দেশের মানুষের ক্ষুদ্র বিনিয়োগ বা সঞ্চয়ের খাতগুলো প্রায় বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে। ব্যাংক, লিজিং কোম্পানি, শেয়ারবাজার, বিমা ও সমবায়-সব খাতই গভীর অনিশ্চয়তায়। এর কোনো খাতেই বিনিয়োগ বা সঞ্চয়ের নিরাপত্তা নেই। বেশির ভাগ ব্যাংকে টাকা রাখলে মুনাফা তো দূরের কথা, ফেরত পাওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। বড় কয়েকটি ব্যাংক ছাড়া সবকটিই ঝুঁকিতে। ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অনেকটা লাইফ সাপোর্টে। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করলে মূলধন হারানোর ভয়, বিমা কোম্পানিতে অর্থ জমা রাখলে আর ফেরত পাওয়া যায় না। সমবায় নিয়ে নানা ধরনের অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষ ও বিনিয়োগকারীদের সামনে নিরাপদ আশ্রয় সংকট তৈরি হয়েছে। তবে এই সমস্যা বর্তমান সরকারের সৃষ্টি নয়। এর অধিকাংশ উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ অবস্থা দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক নয়। তাদের মতে, আর্থিক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ড. মইনুল ইসলাম বুধবার যুগান্তরকে বলেন, আর্থিক খাতের এই আস্থা সংকট সাধারণ বিষয় নয়। এই সংকট অনেক গভীরে। পুরো খাতের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে এখান থেকে সহজে উত্তরণ সম্ভব নয়। তিনি বলেন, সত্যিকার অর্থেই দেশের আর্থিক খাতে ভালো চর্চা না হলে সমস্যা আরও বাড়বে। ড. মইনুল ইসলাম বলেন, আগামীতে ভালো নীতির চর্চা হবে, সেই লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরকে যেভাবে সরানো হলো, তা শুধু ব্যাংকিং খাত নয়, সাধারণ মানুষও এটাকে ভালোভাবে নেয়নি। আমি মনে করি এই সিদ্ধান্ত ব্যাংকিং খাতের প্রতি মানুষের আস্থা আরও নষ্ট করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বুধবার যুগান্তরকে বলেন, আর্থিক খাতের সমস্যা সমাধানে গ্রাহকের আস্থা ফেরানো জরুরি। আর এই আস্থা ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে। যেমন বড় অঙ্কের যেসব অর্থ পাচারের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো উদ্ধারে ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি’ কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটি কাজ করছে। এছাড়াও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যাংকগুলোর সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে। পর্ষদে পর্যবেক্ষক দেওয়া হয়েছে। নতুন করে আর যাতে বেনামি ঋণ তৈরি না হয়, সেজন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, শুধু বড় গ্রাহক নয়, ছোট গ্রাহকদের মধ্যেও অনেকে খেলাপি হয়েছে। খেলাপি হওয়ার পেছনে তারা বিভিন্ন কারণ বলছেন। কিন্তু তাদের এই খেলাপি ঋণ যৌক্তিক কিনা সেটিও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক তার সাধ্য অনুসারে চেষ্টা করছে।
ব্যাংক খাত : বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। এছাড়াও খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ। কারণ, বহু ব্যাংক বছরের পর বছর প্রকৃত তথ্য গোপন করেছে। হাতেগোনা কয়েকটি ব্যাংক ছাড়া বাকিগুলোর অবস্থা খারাপ। ১২টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৭০ শতাংশের উপরে উঠে গেছে। অনেক ব্যাংকে আমানতকারীরা টাকা তুলতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন। ৬২টি ব্যাংকের মধ্যে ৬৬ শতাংশই দুর্বল অবস্থায়। ইতোমধ্যে ২৩টি ব্যাংকে মূলধন ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা। ফলে ব্যাংক খাতে আমানতকারী কিংবা ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের আস্থা নেই।
ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাত : সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, দেশের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতের অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ। ২০টি প্রতিষ্ঠান রেড জোনে আছে। এর মধ্যে ৯টির অবস্থা এতই খারাপ, যা অবসায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে সেখান থেকে তিনটি প্রতিষ্ঠান বাদ দেওয়া হয়েছে। ৬টি প্রতিষ্ঠান অবসায়নের ঘোষণা আসতে পারে। আমানতের অর্থ ফিরে পেতে এ ছয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ১২ হাজারের বেশি আমানতকারী আন্দোলনে নেমেছেন। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো-এফএএস ফাইন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং। সূত্র বলছে, বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৬ শতাংশ খেলাপি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. এমকে মুজেরী বুধবার যুগান্তরকে বলেন-ব্যাংক, এনবিএফআই, শেয়ারবাজার এবং বিমাসহ আর্থিক খাতের সবই এখন আস্থার সংকটে। এসব খাতে মানুষ টাকা রাখতে ভয় পায়। ব্যাংকগুলোতে লুটপাট এবং ব্যাপক জালজালিয়াতি হয়েছে। ফলে কোনো কোনো ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ৮০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এর ফলে কয়েকটি ব্যাংক ছাড়া বাকিগুলোর অবস্থা খারাপ। এখানে মানুষ টাকা রাখতে সাহস পান না। এটি অর্থনীতির জন্য ভালো সংকেত নয়। তিনি বলেন, চিহ্নিত কিছু গোষ্ঠী ব্যাংক থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তারাই আবার ব্যাংকের মালিক। আবার ব্যাংক থেকে টাকা লুটের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থারও যোগসাজশ রয়েছে। তিনি বলেন-এনবিএফআইর অবস্থা আরও খারাপ। একই অবস্থা শেয়ারবাজার এবং বিমা খাতে। ফলে সামগ্রিকভাবে পুরো আর্থিক খাতের ওপর বড় ধরনের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এই আস্থার সংকট দূর করতে হলে দুটি করণীয় রয়েছে। প্রথমত, জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, তারা যেসব অর্থ লুট করেছে, তা আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
শেয়ারবাজার : শিল্পায়নে দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি সংগ্রহের অন্যতম মাধ্যম শেয়ারবাজার। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরাও শেয়ারবাজারের মাধ্যমে কোম্পানির অংশীদার হওয়ার সুযোগ পান। কিন্তু দীর্ঘদিন বাংলাদেশের শেয়ারবাজার বিকলাঙ্গ। এখানে বিনিয়োগ করলে পুঁজি হারিয়ে যায়। একদিকে বেশির ভাগ তালিকাভুক্ত কোম্পানি ভালো লভ্যাংশ দেয় না, অপরদিকে কারসাজির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের পুঁজি হাতিয়ে নেওয়া হয়। এতে দেশের পুঁজিবাজার আতঙ্কের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে লাখ লাখ বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজার ছাড়ছে। ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে শেয়ার সংরক্ষণকারী কোম্পানি সিডিবিএলের তথ্য অনুসারে, ২০১৬ সালের মে মাসে দেশে বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল ৩২ লাখ ৭ হাজার। মঙ্গলবার পর্যন্ত তা ১৬ লাখ ৬৩ হাজারে নেমে এসেছে। ৩৯৬টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের মধ্যে অর্ধেকের বেশি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দর কমছে প্রতিদিন। ক্রেতার অভাবে অনেক মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ার লেনদেন করা যাচ্ছে না। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা গত কয়েক মাসে রেকর্ড পরিমাণ শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে তাদের টাকা সরিয়ে নিয়েছেন। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা বলছেন, শেয়ারবাজারে আসা মানেই এখন পুঁজি হারানো। এছাড়াও বিনিয়োগের জন্য ভালো কোম্পানি একেবারে হাতেগোনা কয়েকটি মাত্র। ফলে পুঁজি দুর্বৃত্তদের অভয়ারণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিএসইসির মুখপাত্র মো. আবুল কালাম যুগান্তরকে বলেন, শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের আস্থা উদ্ধারে কমিশন কাজ করছে। বাজার নিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। অপরাধ সঠিকভাবে চিহ্নিত করার জন্য কয়েকটি কোম্পানির বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই সব কমিটি ইতোমধ্যে রিপোর্ট জমা দিয়েছে। রিপোর্টের আলোকে বেশকিছু কোম্পানি ও ব্যক্তিকে শাস্তিও দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, দেড় বছরে ১ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭শ কোটি টাকার বেশি জরিমানা করা হয়েছে কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের (ম্যানিপুলেটর)। এছাড়াও গত দেড় বছরে আইপিও, মিউচুয়াল ফান্ড, করপোরেট গভর্ন্যান্স রুলসহ সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বেশ আইনকানুন পরিবর্তন হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল পাবে।
বিমা খাত : মানুষের জীবনে ঝুঁকি মোকাবিলা এবং বিনিয়োগের অন্যতম খাত বিমা। বিশ্বব্যাপী বিমা খাতের আওতা বিশাল। কিন্তু বাংলাদেশে বিমা খাত অভিশপ্ত। সবচেয়ে করুণ চিত্র বিরাজ করছে দেশের বিমা খাতে। জীবনবিমা ও সাধারণ বিমা-উভয় খাতের গ্রাহক তাদের পাওনা টাকা ফেরত পেতে হাহাকার করছেন। বিশেষ করে জীবনবিমা খাতে বিনিয়োগ করলে মেয়াদ শেষে টাকা ফেরত পাওয়া যায় না। বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) তথ্য অনুসারে, এ খাতে গ্রাহকের পাওনা ৭ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে জীবনবিমা খাতেই প্রায় ৩ হাজার ৯ কোটি টাকা বকেয়া। দেশের ৮২টি বিমা কোম্পানির মধ্যে অন্তত ৩০-৩৫টির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। বিশেষ করে ফারইস্ট ইসলামী, পদ্মা লাইফ এবং সানফ্লাওয়ার লাইফসহ আরও কিছু বড় কোম্পানিতে গ্রাহকদের টাকা বছরের পর বছর আটকে আছে। মেয়াদ শেষ হওয়ার ২-৩ বছর পরও টাকার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে। এতে পুরো খাতের ওপর মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
সমবায় : দেশের ক্ষুদ্র সঞ্চয়ীদের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় সমবায় খাত। আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্যবিমোচনে সমবায় খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কৃষি, মৎস্য, দুগ্ধ উৎপাদন এবং আবাসন মিলিয়ে এক সময় প্রায় ৩ কোটি মানুষ এ খাতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিল। কিন্তু নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে খাতটির অস্তিত্ব হুমকিতে। দুর্নীতি, সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব রয়েছে এবং রাজনৈতিক প্রভাব সবচেয়ে বড় সমস্যা। এছাড়াও পুঁজির অভাব ও সামগ্রিক কাঠামো অকার্যকর। সমবায় খাতে ঋণের তথ্য সুনির্দিষ্টভাবে পাওয়া যায়নি। তবে দেশে বর্তমানে ক্ষুদ্রঋণের পরিমাণ ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। এর উল্লেখযোগ্য অংশ সমবায়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কিন্তু দুর্নীতি-অনিয়মের কারণে খাতের আওতা ছোট হয়ে আসছে। মানুষ এ খাতের ওপর আস্থা রাখছে না।