Image description

ইশতিয়াক ইমন

বৈশাখের তপ্ততা ছাপিয়ে আকাশ আঁধার করে বৃষ্টি নেমেছিল। নচিকেতাকে শুনতে তখন বেশ লাগে। তবে এবার আর রোমান্টিক সাজেস্ট করে নি ইউটিউবের অ্যালগোরিদম। বেজে উঠল — নিলামে উঠছে দেশ, কালক্ষণ, জীবন বাঁচতে চাওয়াটা বিলাসিতা। হুরমুর হুরমুর করে মেঘ যেন সড়ককে ঠান্ডা জলে ভিজিয়ে, মনকে প্রশান্ত করে আরেকটা অশান্তির মৃত্যুকে ডেকে আনবে।

মানুষ আশায় বাঁচতে চায়। আমি কি তরুণ হয়ে সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে হতাশ হতে পারি? সুইডেন বোধ হয় সেই আশার দীপ আগেই জ্বালিয়ে আমাদের বলেছে — এসো তোমরাও আলোর মিছিলে। আগে তবে গল্পটা শুনাই।

সালটা ১৯৯০। সুইডেন আর নেদারল্যান্ড একই সময়ে একই ধারণায় পৌঁছায়। তারা গবেষণা করে দেখে, মানুষ ভুল করবেই — তাই ব্যবস্থাকে এমন বানাও যেন একটি ভুল মৃত্যুর কারণ না হয়। ১৯৯৭ সালে সুইডেন এটিকে ভিশন জিরো আইন নামে সংসদে পাশ করে। একই সময়ে নেদারল্যান্ড তার নাম দেয় সাসটেইনেবল সেফটি। পরে দুটিকে এক করে সেইফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি মেলে।

পাঁচটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে এই অ্যাপ্রোচ। নিরাপদ সড়ক ও পরিবেশ — রাস্তার ডিজাইনই যেন দুর্ঘটনা ঠেকায়, মিডিয়ান, রাম্বল স্ট্রিপ, স্পষ্ট লেন। নিরাপদ গতি — এলাকাভেদে বাস্তবসম্মত গতিসীমা, আবাসিক এলাকায় ৩০ কিমি, মহাসড়কে ১০০ কিমি। নিরাপদ যানবাহন — এয়ারব্যাগ, সিটবেল্ট, এবিএস ব্রেক। নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী — প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স ব্যবস্থা। আর সবশেষে দুর্ঘটনা-পরবর্তী যত্ন — দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স ও কাছে ট্রমা সেন্টার।

ফলাফল? সুইডেনে ১৯৯০ সালে বার্ষিক মৃত্যু ছিল ৭৭৩, এখন তা নেমে এসেছে প্রায় ২০০-তে — কমেছে ৭৫ শতাংশ। নেদারল্যান্ডসে ১,৩৭৬ থেকে ৬০০, নরওয়েতে ৩৩৩ থেকে ১০০। ২০০৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই অ্যাপ্রোচকে বৈশ্বিক স্বীকৃতি দেয়।

এবার আসি আমাদের দেশ কোথায়। বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ১৭ থেকে ২০ জন মানুষ সড়কে প্রাণ হারায়। নিরাপদ সড়ক চাই-এর হিসাবে ২০২৩ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৭,৯০২ জনের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রোড সেফটি রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি লক্ষ জনে সড়কে মৃত্যুহার ১৫.৩, যেখানে সুইডেনে মাত্র ২.২। শুধু সংখ্যার তুলনা নয়, এর পেছনে দুই দেশের দর্শনের বিস্তর ফারাক — সুইডেন মনে করে প্রতিটি মৃত্যুই প্রতিরোধযোগ্য, আর আমরা এখনও ভাবি দুর্ঘটনা হয়েই থাকে।

২০১৮ সালে দুজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলনের ফলে সড়ক পরিবহন আইন পাশ হয়। বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে মৃত্যু ঘটালে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু শুধু শাস্তি দিয়ে মৃত্যু ঠেকানো যায় না। বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, ৮০ শতাংশ দুর্ঘটনাই ঘটে মানবিক ভুলে — কিন্তু সেই ভুলকে প্রশ্রয় দেয় ত্রুটিপূর্ণ সড়ক, অপ্রশিক্ষিত চালক আর অকার্যকর তদারকি। সমস্যাটা শুধু চালকের নয়, পুরো ব্যবস্থার।

এখানে একটি কথা কেউ তেমন বলে না — দুর্ঘটনায় যারা বেঁচে ফেরে, তারাও ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যায়। শরীরের ক্ষত সারে, কিন্তু মনের ক্ষত সহজে সারে না। পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার বা পিটিএসডি সড়ক দুর্ঘটনার পর অত্যন্ত সাধারণ একটি মানসিক প্রতিক্রিয়া। ঘুমের মধ্যে দুর্ঘটনার দৃশ্য ফিরে আসা, রাস্তায় বের হতে ভয় পাওয়া, অকারণ উদ্বেগ — এসব উপসর্গ বছরের পর বছর একজন মানুষকে ভেতর থেকে ভেঙে দিতে পারে। একজন মানুষ শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেই দায় শেষ হয় না, মানসিকভাবেও তাকে পুনর্গঠিত করতে হয়।

আধুনিক সড়ক নিরাপত্তা আইনে ট্রমা সেন্টারগুলোতে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করতে হবে। দুর্ঘটনার পর প্রাথমিক শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি সাইকোলজিক্যাল ফার্স্ট এইড দেওয়া দরকার — যেখানে প্রশিক্ষিত মনোবিদ রোগীর সঙ্গে কথা বলবেন, ভয় ও বিভ্রান্তি কমাবেন এবং পরিবারকে বোঝাবেন কীভাবে আক্রান্ত মানুষটির পাশে থাকতে হয়। ট্রমা রিকভারি কোনো বিলাসিতা নয়, এটি পুনর্বাসনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বিদ্যমান আইনে আরেকটি বড় সমস্যা হলো পুলিশি জটিলতা। দুর্ঘটনার পর আহতকে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই থানায় জিডি, জামিনের ঝামেলা আর গাড়ি আটকের ভয়ে পথচারীরা অনেক সময় আহতকে রাস্তায় ফেলে চলে যায়। সেই বিলম্বই অনেক সময় জীবন কেড়ে নেয়। এই বাস্তবতা বদলাতে গুড স্যামারিটান আইনের বিধান দরকার, যেখানে স্বেচ্ছায় উদ্ধারকারীকে যেকোনো আইনি ঝামেলা থেকে পূর্ণ সুরক্ষা দেওয়া হবে। ভারত ২০১৬ সালে এই আইন চালু করেছে, ফলে উদ্ধার বেড়েছে এবং মৃত্যু কমেছে। আমাদের নতুন আইনে এই ধারা যোগ না হলে তা কখনো জনবান্ধব হবে না।

এই পরিবর্তন কে আনবে? তরুণরাই পারে। ২০১৮ সালে তারা রাস্তায় নেমে আইন বদলে দিয়েছিল। এখন শুধু রাস্তায় নামলেই হবে না, নীতিনির্ধারণের টেবিলেও বসতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, মনোবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থীরা মিলে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে গবেষণা করতে পারে। স্বেচ্ছাসেবীরা দুর্ঘটনাস্থলে প্রাথমিক সহায়তার প্রশিক্ষণ নিতে পারে। সচেতনতার ক্যাম্পেইন শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় নয়, বাস টার্মিনালে, লঞ্চঘাটে, চালকদের বিশ্রামাগারে পৌঁছাতে হবে।

বৃষ্টি থামলে সড়কের উপর আবার রোদ পড়বে। কিন্তু সড়কে যে জীবনগুলো ঝরে যাচ্ছে, তারা আর ফেরে না। ভিশন জিরোর মূল কথাটা সহজ — কোনো মানুষের জীবন সড়কে যাতায়াতের মূল্য হতে পারে না। শরীর বাঁচানোর পাশাপাশি মন বাঁচানোর ব্যবস্থা করতে হবে, আইনকে জনবান্ধব করতে হবে, তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে। এই দর্শনটুকু যেদিন আমাদের নীতিনির্ধারকদের বুকে গেঁথে যাবে, সেদিন হয়তো আইনের কাগজ থেকে নিরাপত্তা সত্যিকারের সড়কে নামবে। ততদিন নচিকেতার গান বাজতেই থাকবে — জীবন বাঁচতে চাওয়াটা বিলাসিতা।

লেখক: সাধারণ সদস্য, বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশন

ঢাকা টাইমস