কুমিল্লার ভাষা সৈনিক অজিত গুহ কলেজে ব্যাপকহারে অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে আওয়ামী লীগ আমলে। কলেজটির অধ্যক্ষ শরিফুল ইসলামের নেতৃত্বেই হয়েছে এসব অনিয়ম। ইতিপূর্বে অডিটে তা ধরাও পড়েছে। গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পরে কলেজটিতে নতুন গভর্নিং বডি (পরিচালনা পর্ষদ) গঠিত হয়। গভর্নিং বডির সভাপতি হন শিক্ষানুরাগী, জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী নাজিয়া হক। তারপর থেকে অধ্যক্ষ শরিফুলের দুর্নীতি-অপকর্মের ধারা অনেকটাই ব্যাহত হচ্ছিল। সভাপতি নাজিয়া হক নিজে উদ্যোগী হয়ে সম্প্রতি ডিআইএ- কে দিয়ে নতুন করে অডিটের ব্যবস্থা করেন। এতে আবারও অধ্যক্ষের দুর্নীতি প্রমাণিত হয়। সুযোগ খুঁজছিলেন অধ্যক্ষ, কীভাবে সভাপতি পদ থেকে নাজিয়া হককে সরিয়ে দেওয়া যায়। অবশেষে এই সুযোগ এসে যায় শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সাম্প্রতিক কুমিল্লা সফরের সময়। এসএসসি পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে কুমিল্লায় কেন্দ্র সচিবদের সঙ্গে পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি ছিল মন্ত্রীর। অধ্যক্ষ শরিফুল ইসলাম শিক্ষামন্ত্রীর এক সহকারীর সঙ্গে আগে থেকেই যোগাযোগ ও শলাপরামর্শ করে রাখেন কলেজ সভাপতিকে সরানোর। সেই অনুযায়ী প্রেক্ষাপট তৈরির পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
কুমিল্লার পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি শেষে বিকেলের দিকে মন্ত্রীকে নেওয়া হয় অজিত গুহ কলেজে সারপ্রাইজ ভিজিটে। মন্ত্রীর সঙ্গে অধ্যক্ষের আলাদা কথাও হয়। এরপরে মন্ত্রী সবার সামনে এসে কলেজ সভাপতি পদ থেকে কাজী নাজিয়া হককে সরিয়ে দেওয়ার কথা বলেন। যদিও গভর্নিং বডির সভাপতি হিসেবে তার মেয়াদ আছে আগামী বছরের জুলাই পর্যন্ত এবং যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ ছাড়া এভাবে গভর্নিং থেকে কাউকে সরিয়ে দেওয়ার নিয়ম নেই। মন্ত্রীর এমন কথায় উপস্থিত সবাই অবাক হন, অধ্যক্ষ শরিফুল ও তার অপকর্মের দু’একজন সহযোগী ছাড়া। অধ্যক্ষ শরিফুল এবং দুর্নীতির সহযোগীরা অত্যন্ত তৎপর হয়ে উঠেন। স্থানীয় এমপির ডিও লেটারের ব্যবস্থা করেন। পরবর্তীতে ঢাকায় যোগাযোগ করে মন্ত্রীকে দিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ফোন করান। মন্ত্রীর ফোনে কোনো কারণ ছাড়াই সভাপতি পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী নাজিয়া হককে। তার জায়গায় বসানো হয় আওয়ামীপন্থি সাহারিয়ার আক্তার।
ডিআইএ’র অডিটে অধ্যক্ষের দুর্নীতি হাতেনাতে ধরা পড়ে
অধ্যক্ষ শরিফুল ইসলাম অনেক বছর ধরে কলেজটিতে দুর্নীতি-অপকর্ম করে আসছিলেন। আর্থিক অনিয়মের পাশাপাশি তিনি কলেজের জমিও গোপনে বিক্রি করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কাজী নাজিয়া হকের সঙ্গে অধ্যক্ষ মোহাম্মদ শরিফুল ইসলামের দূরত্ব তৈরি হয় একটি অডিট রিপোর্টকে ঘিরে। অডিট রিপোর্টে প্রায় ১৮ লাখ টাকা আত্মসাতের তথ্য বেরিয়ে আসে। এ ঘটনায় সরাসরি দায়ী করা হয় অধ্যক্ষ শরিফুলকে। এছাড়া কলেজের নিজস্ব জমি কমে যাওয়ার বিষয়টি সর্বত্র আলোচনায় আছে। ২০০২ সালের অডিটে কলেজের জমি এক একরের বেশি (১.০৪৫৪ একর) ছিল। ২০২২ সালের অডিটে দেখা যায়, জমি কমে গিয়ে হয়েছে ০.২৫৩ একর অর্থাৎ চার ভাগের তিন ভাগই হাতছাড়া হয়ে গেছে। হারানো জমি সাবেক উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদারের ভাই সাবেক অধ্যক্ষ হাসান ইমাম মজুমদার এবং বর্তমান অধ্যক্ষ শরিফুল ইসলাম দুজন মিলে গোপনে বিক্রি করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৬ সালের অডিটে নগদ ১৮ লাখ টাকা আত্মসাত এবং জমি আত্মসাতের ঘটনা হাতেনাতে প্রমাণিত হয়। শরিফুল ইসলাম সভাপতি নাজিয়া হককে ৫ লাখ টাকায় সমস্ত অডিট রিপোর্ট ঘুরিয়ে দেওয়ার একটি বোঝাপড়ার কথা জানান। তবে নাজিয়া হক এমন কোনো উদ্যোগে স্বাক্ষর করার প্রস্তাব নাকচ করায় শরিফুল ইসলাম ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। এরপর থেকে নাজিয়া হককে সরাতে তৎপর হয়ে উঠেন অধ্যক্ষ শরিফুল ইসলাম।
যেভাবে মহিলা দলের সাংগঠনিক সম্পাদকের পরিবর্তে আওয়ামীপন্থিকে বসানো হলো
গণঅভ্যুত্থানের পরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন এই কলেজের গভর্নিং বডির নতুন এডহক কমিটি গঠিত হয় ২০২৪ সালের অক্টোবরে। কমিটির সভাপতি হন কাজী নাজিয়া হক। প্রথমে তিন মাস সময়ের জন্য কমিটি হলেও পরে আরো তিন মাস বাড়ানো হয়। ২০২৫ সালের আগস্টে কাজী নাজিয়া হককে সভাপতি করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হয়। সভাপতি হিসেবে কাজী নাজিয়া হক ৬ আগস্ট ২০২৫ কাজ শুরু করেন। তার কমিটির মেয়াদ ছিল ২ বছর অর্থাৎ ২ জুলাই ২০২৭ পর্যন্ত। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো। গত ১৫ এপ্রিল তাকে ওই পদ থেকে অপসারণ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এই প্রজ্ঞাপনটি জারি হয়েছে শিক্ষমন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের একটি ফোনের পরিপ্রেক্ষিতে।
ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গত ৪ এপ্রিল শিক্ষামন্ত্রীর হঠাৎ কলেজ পরিদর্শন। কলেজ পরিদর্শন মন্ত্রীর এ দিনের কর্মসূচিতে ছিল না। কুমিল্লায় শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে সভার পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি ছিল। সেই অনুযায়ী তিনি কুমিল্লায় ঢুকেই শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে যান। এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র সচিবদের সঙ্গে আলোচনা সভায় যোগ দেন। আলোচনা সভা শেষ করে শিক্ষামন্ত্রী চলে যান সার্কিট হাউজে। সার্কিট হাউজে জেলা প্রশাসকসহ জেলার গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে শিক্ষামন্ত্রী ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন। তার গাড়িবহর শাসনগাছায় ঢাকা-কুমিল্লা ফ্লাইওভারে পোঁছালে কলেজ অধ্যক্ষ শরিফুল ইসলাম ফোন করে মন্ত্রীকে কলেজে আনার ব্যবস্থা করেন। শাসনগাছা থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে অজিত গুহ কলেজে আসেন শিক্ষামন্ত্রী। অধ্যক্ষকে এই কাজে সহায়তা করেন মন্ত্রীর সহকারী। প্রায় এক ঘণ্টা শিক্ষামন্ত্রী সেখানে থাকেন। এসময়ই নাজিয়াকে গভর্নিং বডির সভাপতি পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। এর পরের কাজগুলো অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে হয়।
স্থানীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন অধ্যক্ষ শরিফুল ইসলাম। মনিরুল হক চৌধুরীও এই সুযোগে নিজের ভাতিজী সাহারিয়ার আক্তারকে সভাপতি পদে বসানোর শর্তে ডিও লেটার দিতে রাজি হন। মনিরুল হক চৌধুরীর ডিও লেটার নিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দেন অধ্যক্ষ শরিফুল। কিন্তু যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ ছাড়া এভাবে সভাপতিকে সরিয়ে দিতে রাজি হচ্ছিল না বিশ্ববিদ্যালয়। গভর্নিং বডি ভাঙা বা কোনো সদস্যকে সরানোর পদক্ষেপে মন্ত্রীর হস্তক্ষেপের কথা নয়, যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ থাকলে তা জাতীয় বিশ^বিদ্যালয় নিজেরাই ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। কিন্তু অজিত গুহ কলেজের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন ছিলেন অতিতৎপর। তিনি নিজে ১৩ এপ্রিল জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ে ফোন করে নাজিয়া হককে সরিয়ে সাহারিয়ার আক্তারকে বসানোর নির্দেশ দেন।
জানা গেছে, নতুন সভাপতি সাহারিয়ার আক্তার ছাত্রজীবনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল শাখার ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি ছিলেন এবং ব্যক্তিগতভাবে আওয়ামী ঘরানার রাজনীতির অনুসারী হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে নাজিয়া হক ছাত্রদলের রাজনীতিতে কলেজ জীবন থেকেই ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর রোকেয়া হল ছাত্রদলের কমিটিতে সদস্য ছিলেন। বর্তমানে নাজিয়া হক জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (কুমিল্লা অঞ্চলের দায়িত্বে) পদে আছেন।
শীর্ষনিউজ