Image description

রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে পাঁচ মাস বয়সী যমজ সন্তান নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এক দম্পতি। তাদের মধ্যে স্বামী মো. কামরুজ্জামানের কোলে একজনের নিথর দেহ, পাশে হামে অসুস্থ অপর সন্তান নিয়ে দাঁড়িয়ে স্ত্রী জান্নাতি বেগম।

জানা গেছে, পাঁচ মাস আগে একই হাসপাতালেই জন্ম হয়েছিল দুই শিশুর। জন্মের পর নানা জটিলতায় ১৫ দিন নবজাতকদের বিশেষ পরিচর্যাকেন্দ্রে থাকতে হয়েছিল তাদের। সেই সময়ই চিকিৎসা ব্যয় সামলাতে হিমশিম খেতে হয়েছিল পরিবারটিকে।

সম্প্রতি হাম ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলে রাইসা ও রুমাইসাকে ফরিদপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। টানা নয় দিন সেখানে চিকিৎসা চলে। কিন্তু রাইসার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকলে চিকিৎসকেরা তিন দিন আগেই পিআইসিইউ সুবিধা রয়েছে এমন হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন।

কিন্তু অর্থ সংকটই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় বাধা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে জান্নাতি বেগম বলেন, ‘টাকার জন্য আসতে পারিনি। টাকা জোগাড় করে আসার পর মেয়েটাই মারা গেল।’

বাবা কামরুজ্জামান জানান, সকালে দুই মেয়েকে নিয়ে ফরিদপুর থেকে ঢাকায় আসেন তারা। কিন্তু বেলা ১১টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় রাইসা।

হাসপাতালের মৃত্যুসনদে হাম-পরবর্তী জটিলতাকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্সে মরদেহ নিতে যাতে কোনো ঝামেলা না হয়, সেজন্য হাসপাতাল থেকে দেওয়া আরেকটি কাগজে লিখে দেওয়া হয়েছে, এটি কোনো ‘পুলিশ কেস’ নয়। হাম-পরবর্তী জটিলতায় মৃত্যু হয়েছে।

মেয়ের মরদেহ নিয়ে বাড়ি ফেরার পথও সহজ নয় তাদের জন্য। অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া বাবদ লাগবে পাঁচ হাজার টাকার বেশি। কামরুজ্জামান টুকটাক কাজ করে সংসার চালান। তিনি বলেন, জন্মের সময় কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। এরপর হাম ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে শুধু চিকিৎসার পেছনেই টাকা যাচ্ছে।

পরিবারটির সঙ্গে ঢাকা মেডিকেলে এসেছিলেন দুই শিশুর নানি, দাদিসহ স্বজনেরা। সঙ্গে থাকা ব্যাগে তখনও দুই শিশুর কৌটার দুধ, কাপড় ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। সুস্থ করে সন্তানদের বাড়ি ফিরিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন নিয়েই তারা এসেছিলেন রাজধানীতে।

চিকিৎসকরা বলছেন, দেশে সাম্প্রতিক সময়ে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে জেলা ও বিভাগীয় হাসপাতালগুলোতে শিশুদের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র বা পিআইসিইউ না থাকায় জটিল রোগীদের ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু রাজধানীর হাসপাতালগুলোতেও রয়েছে তীব্র শয্যা সংকট।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, হাসপাতালে মাত্র ১৭টি পিআইসিইউ শয্যা রয়েছে, যা নিজস্ব রোগীদের জন্যই পর্যাপ্ত নয়। ফলে বাইরে থেকে আসা রোগীদের অনেক ক্ষেত্রেই অন্য হাসপাতালে পাঠাতে হচ্ছে।

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত না হওয়া, চিকিৎসা অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং ব্যয়বহুল স্বাস্থ্যব্যবস্থার চাপ মিলিয়ে সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো। আর সেই বাস্তবতার নির্মম উদাহরণ হয়ে রইল ছোট্ট রাইসার মৃত্যু।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো