবাজ বা অপরাধীর নাম পাওয়া গেলে তা তাৎক্ষণিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
রাজধানীর মিরপুর চাঁদাবাজির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। মিরপুর জোনের সাতটি থানা এলাকায় চাঁদাবাজির স্পট রয়েছে দেড় শতাধিক। এসব স্পট থেকে নিয়মিত চাঁদা তোলে এমন ৭৩ জনের নাম তালিকায় রয়েছে। মিরপুর, গাবতলী, শাহ আলী, পল্লবী, কাফরুল, দারুসসালাম ও রূপনগর এলাকায় মূলত পরিবহন, ফুটপাত, গ্যারেজ এবং অবৈধ বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজি চলে। গাবতলী বাস টার্মিনালকে কেন্দ্র করে চলে বিশাল অঙ্কের চাঁদাবাজি। এ ছাড়া মূল সড়কে অবৈধ বাস-ট্রাক পার্কিং, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা স্ট্যান্ড এমনকি ময়লা সংগ্রহকারীদের কাছ থেকেও চাঁদা আদায় করা হয়। মিরপুরের ডিসি মোস্তাক সরকার জানিয়েছেন, তালিকাভুক্তদের মধ্যে বেশ কজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের অবস্থান শনাক্তে গোয়েন্দা পুলিশ কাজ করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকার চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। কিন্তু ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে নতুন মুখ দেখা যাচ্ছে।
পুরান ঢাকার তাঁতিবাজার থেকে বাবুবাজার সেতু পর্যন্ত এবং সোয়ারিঘাট এলাকা থেকে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয়। মূলত রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাক ও পিকআপ ভ্যান থেকে নিয়মিত ২০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়। পুলিশের তালিকা অনুযায়ী, রিচার্ড ভূঁইয়া, সাইদসহ বেশ কিছু চিহ্নিত চাঁদাবাজ ওই এলাকায় সক্রিয়।
ডিএমপির বিশেষ অভিযানের পাশাপাশি কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) এবং র্যাবও অভিযানে রয়েছে। সিটিটিসি সম্প্রতি হাজারীবাগ ও পল্টন এলাকায় অভিযান চালিয়ে মাদক ও চাঁদাবাজিতে জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের কাছ থেকে বিপুল মাদক উদ্ধার করা হয়।
র্যাব-১০-এর সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) এম জে সোহেল জানান, সম্প্রতি যাত্রাবাড়ী ও কোতোয়ালি থানা এলাকা থেকে চাঁদাবাজচক্রের দুই হোতা শশি, হানিফসহ ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরা আন্ত জেলা ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান থেকে কাঠের লাঠি দিয়ে ভয় দেখিয়ে জোর করে চাঁদা আদায় করত।
রাজধানীর চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গত এক বছরে বেশ কয়েকটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গুলশানে ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ‘টেলি সুমন’ হত্যাকাণ্ড, বাড্ডায় কামরুল আহসান সাধন হত্যা এবং মিটফোর্ড এলাকায় সোহাগ হত্যাকাণ্ডের মূলে ছিল এই অবৈধ চাঁদাবাজির অর্থের ভাগাভাগি।
পুলিশ বলছে, চাঁদাবাজি একটি শহরের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তোলে। তবে সাধারণ মানুষ বা ব্যবসায়ীদের ভয় পাওয়ার কারণ নেই। কেউ চাঁদা দাবি করলে তাৎক্ষণিক জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ অথবা পাশের থানায় জানালে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।