Image description

ওমানের মুলাদ্দাহ শহরে চলন্ত গাড়ির ভেতর আটকে পড়েন চার ভাই। নিঃশ্বাসটুকু বাঁচিয়ে রাখার প্রাণপণ লড়াই করছিলেন। নিজ গ্রামের এক প্রবাসী চাচাতো ভাইয়ের কাছে প্রাণ রক্ষার আর্তি জানিয়ে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠান, ‘আমরা খুবই অসুস্থ। গাড়ি থেকে বের হতে পারছি না।’

১০ মিনিটের মধ্যেই চার ভাইকে একে একে কল করতে থাকেন ওই প্রবাসী। না, আর কোনো সাড়া নেই। শেষ খবরে জানা গেল, চার ভাই দুনিয়ায় যাত্রা শেষ করেছেন।

গত মঙ্গলবার ওমানের সময় রাত সাড়ে ৮টার দিকে এ বার্তা পান দেশটির বারকা শহরে বসবাসরত পারভেজ। আর তার কাছ থেকেই জানতে পারেন চট্টগ্রাম সমিতি ওমানের সভাপতি মো. ইয়াসিন চৌধুরী।

মৃত্যুর শিকার চার ভাই হলেন- মুহাম্মদ রাশেদ, মুহাম্মদ সাহেদ, মুহাম্মদ সিরাজ ও মুহাম্মদ শহিদ।

স্বজনরা জানিয়েছেন, চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের বন্দারাজার পাড়ার প্রয়াত আব্দুল মজিদের পাঁচ ছেলে। চারজন ওমানে থাকতেন। মুহাম্মদ এনাম শুধু দেশে থাকেন। তিন ভাই বিবাহিত।

ওমানে থাকা সিরাজ ও শহিদ অবিবাহিত। তাদের বিয়ের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছিল। এজন্য আগামীকাল শুক্রবার দুই ভাইয়ের দেশে ফেরার কথা ছিল। চার ভাই মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিয়ের বাজার করতে বের হয়েছিলেন। ওমানের বারকা থেকে মুলাদ্দাহ এলাকায় গিয়ে তারা এই করুণ পরিণতির শিকার হন।

ঘটনার বিষয়ে ওমান প্রবাসী ইয়াসিন চৌধুরী জানান, চার ভাইয়ের মধ্যে দুই ভাই একই শহরে থাকতেন। কাজের সূত্রে আর দুই ভাই ভিন্ন ভিন্ন শহরে থাকতেন। তাদের আজ বৃহস্পতিবার রাতে দেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার কথা ছিল। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বারকায় চার ভাই একত্রিত হন। তারা বিয়ের বাজার করছিলেন। সন্ধ্যা ৭টার পর রওনা দেন মুলাদ্দাহের উদ্দেশ্যে।

‘রাত ৮টা ২৬ মিনিটে তাদের একই পাড়ার চাচাতো ভাই পারভেজ একটি ভয়েস মেসেজ পায়। এক ভাই মেসেজে জানায়, তারা চারজন অসুস্থ হয়ে গাড়ির ভেতরে আটকে আছেন। বারকায় থাকা পারভেজ ১০ মিনিটের মধ্যেই কল করেন। কিন্তু আর সাড়া-শব্দ পাওয়া যায়নি’, যোগ করেন ইয়াসিন চৌধুরী।

চার ভাইকে বহনকারী গাড়িটি চালু অবস্থায় মুলাদ্দাহে একটি কাঁচা রাস্তায় আটকে ছিল বলে জানান ইয়াসিন, ‘মুলাদ্দাহে আমাদের একজন বাংলাদেশি ডাক্তার আছেন, নোমান সাহেব। উনার ক্লিনিকের সামনে দিয়ে গলির ভেতরে কাঁচা রাস্তায় গাড়িটি ছিল। আমাদের ধারণা, তারা অসুস্থ হয়ে পড়ার পর ওই ক্লিনিকে যাবার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু গাড়ি থেকে বের হতে পারেননি।’

রাত দেড়টার দিকে দুই প্রবাসী বাংলাদেশি গাড়ির ভেতরে তাদের নিথর অবস্থায় দেখেন জানিয়ে ইয়াসিন বলছিলেন, ‘এদের একজন মুলাদ্দাহে একটি গ্রোসারি শপে, আরেকজন অটো ইলেকট্রিক শপে চাকরি করেন। তারা দোকান বন্ধ করে ডাস্টবিনে ময়লা ফেলতে গিয়েছিলেন। তখন গাড়িটি স্টার্ট অবস্থায় দাঁড়ানো দেখে তাদের কৌতূহল জাগে। দুজন উঁকি দিয়ে দেখেন, সামনের সিটে দুজন ও পেছনের সিটে দুজন ঘাড় এলিয়ে দিয়ে পড়ে আছেন। অনেক ডাকাডাকির পরও সাড়া না পেয়ে দরজা খোলার চেষ্টা করল। দরজা খুলতে না পেরে তারা পুলিশকে খবর দেয়।’

ইয়াসিন জানায়, রাত ২টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। গাড়ির দরজা খুলে চারজনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে। মুলাদ্দাহ শহরের একটি হাসপাতালে তাদের লাশ রাখা হয়েছে। ময়নাতদন্ত করা হবে। আমাদের সমিতির একটি প্রতিনিধি দল সার্বক্ষণিক সেখানে আছে।

‘গাড়ির ভেতর এসির গ্যাসে আক্রান্ত হতে পারেন। খাদ্যে বিষক্রিয়াও হতে পারে। এটা ময়নাতদন্ত করল বোঝা যাবে। ওমানের পুলিশ এটা সিরিয়াসলি নিয়েছে’, মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে জানান ইয়াসিন চৌধুরী।

চার ভাইয়ের মৃত্যুতে রাঙ্গুনিয়ার ওই গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দলে দলে লোকজন তাদের বাড়ির সামনে ভিড় করছেন। নিহতদের স্বজন ও গ্রামবাসী চার ভাইয়ের মৃত্যুকে নিছক দুর্ঘটনা বলে মনে করছেন না। বাংলাদেশ ও ওমান সরকারের কাছে তারা এই মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন।

এদিকে, সত্তরোর্ধ মাকে এখনও চার ছেলের মৃত্যুর বিষয়টি জানানো হয়নি। ভাই এনামসহ পরিবারের লোকজনও সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলছেন না।

রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাজমুল হাসান জানান, ঘটনা শোনার পর তিনি ওই বাড়িতে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরিবারের পক্ষ থেকে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। বৃদ্ধা মা বিষয়টি জেনে যেতে পারেন, এই আশঙ্কায় তারা কাউকে আপাতত তাদের ঘরে যেতে দিচ্ছেন না।