Image description

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক যেখানে অনেকটা অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল, নির্বাচিত সরকারের সময়ে তা এখন পারস্পরিক নির্ভরতার দিকে মোড় নিচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিল্লি সফর, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এক বিমানে যাত্রা, সীমান্তে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা, বৈশ্বিক সংকটে জ্বালানি সহযোগিতা এবং সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিবের আশ্বাস, সব মিলিয়ে ইতিবাচক মনোভাবের ইঙ্গিত দেখছেন বিশ্লেষকরা।

তাদের মতে, বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্কের ‘বৃহস্পতি’ যেহেতু তুঙ্গে, তাই বহুল আলোচিত আদানির উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ চুক্তিটি ন্যায্যতার ভিত্তিতে সংশোধনের এখনই উপযুক্ত সময়। যদিও আদানি চুক্তির বিষয়টি বর্তমানে সিঙ্গাপুরের আদালতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে, পাশাপাশি বাংলাদেশে আদানির বিদ্যুৎ আমদানিও অব্যাহত রয়েছে।

 

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ২৫ বছর মেয়াদি চুক্তির বেশ কিছু প্রশ্নবিদ্ধ বিষয়ের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বিদ্যুতের উচ্চমূল্য। চুক্তি অনুযায়ী আদানির বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের দাম নির্ধারিত হয়েছে ১৪ থেকে ১৮ টাকা।

অথচ একই ধরনের কয়লাভিত্তিক অন্য দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র পায়রা ও রামপাল থেকে পিডিবি প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনছে যথাক্রমে ৮ থেকে ১০ এবং ৯ থেকে ১১ টাকায়। ফলে আদানির বাড়তি দামের কারণে বছরে বাংলাদেশের প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে।
আবার বিদ্যুৎকেন্দ্র সচল থাকুক বা না থাকুক, বিশাল অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে চুক্তি অনুযায়ী আগামী ২৫ বছরে এই প্রকল্পে বাংলাদেশকে শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবেই প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার দিতে হবে।

 

আদানি পাওয়ার মূলত ২০২৪ সালের শেষভাগ এবং ২০২৫ সালের শুরুর দিকে বকেয়া পাওনা আদায়ের জন্য আন্তর্জাতিক সালিশি প্রক্রিয়ার হুমকি দিতে শুরু করে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে সিঙ্গাপুর ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টারে (এসআইএসি) যাওয়ার প্রক্রিয়া তারা জোরদার করে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর সময়ে। ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর বাংলাদেশে হাইকোর্ট সিঙ্গাপুরে আদানির সালিশি কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ দেন। আদেশে বলা হয়, আদালত-নিযুক্ত কমিটি চুক্তির ওপর প্রতিবেদন জমা না দেওয়া পর্যন্ত এই স্থগিতাদেশ বহাল থাকবে।

এরপর ২০২৬ সালের ২০ জানুয়ারি জাতীয় রিভিউ কমিটি চুক্তিতে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদন জমা দেয়। ২০২৬ সালের ২ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনার ঘোষণা দেয়। এরপর সিঙ্গাপুরে কয়লার দাম ও ট্যারিফ নিয়ে আইনি লড়াই পরিচালনার জন্য যুক্তরাজ্যভিত্তিক আইন সংস্থা ‘থ্রি-ভিবি’-কে নিয়োগ দেয় সরকার।

তবে আইনি লড়াই দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল হতে পারে। তাই জনস্বার্থে এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার আদানির সঙ্গে সরাসরি বসে ‘অস্বাভাবিক’ দাম কমানো এবং চুক্তি সংশোধনের পথ খোলা রেখেছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

এবার দেখা যাক, ভারত থেকে কী পরিমাণ বিদ্যুৎ আসছে এবং তার কত অংশ আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক মাসে ভারত থেকে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ ঘাটতি রয়েছে, তা মোকাবিলায় এই আমদানি বড় ভূমিকা রাখছে। এর মধ্যে আদানির বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকেই প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার ৪৫০ থেকে ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে।

এ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গ থেকে ভেড়ামারা হাই ভোল্টেজ ডাইরেক্ট কারেন্ট (এইচভিডিসি) স্টেশনের মাধ্যমে ১ হাজার মেগাওয়াট এবং ত্রিপুরার পালাটানা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রায় ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার, যা পিক আওয়ারে ১৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি পৌঁছে যায়, একটি বড় অংশ এখন ভারত থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। আর আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র একাই বাংলাদেশের মোট চাহিদার প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশ পূরণ করছে।

প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের জুন মাসে ৪৩৭ মিলিয়ন ডলার পরিশোধের পর সরকার বড় কোনো অর্থ পরিশোধ না করে প্রতি মাসে আংশিক বিল, প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি, পরিশোধ করছে। বর্তমানে প্রায় সাড়ে চারশ মিলিয়ন ডলার বকেয়া থাকলেও দুর্নীতির তদন্ত ও চুক্তি পর্যালোচনা চলায় সরকার পূর্ণ অর্থ পরিশোধ আপাতত স্থগিত রেখেছে।

এ প্রসঙ্গে জ্বালানি বিশ্লেষক ড. শামসুল আরেফিন বলেন, বাতিল নয়, প্রয়োজন দুই পক্ষের ভারসাম্যপূর্ণ সংশোধন। একদিকে আদানি তাদের কয়লার দাম কমিয়ে ট্যারিফ হ্রাস করবে, অন্যদিকে বাংলাদেশ বকেয়া ৮৫০ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত রাখবে। পাশাপাশি চুক্তির ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ সংক্রান্ত শর্ত বাদ দিয়ে একটি টেকসই ও ন্যায্য চুক্তি তৈরি করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, সিঙ্গাপুরে ব্যয়বহুল আইনি লড়াইয়ের বদলে উভয় পক্ষ নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে গোড্ডা প্ল্যান্টের বিদ্যুৎ নিয়ে সমঝোতায় আসতে পারে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ফজলুল হালিম রানা বলেন, আদানির বিদ্যুৎ চুক্তি যদি এতটাই অপ্রয়োজনীয় হতো, তবে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার সেটি বাতিল করত। আমার মনে হয়, বিদ্যমান চুক্তি থেকে বাংলাদেশ কীভাবে আরও বেশি লাভবান হতে পারে, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেসব চুক্তি সম্পাদিত হবে, সেগুলোর ন্যায্যতা দরকষাকষির মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।

সাবেক এক কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এ মুহূর্তে আদানি কিংবা অন্য কোনো চুক্তি বাতিল হলে আন্তর্জাতিকভাবে একটি নেতিবাচক বার্তা যাবে। ভবিষ্যতে বিদেশি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগে অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। সুতরাং কোনো চুক্তিতে যদি সুনির্দিষ্ট অসংগতি থাকে, তবে তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হতে পারে।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে যে শীতলতা তৈরি হয়েছিল, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেখানে উষ্ণতার ছোঁয়া লেগেছে। পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। বাণিজ্যিক ও চিকিৎসা ভিসাও চালু হচ্ছে। সুতরাং চুক্তির বিষয়ে আলোচনা ও পুনঃআলোচনার জন্য এখনই উপযুক্ত সময়।

সম্প্রতি ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি দেশটিতে সফররত বাংলাদেশের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে বলেছেন, দেড় বছরে স্থবির হয়ে পড়া সম্পর্কে গতি আনতে কাজ করছে ভারত। এক্ষেত্রে তিনি যে বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, সেগুলো হলো—দুই দেশের সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তিতে; পারস্পরিক স্বার্থে দুই দেশের সংবেদনশীলতাকে বিবেচনায় নেওয়া হবে; কোনো ব্যক্তির ইস্যু দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলবে না; এবং সবকিছুর মূলে থাকবে দুই প্রতিবেশী দেশের জনগণ।

দীর্ঘদিন জ্বালানি খাত নিয়ে কাজ করা সিনিয়র সাংবাদিক সদরুল হাসান বলেন, আদানি চুক্তির অসংগতি নিয়ে আমি বেশ কিছু প্রতিবেদন করেছি। কিন্তু তারপরও বলব, এই চুক্তি বাতিল করা কোনোভাবেই ঠিক হবে না; বরং অসংগতি দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে।

তবে বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে সরকারের জন্য কতটা চ্যালেঞ্জিং এবং ভারতের সঙ্গে চুক্তি বহাল রাখলে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দলগুলোর কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিরোধী দলগুলোর ‘অ্যান্টি-ইন্ডিয়ান সেন্টিমেন্ট’ নিয়ে রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত করার সম্ভাবনা থাকে। সে ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে নিয়েই চুক্তি সংস্কার করা যেতে পারে। অর্থাৎ ভারতের সঙ্গে যেকোনো বিষয়ে সমাধানের ক্ষেত্রে সর্বদলীয় কমিটি গঠন করা হলে সরকারকে এককভাবে দোষারোপ করার সুযোগ থাকবে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সম্পর্ক বর্তমানে বেশ গভীর ও বহুমাত্রিক। কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্কে এখন ‘বসন্ত’ চলছে বলা যায়। তাদের মতে, বর্তমানে ভারত বাংলাদেশের প্রতি যতটা নমনীয় ও উদার নীতি অনুসরণ করছে, ভবিষ্যতে তা নাও থাকতে পারে। তাই সময়ক্ষেপণ করলে ভারতের কৌশল বদলে যেতে পারে। তখন আওয়ামী লীগ আমলে করা বিভিন্ন চুক্তির অসম শর্তের বেড়াজাল দেশের অর্থনীতির জন্য দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত হয়ে থাকবে।