Image description

পুরান ঢাকার একটি কমিউনিটি সেন্টারে বৈদ্যুতিক কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই পৌনে এক কোটি টাকার বিল অনুমোদন দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। আড়াই বছর আগে সংস্থাটির বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নূর মোহাম্মদ এই অনুমোদন দেন। তবে এত দিনেও কাজ শেষ হয়নি। এতে বিপাকে পড়েছেন ভবন নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত অন্য ঠিকাদাররা।

 

ডিএসসিসির নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে ‘মির্জা আবু তালিব (শায়েস্তা খাঁন) কমিউনিটি সেন্টার’ নির্মাণের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ছয়তলা ভবনটির কাজ তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভাগ করে বাস্তবায়ন করছে। কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালের ১৭ জানুয়ারি।

 

নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই ২০২৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর এক কোটি ৮৭ লাখ টাকার মধ্যে ৬৯ শতাংশ ভৌত অগ্রগতি দেখিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে মোট এক কোটি ৪১ লাখ টাকার বিল পরিশোধ করা হয়। এর মধ্যে বৈদ্যুতিক কাজের ৭৪ লাখ ৪৯ হাজার টাকার বিল পরিশোধ করা হলেও বিদ্যুতের কোনো কাজই হয়নি। তখন প্রকল্পের সামগ্রিক অগ্রগতি দেখানো হয়েছিল ৫৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ।

 

বিল অনুমোদনের আগে ওই বছরের ২২ জুন নির্বাহী প্রকৌশলী নূর মোহাম্মদ এবং সহকারী প্রকৌশলী মো. বজলুর রহমান কাজ পরিদর্শন করে গুণগতমান সন্তোষজনক বলে উল্লেখ করেন। এরপর নূর মোহাম্মদ শিডিউল স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কাজ হচ্ছে উল্লেখ করে বিল পরিশোধের সনদ দেন। সেই সনদের ভিত্তিতে বৈদ্যুতিক কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম/এস শিউলি বিল্ডার্সকে বিল পরিশোধ করা হয়।

 

বিলে ৫৯ কাজ, সরেজমিনে মিলল শুধু পাইপ

পরিশোধিত বিলের বিবরণে ৫৯ ধরনের কাজ সন্তোষজনকভাবে সম্পন্ন বলে দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পিভিসি কনসিলড কন্ডুইট ওয়ারিং, ফ্যান পয়েন্ট, ওয়ান-টু-থ্রি গ্যাং সুইচ, ছয় অ্যাম্পিয়ার পিন সকেট কম্বাইন্ড, ডিস্ট্রিবিউশন মিটার, কপার বাসবার, সার্কিট ব্রেকার, এলইডি স্পট লাইট, গেট লাইট, ওয়াল ফ্যান, আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবল, আর্থিং সিস্টেম, মোটর ড্রাইভেন ফায়ার পাম্প, জকি পাম্প ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাসহ আরও নানা সরঞ্জাম স্থাপন।

 

গত বৃহস্পতিবার (৭ মে) সরেজমিন পরিদর্শনে পাওয়া গেছে ভিন্ন চিত্র। অগ্নিনির্বাপণের জন্য শুধু কিছু পাইপ স্থাপন করা হয়েছে। বাকি কোনো কাজ সম্পন্ন হয়নি। এক সপ্তাহ আগে একটি মোটর ড্রাইভেন ফায়ার পাম্প আনা হলেও স্থাপন করা হয়নি। নিচতলার একটি কক্ষে কিছু মালপত্র তালাবদ্ধ অবস্থায় রাখা আছে। সেই মালপত্রের পাহারায় কোনো প্রহরীও রাখা হয়নি।

 

করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, তালাবদ্ধ কক্ষে রয়েছে একটি জকি পাম্প, মোটর ড্রাইভেন কন্ট্রোলার, স্টিল কেবিনেটের মালপত্র, প্রেশার রিলিজিং বাল্ব, অটো এয়ার ভেন্ট পাইপ এবং ফায়ার এক্সটিঙ্গুইশার।

 

বিপাকে অন্য ঠিকাদাররা

বৈদ্যুতিক কাজ না হওয়ায় ভবনের অভ্যন্তরীণ কাজ শুরু করতে পারছেন না অন্য ঠিকাদাররা। চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ তলার নির্মাণকাজের দায়িত্ব পেয়েছে সোনার বাংলা এন্টারপ্রাইজ। প্রতিষ্ঠানটির সাইট ইঞ্জিনিয়ার নাইমুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের ভবন নির্মাণ শেষ, বুধবার রাতে ষষ্ঠ তলার ওপরে ছাদের রুমের ঢালাই হয়েছে। টাইলস স্থাপনও শেষ। এখন ইন্টেরিয়রের কাজ শুরু হবে। তবে বৈদ্যুতিক কাজ শেষ না হলে এ কাজ শুরু করা যাচ্ছে না।’

 

একই প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সিফাত ও প্রহরী মাহবুবের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৫ আগস্টের পর তাদের নির্মাণকাজ কিছুদিন বন্ধ ছিল। পরে পূর্ণ গতিতে কাজ শুরু হয়। এ সময়ের মধ্যে তারা ভবনে কোনো বৈদ্যুতিক কাজ চলতে দেখেননি। তবে ৪-৫ দিন শিউলি বিল্ডার্সের লোকজন এসেছিল। সপ্তাহখানেক আগে ফায়ার পাম্প আনা হয়। মাস দেড়েক আগে কিছু মালপত্র এনে একটি কক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়।

 

অর্থবছরকে অজুহাত করছেন প্রকৌশলী

নির্বাহী প্রকৌশলী নূর মোহাম্মদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, অনেক সময় অর্থবছর শেষে প্রকল্পের অর্থ যেন ফেরত না যায় তাই অতিরিক্ত বিল দেওয়া হয়। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। এটি প্রকল্প পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতনরা জানতেন। তবে বিল দেওয়ার পরও কেন কাজ বাস্তবায়ন হয়নি তা খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে।’

 

বাংলাদেশে অর্থবছর চলে জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত। বিলটি দেওয়া হয়েছিল ডিসেম্বরে, অর্থাৎ অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে। প্রতিবেদক বিষয়টি উল্লেখ করলে এর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি নূর মোহাম্মদ।

 

রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাও রয়েছে ডিএসসিসির এই নির্বাহী প্রকৌশলীর। তিনি ডুয়েট ছাত্রলীগ অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের (ডুয়েকা) অর্থ সম্পাদক এবং বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের প্যানেল সদস্য।

 

যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা

বিষয়টি নিয়ে এমএস শিউলি বিল্ডার্সের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রকল্প পরিচালক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. মোহাম্মদ সফিউল্লাহ সিদ্দিক ভুঁইয়ার মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

 

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে। এমনটি হলে নিয়ম অনুযায়ী দায়ী প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।