সময় তখন রবিবার (১০ মে) সকাল সোয়া ১০ টা। গাজীপুরের কাপাসিয়ার রাউৎকোনা গ্রামে বাংলা ট্রিবিউনের এই প্রতিবেদক। অপরিচিত এই মানুষটিকে দেখেই গ্রামের ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ হযরত আলী জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বাবা আপনি কি সাংবাদিক?’ জবাবে এই প্রতিবেদক বলেন, ‘জি চাচা আমি সাংবাদিক।’ ওই বৃদ্ধ বলেন, ‘চাচা আজ কেন আসছেন? গতকাল তো অনেক সাংবাদিক ও পুলিশ আসছিল। তারা সব নিয়ে গেছে। আজকে আপনি কি নিবেন।’
রাউৎকোনা গ্রামের প্রবাসী মনির হোসেনের বাড়ির পাশেই হযরত আলীর বাড়ি। মনির হোসেনের বাড়ির দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছিলেন এই বৃদ্ধ। কী দেখেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘মেয়েরা সবসময় বাবার ভক্ত থাকে। একজন বাবা তার দেড় বছরের শিশুসহ তিন মেয়েকে কীভাবে হত্যা করলো, এটাই ভাবতেছি। আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না বাবা এমন কাজ করতে পারে। সুষ্ঠু তদন্ত করলেই মেয়েদেরকে হত্যার সঠিক কারণ বেরিয়ে আসবে।’
হযরত আলী আরও বলেন, ‘আমারও নাতি আছে। বাড়িতে গিয়ে নাতিদের দিকে তাকালেই এ ঘটনার কথা মনে পড়ে।’ এ সময় চোখ দিয়ে পানি ছেড়ে দেন এই বৃদ্ধ। পরে বলেন, ‘আল্লাহ যেন তাদের সবাইকে জান্নাতবাসী করেন এবং ঘাতকের সঠিক বিচার হোক।’
প্রবাসী মনির হোসেনের বাড়ির বারান্দার স্টিলের গেইটে তালা দেওয়া রয়েছে। দক্ষিণ পাশের জানালার একদিকের গ্লাস খোলা। সেখানে হ্যাঙ্গারে একটি শার্ট ঝুলানো রয়েছে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখা যায় রান্না ঘরে চিপসের প্যাকেট পরে আছে। পশ্চিম পাশের বারান্দার জানাল দিয়ে দেখা যায়, বেড রুমে ছোট মেয়ের লাল-হলুদ রঙের রিকশা, পড়ার টেবিলের ওপর লাল রঙের জগ, ফ্লোরে লেপ বিছানো রয়েছে।
এই বাড়িতেই হত্যা করা হয়েছিল একই পরিবারের পাঁচজনকে। তারা হলেন- গোপালগঞ্জ সদরের পাইককান্দি গ্রামের শাহাদাত হোসেন মোল্লার মেয়ে শারমিন খানম (৩০), নাতনি মীম খানম (১৫), উম্মে হাবিবা (৮), ফারিয়া (দেড় বছর) ও ছেলে রসুল মিয়া (২৩)। এই ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছেন শারমিনের স্বামী ফোরকান।
প্রতিবেশীরা কেউ শারমিনকে কখনও বাড়ির বাইরে তেমন দেখেননি। তিনি পরকীয়া করতে পারেন এ কথাও তারা বিশ্বাস করতে চান না।
বাড়ির মালিক প্রবাসী মনির হোসেনের স্ত্রী বলেন, “আমি আপনাদের (সাংবাদিকদের) সঙ্গে কোনও কথা বলতে পারবো না। রাত ৩টা পর্যন্ত পুলিশ সিআইডি, পিবিআই এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন আমার বক্তব্য নিয়েছে। হত্যাকাণ্ডের কথা মনে হলেই আমার গা শিউরে উঠে। শনিবার সকাল থেকে কিছুই গলা দিয়ে নামতে (খেতে পারি না) চায় না। আমার শরীর অনেক দুর্বল, আমি অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। এখন খাওয়ার চেষ্টা করবো।”
হযরত আলীর মতো বাড়িটি দেখতে আসেন কারিমা আক্তার, আছমা আক্তার, রাহিমা, রাজমিস্ত্রি হাবিজুল ইসলাম এবং নিহত শারমিনের বড় মেয়ে মিম খানমের মাদ্রাসার শিক্ষার্থী সাব্বির হাসান। তারা বলেন, শারমিনের দোষ বা ভুল করে থাকলে তাকে ছেড়ে (ডিভোর্স) দিতো। কিন্তু তার মেয়ে এবং শ্যালকের কি দোষ ছিল? বাবা হয়ে মেয়েদেরকে এভাবে হত্যা করতে পারে না।
নৃশংস এ ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক রয়েছে এখনও। কেউ ভয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে পরিচয় দিয়ে কথা বলতে না চাইলেও সবাই এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য এবং হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক বিচার চান।
কাপাসিয়া সদর ইউনিয়ন বানার হাওলা গ্রামের শিক্ষার্থী কারিমা আক্তার (২৫)। মা আছমা আক্তারের (৪২) সঙ্গে রাউৎকোনা গ্রামের মনির হোসেনের বাড়িতে এসেছেন এই তরুণী। কারিমা বলেন, ‘ফেসবুকে দেখে আজকে মায়ের সঙ্গে এ বাড়িতে আসছি। মানুষ তো ভুল করতেই পারে। যদি তার মা ভুল করেই থাকে তাই বলে নিজের বাচ্চাদেরকে এভাবে মারতে পারে। আসলেই কি বাবাই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে? ফেসবুকে দেখেছি তিন মেয়ের মা শারমিন খানমের গলায় চেইন পড়া ছিল, সাজসজ্জা ছিল। তার স্বামীই কি স্ত্রী এবং মেয়েসহ শ্যালকদের হত্যা করেছে? বিশ্বাস হচ্ছে না।’
আছমা আক্তার বলেন, ‘একজন বাবা হয়ে বাচ্চাদেরকে কীভাবে মারে, এটা ভাবতেও খারাপ লাগে। যেহেতু সে নিজে হত্যার কথা স্বীকার করেছে কোনও ধরনের যাচাই না করে ডাইরেক্ট ফাঁসি দেওয়ার দরকার। তার এরকম বিচার হওয়া দরকার যেন দেশবাসী সবাই দেখে। আর যেন কোনও বাবা বা স্বামী এরকম ঘটনা না ঘটায়।’
জামিরারচর গ্রামের রাজমিস্ত্রি হাবিজুল ইসলাম (৩২) বলেন, ‘গতকাল সারাদিন ঢালাইয়ের কাজ করেছি। কাজ শেষে সন্ধ্যায় বাড়িতে গেলে স্ত্রী আমাকে বিষয়টি জানায়। একজন একা এরকম কাজ করতে পারে না। কীভাবে সম্ভব? একজন বাবা হয়ে তার তিন মেয়েকে কীভাবে জবাই করলো?’
রাউৎকোনা কামিল মাদ্রাসার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী উপজেলার পাবুর গ্রামের সাব্বির হাসান (১৬)। এই কিশোর বলেন, ‘আমি শনিবার সকাল ৮টার দিকে বাড়ির পাশ দিয়ে প্রাইভেট পড়তে যাচ্ছিলাম। অনেক লোকজন এবং পুলিশের গাড়ি দেখে ধারনা করেছিলাম সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছে। পরে একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম, এখানে কি কোনও এক্সিডেন্ট হয়েছে? বললো না কোনও এক্সিডেন্ট হয়নি, নতুন বাসায় পাঁচজন লোককে জবাই করে হত্যা করা হয়েছে। তারপর বাড়িতে ঢুকেই দেখি দরজার সামনে তিনটি লাশ রাখা আছে। সেখানে প্রথম লাশটিই হলো মিমের। সে আমাদের মাদ্রাসায় লেখাপড়া করতো এবং আমার এক ক্লাস জুনিয়র।’
পাশের বাড়ির একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমি লোকজনের কাছে শুনেছি শুক্রবার রাতে ফোরকান দীর্ঘক্ষণ বাড়ির পাশের সড়ক দিয়ে হাঁটাহাঁটি করছে এবং মোবাইলে কথা বলেছে। এ সময় তার কোলে ছোট মেয়ে ফারিয়া এবং মেঝো মেয়ে উম্মে হাবিবা ছিল। অনেকেই বলছে ফোরকান শুধু নারীর নেশা না, সকল অবৈধ কাজের সঙ্গে জড়িত ছিল। তবে, তার স্ত্রী বোরকা পরে চলাফেরা করতো। মেয়েদেরকেও বোরকা পরিয়ে রাখতো। ফোরকানের স্ত্রী শারমিন এবং তার মেয়েরা খুবই ভালো। আমরা বিশ্বাস করি না ফোরকানের স্ত্রী পরকীয়া করতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাত ৮টার দিকে ফোরকান বাড়িতে আসে। এ সময় তার প্রাইভেটকার ছাড়াও আরও একটি প্রাইভেটকার আসে। ওই গাড়ি থেকে কয়েকজন লোক নামে। অনেকেই বলেছে ওইদিন তার বাড়িতে মেহমান আসছিল এবং দোকান থেকে পোলাওয়ের চাউল ও কিসমিস কিনেছে।’
মনির হোসেনের বাড়ির ১০ গজ পশ্চিমে মুদি দোকান রয়েছে আব্দুর রশীদের। তিনি বলেন, ‘অবিশ্বাসের মতোই লাগে। বাবা তার সন্তানদেরকে কীভাবে মারে? শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ফোরকানকে সড়ক দিয়ে হাঁটতে দেখেছি। তখন তার কোলে ছোট মেয়ে এবং সঙ্গে মেঝো মেয়েও ছিল।’
আরেক দোকানি সুরমা আক্তার (৩০) বলেন, ‘শুক্রবার রাত ৯টার দিকে ফোরকান ছোট মেয়েকে কোলে নিয়ে দোকানে আসে। এসেই জিজ্ঞাসা করে ভাবি কিসমিস আছে কি? পরে দু’টা চিপস নেয় মেয়ের জন্য। এ সময় তার হাতে কাপড়ের একটা ব্যাগ ছিল। তিন বা সাতদিন পরপর বাড়িতে আসতো। আসলেই ছোট মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে আসতো। সে তার মেয়েকে জবাই করতে পারে বিশ্বাস হচ্ছে না।’
গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) মো. আশফাক বলেন, ‘কাপাসিয়ায় স্ত্রী, তিন মেয়ে ও শ্যালককে হত্যার ঘটনায় নিহত নারীর বাবা শাহাদাত মোল্লা একটি মামলা করেছেন। আমাদের একাধিক টিম ঘটনার রহস্য উদঘাটন এবং আসামিকে গ্রেফতারের জন্য কাজ করছে। আপাতত তদন্তের স্বার্থে আর কিছু বলা যাচ্ছে না।
প্রসঙ্গত, গত ৯ মে সকাল ৬টার দিকে রাউৎকোনা গ্রামের সিঙ্গাপুর প্রবাসী মনির হোসেনের ভাড়া বাসায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ ওই বাসা থেকে এক নারী, তার তিন মেয়ে ও নারীর ভাইয়ের লাশ উদ্ধার করে।