Image description

আমার মা একসময় পেনশন তুলতে যেতেন সরকারি অফিসে। সঙ্গে আমিও যেতাম। যতটুকু মনে পড়ে টাকা তুলতে দুইটি চার টাকার স্ট্যাম্প লাগত। কিন্তু সেই স্ট্যাম্প সেখানে প্রতিটি কিনতে হতো দশ টাকা দিয়ে। আমি আগেই কিনে নিয়ে যেতাম। তবে অনেকেই সেখান থেকে কিনত।  

অর্থাৎ নিয়মের আড়ালে ছয় টাকার একটি অনিয়ম যেন নীরবে স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। টাকার অঙ্ক হয়তো খুব বড় ছিল না, কিন্তু এই ধরনের ছোট ছোট অনিয়মই আসলে একটি বড় দুর্নীতিগ্রস্ত সংস্কৃতির অংশ। প্রতিদিন হাজারো মানুষ যদি এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়, তাহলে সেটি আর ছোট ঘটনা থাকে না।

এখন পরিস্থিতি বদলেছে। মায়ের পেনশনের টাকা সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে চলে আসে। ফলে স্ট্যাম্প কেনা, বাড়তি টাকা দেওয়া কিংবা কাউকে ‘ম্যানেজ’ করার প্রয়োজন পড়ে না। প্রযুক্তি এখানে শুধু একটি প্রক্রিয়াকে সহজ করেনি; এটি অনিয়মের একটি পথও বন্ধ করে দিয়েছে।

আসলে প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো- এটি মানুষের হাতে থাকা অস্বচ্ছ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। যেখানে মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, দর-কষাকষি বা গোপনীয়তার সুযোগ কমে, সেখানে দুর্নীতি ও অনিয়মও কমে আসে।

ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাই এর বড় উদাহরণ। বাংলাদেশে অনেক সময় দেখা যায়, সড়কে আইন ভাঙার পর চালক ও ট্রাফিক পুলিশের মধ্যে 'দর-কষাকষি’ শুরু হয়। সরকারি জরিমানার বদলে কম টাকায় ‘মামলা মিটিয়ে' নেওয়ার প্রবণতা বহু পুরোনো। এতে সরকার রাজস্ব হারায়, আর আইনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাও কমে যায়। কিন্তু এআইচালিত ট্রাফিক ক্যামেরা এই পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। ক্যামেরা যদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নম্বরপ্লেট শনাক্ত করে আইনভঙ্গের তথ্য সংরক্ষণ করে এবং সরাসরি জরিমানা পাঠায়, তাহলে সেখানে ব্যক্তিগত দর-কষাকষির সুযোগ কমে যাবে।

চীন, সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ের মতো শহরে এই ধরনের প্রযুক্তি এরই মধ্যে কার্যকরভাবে ব্যবহার হচ্ছে। বাংলাদেশেও বড় শহরগুলোতে এটি বিস্তৃতভাবে চালু করা গেলে ট্রাফিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়বে।

সরকারি অফিসগুলোতেও প্রযুক্তি বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এখনো জন্মনিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স, ট্যাক্স ফাইলিং বা বিভিন্ন অনুমোদনের জন্য মানুষকে অফিসে যেতে হয়। আর মানুষ যত বেশি কাউন্টারের সামনে দাঁড়াবে, অনিয়মের সুযোগও তত বাড়বে।

অনেক সময় ফাইল আটকে রাখা হয়, অযথা ঘোরানো হয় কিংবা ‘চা-নাস্তার টাকা’ চাওয়া হয়। এস্তোনিয়া বিশ্বের সবচেয়ে ডিজিটাল রাষ্ট্রগুলোর একটি। সেখানে নাগরিকেরা ঘরে বসেই ভোট দেওয়া থেকে শুরু করে ট্যাক্স ফাইল পর্যন্ত করতে পারেন। ফলে দালাল বা ফাইলবন্দি দুর্নীতির সুযোগ অনেক কমেছে। বাংলাদেশেও যদি জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে সরকারি সেবাগুলো সমন্বিত করা যায় এবং প্রতিটি আবেদন ডিজিটালি ট্র্যাক করা হয়, তাহলে কোন কর্মকর্তা কতদিন ফাইল আটকে রেখেছেন, সেটিও সহজে দেখা যাবে। এতে জবাবদিহি বাড়বে।

বাংলাদেশে জমি নিয়ে প্রতারণা ও মামলা দীর্ঘদিনের সমস্যা। নকল দলিল তৈরি, একই জমি একাধিক মানুষের কাছে বিক্রি বা রেকর্ড গায়েব হয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটে। ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্জিয়ার মতো কয়েকটি দেশ ভূমি রেকর্ড ডিজিটালাইজেশনে বড় অগ্রগতি করেছে। কিছু ক্ষেত্রে ব্লকচেইন প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে একবার তথ্য সংরক্ষণ হলে সেটি গোপনে পরিবর্তন করা কঠিন। বাংলাদেশে প্রতিটি জমির ডিজিটাল ম্যাপ, মালিকানা ইতিহাস ও অনলাইন যাচাই ব্যবস্থা চালু করা গেলে ভূমি অফিসের দুর্নীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে। সাধারণ মানুষ ঘরে বসেই জমির তথ্য যাচাই করতে পারবে।

সরকারি টেন্ডার বা প্রকল্প বাস্তবায়নেও প্রযুক্তি বড় ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক সময় অভিযোগ ওঠে, নির্দিষ্ট গোষ্ঠী টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে বা অতিরিক্ত দামে কাজ দেওয়া হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার ‘কোনেপস’ নামের ই-প্রকিউরমেন্ট সিস্টেম বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। সেখানে সরকারি কেনাকাটার পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে হয় এবং কোন কোম্পানি কত দামে কাজ পেল, সেই তথ্যও উন্মুক্ত থাকে। বাংলাদেশে ই-জিপি চালু হলেও সেটিকে আরও কার্যকর ও সহজলভ্য করা সম্ভব। বড় প্রকল্পগুলোর ব্যয়, অগ্রগতি ও চুক্তির তথ্য যদি রিয়েল-টাইমে জনগণের সামনে প্রকাশ করা হয়, তাহলে অনিয়ম গোপন রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

স্বাস্থ্যখাতেও প্রযুক্তি দুর্নীতি কমাতে সাহায্য করতে পারে। সরকারি হাসপাতালে দালালচক্র, ওষুধ চুরি বা ভুয়া রিপোর্ট নিয়ে অভিযোগ নতুন নয়। রুয়ান্ডা ও ভারতের কিছু অঞ্চলে ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা চালু করে রোগীর তথ্য ও ওষুধ সরবরাহ কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও অনলাইন সিরিয়াল, ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন ও হাসপাতালের ওষুধের স্টক ট্র্যাকিং চালু করা গেলে দুর্নীতি অনেক কমানো সম্ভব। এমনকি এআই ব্যবহার করে অস্বাভাবিক ওষুধ ব্যবহার বা ভুয়া বিল শনাক্ত করাও সম্ভব হতে পারে।

শিক্ষাক্ষেত্রেও প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। প্রশ্নফাঁস, ভর্তি বাণিজ্য ও নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অনেক দেশে এনক্রিপটেড ডিজিটাল প্রশ্নপত্র ও কম্পিউটারাইজড প্রশ্নব্যাংক ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে যদি প্রশ্নপত্র নির্দিষ্ট সময়ের আগে খোলা না যায় এমন ডিজিটাল সিস্টেম চালু করা হয়, তাহলে প্রশ্নফাঁস কমতে পারে। একইভাবে শিক্ষক নিয়োগ ও সরকারি চাকরির পরীক্ষায় ডিজিটাল মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করলে পক্ষপাত ও অনিয়ম কমবে।

আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাতেও প্রযুক্তি বড় পরিবর্তন আনতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে পুলিশের বডি ক্যামেরা ব্যবহার বাড়ছে। এতে পুলিশ ও নাগরিক- দুই পক্ষের আচরণই রেকর্ড হয়। বাংলাদেশেও ট্রাফিক পুলিশ ও মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বডি ক্যামেরা এরই মধ্যে লাগানো শুরু হয়েছে। এটি শতভাগ দেওয়া গেলে ঘুষ, হয়রানি ও অযৌক্তিক বলপ্রয়োগের অভিযোগ কমতে পারে। কারণ সবাই জানবে, পুরো ঘটনাই রেকর্ড হচ্ছে।

অর্থনৈতিক লেনদেনেও ডিজিটাল প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যেখানে নগদ অর্থ বেশি, সেখানে অস্বচ্ছতার ঝুঁকিও বেশি। সুইডেন প্রায় ক্যাশলেস সমাজের দিকে চলে গেছে। অধিকাংশ লেনদেন ডিজিটাল হওয়ায় কর ফাঁকি ও অবৈধ লেনদেন শনাক্ত করা সহজ হয়েছে। বাংলাদেশেও মোবাইল ব্যাংকিং জনপ্রিয় হয়েছে। সরকারি সেবা, গণপরিবহন, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল পেমেন্ট আরও বাধ্যতামূলক করা গেলে অনিয়ম কমবে।

স্মার্ট সিটি প্রযুক্তিও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর হতে পারে। লন্ডন, সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ের মতো শহরে বিপুল সংখ্যক সিসিটিভি ক্যামেরা ও এআই অ্যানালিটিকস ব্যবহার করা হয়। সন্দেহজনক আচরণ বা অপরাধীর গতিবিধি দ্রুত শনাক্ত করা যায়। বাংলাদেশে বাজার, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সমন্বিত সিসিটিভি নেটওয়ার্ক তৈরি করা গেলে অপরাধ তদন্ত সহজ হবে এবং অপরাধীরাও জানবে যে তারা নজরদারির মধ্যে আছে।

তবে প্রযুক্তি নিজে কোনো জাদুকরী সমাধান নয়। প্রযুক্তির অপব্যবহারও হতে পারে। ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস, নজরদারির অপব্যবহার বা সাইবার অপরাধ নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন শক্তিশালী ডেটা সুরক্ষা আইন, সাইবার নিরাপত্তা এবং জবাবদিহিমূলক নীতিমালা। সবচেয়ে বড় দরকার নিজেদের দেশের বিশাল ডেটা সেন্টার।

তারপরও বাস্তবতা হলো, প্রযুক্তি মানুষের হাতে থাকা অস্বচ্ছ ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। প্রতিটি কাজের ডিজিটাল রেকর্ড রাখা গেলে অনিয়ম গোপন করা কঠিন হয়ে যায়। আমার মায়ের পেনশনের স্ট্যাম্পে অতিরিক্ত ছয় টাকা নেওয়ার ঘটনাটি হয়তো ছোট ছিল, কিন্তু সেই ছোট ঘটনাই দেখিয়ে দেয়- প্রযুক্তি চাইলে কীভাবে প্রতিদিনের জীবনে দুর্নীতির অসংখ্য দরজা ধীরে ধীরে বন্ধ করে দিতে পারে।