বাংলাদেশে সাংবাদিকতা পেশা বেআইনি। কিন্তু কেন। আইন কি এক্ষেত্রে অন্তরায়? এর জবাব খুঁজেছেন নূরুল কবির। সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক এক টকশোতে এই তথ্য হাজির করেছেন। বাংলাভিশনে মতিউর রহমান চৌধুরীর উপস্থাপনায় জনপ্রিয় টক শো ‘ফ্রন্ট লাইন’-এ নূরুল কবীর সরাসরি বলেছেন, আমরা যে সাংবাদিকতা করছি তা প্রতিদিনই আইন ভঙ্গ করে করতে হচ্ছে। কারণ আইন বৈধভাবে সাংবাদিকতা করতে দেয় না। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ ধারায় বলা আছে, নাগরিকের বাক এবং ব্যক্তি স্বাধীনতা থাকবে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা থাকবে। চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা থাকবে।
আপনার চিন্তা এবং বিবেকের স্বাধীনতা যদি থাকে তাহলে আপনি ঘরে বসে চিন্তা করতে পারেন। এখানে রাষ্ট্র তো আর দেখবে না। পুলিশ এসে দেখবে না। কিংবা দিলীয় কর্মী এসেও দেখবে না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিবেকপ্রসূত চিন্তা প্রকাশের ক্ষেত্রে কি বিধি নিষেধ আছে? সংবিধানের ৩৯ ধারা অনুযায়ী কিছু বিধি নিষেধ আরোপিত হয়েছে। এর সাপেক্ষে এই স্বাধীনতা থাকার কথা বলা হয়েছে। বিধি নিষেধে কী আছে। এরও জবাব দিয়েছেন নূরুল কবীর। তিনি বলেন, অরাজকতা তৈরি করা যাবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়- এমন কিছু লেখা যাবে না। এক হাতে আপনি অধিকারটা দিলেন, আরেক হাতে তুলে নিয়ে গেলেন। তর্কের খাতিরে যদি ইসরাইলের প্রসঙ্গ আসে তাহলে আমরা কী দেখতে পাই।
দেশটির সঙ্গে তো আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। যদি থাকতো আপনি কি ভালো সম্পর্ক রাখতেন তাদের সঙ্গে ? ইরানে তারা যা করছে, লেবাননে অথবা প্যালেস্টাইনে যা করছে ! অথবা ধরুন, ভারতের সঙ্গে যে সম্পর্ক। তারা প্রতিদিন আমাদের দেশের নাগরিককে হত্যা করছে। তার সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেএটা ভেবে লেখা যাবে না। এতে কী দাঁড়ালো? বৈধভাবে আপনি সত্য কথা বলতে পারছেন না যদি সংবিধানের এই অনুচ্ছেদ মানেন। প্রথম কথা হলো- সাংবিধানিক। দুই, আমাদের নিশ্চয় মনে থাকার কথা- যারা মন্ত্রী হন তারা দুটো শপথ নেন। একটা হচ্ছে, রাষ্ট্র ও সংবিধানের প্রতি তার আনুগত্য। আরেকটি গোপনীয়তার শপথ। প্রয়োজন ছাড়া মন্ত্রী এ নিয়ে কাউকে কিছু বলতে পারবেন না। ধরা যাক, পাবলিক ইনফরমেশনের সোর্স হচ্ছে মন্ত্রিপরিষদ। তারাই সিদ্ধান্ত নেয়। গোপনীয়তা আইন ১৯২৩ সালে, এটা করেছিল বৃটিশরা। পাকিস্তান আমল হয়ে দুই দুইটা স্বাধীনতা হয়ে গেল। বাংলাদেশ ৫৪ বছর পার করলো।
কিন্তু এই আইন এখনও বহাল। এই আইনে অনেক কথাবার্তা আছে। রাষ্ট্রীয় বা সরকারি কোনো তথ্য শত্রুর হাতে পড়তে পারে, যাতে দেশের ক্ষতি হয় এমন কোনো কিছু প্রকাশ করা যাবে না। ফ্রি ফ্লো অব পাবলিক ইনফরমেশন ছাড়া কি সাংবাদিকতা হয়? আমরা যে সরকারের সিদ্ধান্তগুলো খুঁজে খুঁজে বের করি এবং ছাপাই তা কি চলমান আইনসম্মত! পত্র-পত্রিকার যে ডিক্লারেশন ডিসি সাহেবরা দেন তাতে মুদ্রাকর ও প্রকাশকের একটা অঙ্গীকারনামা থাকে। ১৯৭৩ সালের প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন অ্যাক্ট এখনও বহাল। এর বিরুদ্ধে এদেশের মানুষ বহুবার লড়াই করেছে। কিন্তু এত সরকার এলো-গেল, কোনো পরিবর্তন নেই। এই অঙ্গীকারনামায় বলা আছে সরকারে স্বার্থের পরিপন্থী কোনো কিছু লেখা যাবে না।
নেক ক্ষেত্রে সরকারি স্বার্থ এবং জনস্বার্থ সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু আমরা লিখি এবং তা প্রকাশ করি। সরকারও পরিবর্তন হয় আমরা লিখি বা ছাপাই বলে । দুর্ভাগ্য হচ্ছে, এসবের পরও বলতে হয়, বাংলাদেশে সাংবাদিকতা আসলেই একটা অবৈধ পেশা। কিন্তু এতসবের পরেও আমি সাংবাদিকতাকে বৈধ পেশা হিসেবেই দেখতে চাই। প্রত্যকটা অবৈধ আইন বাতিল করা প্রয়োজন। দেশের ইজ্জতের জন্য, শুধু আমাদের কাজের পরিবেশের জন্য নয়।
নূরুল কবীরকে তখন জিজ্ঞেস করা হয়, দেশে ঢালাওভাবে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে খুনের মামলা হয় সেটাকে কীভাবে আপনি ব্যাখ্যা করবেন। জবাবে আলোচিত এই সম্পাদক বলেন, ঠিক এই মুহূর্তে এটা জাজ্বল্যমান একটি সমস্যা। এ কথা সত্য যে, আওয়ামী লীগের আমলে দলীয় সাংবাদিকতা একটা অশ্লীল মাত্রায় পৌঁছেছিল। সেই দলীয় সাংবাদিকতায় অনেকেই নিজের সাংবাদিক স্বত্বাকে অসম্মানিত করেছেন নানা কিসিমের দালালির মাধ্যমে। দালালি করা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে- এখন পর্যন্ত এমন আইন নেই বাংলাদেশে। এই দালালি সাংবাদিকতাকে মানুষ সম্মান করে না।
এরা ক্ষমতাবান হয়েছিল। ক্ষমতা অপব্যবহারও করেছিল। সেই সরকারের পতনের পর অনেক সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়। আমরা জানি, সেই সরকার মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে সহস্রাধিক তরুণ-তরুণী, বৃদ্ধকে হত্যা করে। প্রায় বিশ হাজার মানুষকে পঙ্গু করে দেয়। অথচ সেই সরকারকেই সাংবাদিকরা নীতিগতভাবে সমর্থন দেন। তবে তারা কেউ গুলি করেছেন -এমনটা আমার জানা নেই। মানুষ ওই সাংবাদিকদের সম্মান করে না- এটা একটা বড় শাস্তি। অন্তর্বর্তী সরকার বা বর্তমান নির্বাচিত সরকারের তরফে বলা হ
তাদের পর্যাপ্ত আইনগত সুবিধাও দেয়া হচ্ছে না। পরিবারের পক্ষ থেকে এমন অভিযোগই করা হচ্ছে। ‘২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের চেতনা পরিপন্থী কাজ করা হচ্ছে। যদি অন্যায়ভাবে তাদেরকে কারাগারে রাখা হয় তা অবিচার হিসেবেই বিবেচিত হবে। আবারও বলছি, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তার বিচার হোক। আশা করি, সরকার এগুলো ঠান্ডা মাথায় বিবেচনা করবে।