Image description

হামে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এদের সাতজনের মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে, বাকি চারজনের নিশ্চিত হামে। এ নিয়ে হামের উপসর্গ ও হামে ৪০৯ জনের মৃত্যুর খবর দিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু ঠেকাতে সরকার দেশজুড়ে টিকার ক্যাম্পেইন শুরু করেছে। তবে সব শিশু টিকার আওতায় আসছে না। ইউনিসেফের দেওয়া তথ্য পেয়ে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে যাচাই করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। টিকাদান পরিস্থিতি দ্রুত যাচাই পদ্ধতি (আরসিএম) থেকে ইউনিসেফ বলছে, এখনো শহর এলাকায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ এবং গ্রাম এলাকায় ১৫ শতাংশ শিশু টিকা পায়নি।

রাজধানীর কাঁঠালবাগান এলাকায় একটি বাড়িতে ছোট ছোট ঘরে ১৪টি পরিবার বাস করে। নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো এখানে ভাড়া থাকে। পরিবারগুলোতে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী পাঁচটি শিশু আছে। গতকাল রোববার সকালে একজন মা প্রথম আলোকে বলেন, সব বাচ্চা টিকা পেয়েছে। এলাকার খান হাসান আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে এসব শিশু টিকা নিয়েছে।

প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে শিক্ষক ও নাগরিক সমাজের সহায়তা নিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা যেন বাদ পড়া শিশুদের টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করে।
অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

কাঁঠালবাগান ঢাল থেকে হাঁটাপথে কারওয়ান বাজার আসতে সময় লাগে ১০ থেকে ১২ মিনিট। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কারওয়ান বাজার মেট্রোরেল স্টেশনের সিঁড়ির নিচে কথা হয় লামিয়ার সঙ্গে। ময়মনসিংহের একটি গ্রাম থেকে এসে লামিয়া সংসার পেতেছেন রাজধানীর ফুটপাতে, মেট্রোরেল স্টেশনের সিঁড়ির নিচে।

লামিয়ার দুটি সন্তান। একটির বয়স সাত মাস। বড়টির আড়াই বছর। লামিয়া জানালেন, কোনো সন্তানই টিকা পায়নি। হামের টিকা দেওয়া হচ্ছে, এ কথা লামিয়া জানেন না। কোথায় গিয়ে টিকা নিতে হবে, সেই তথ্য তাঁর কাছে নেই।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের (সিডিসি) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজীর আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, টিকার ব্যাপারে প্রচার-প্রচারণার ঘাটতি আছে। মানুষের মধ্যে দ্বিধা আছে। আগে ৯ মাস বয়সীদের টিকা দেওয়া হতো, এখন বয়স কমিয়ে ৬ মাস করা হয়েছে। এতে শিশুর ক্ষতি হবে কি না, তা মায়েদের মধ্যে দ্বিধা তৈরি করতে পারে। এর জন্য দরকার ছিল স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে মায়েদের মুখোমুখি যোগাযোগ। সেটি হয়নি।

৫ এপ্রিল দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় টিকা দেওয়া শুরু হয়। ১২ এপ্রিল ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকা দেওয়া শুরু হয়। ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশের শহরে ও নগরে টিকা দেওয়া শুরু হয়। চলবে ২০ মে পর্যন্ত।

টিকাদান পরিস্থিতি দ্রুত যাচাই পদ্ধতি (আরসিএম) থেকে ইউনিসেফ বলছে, এখনো শহর এলাকায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ এবং গ্রাম এলাকায় ১৫ শতাংশ শিশু টিকা পায়নি।
 

টিকা ক্যাম্পেইনে ১ কোটি ৮০ লাখ ১৬ হাজার ৯১৪ জন শিশুকে টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গতকাল রাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, লক্ষ্যমাত্রার ৯৯ শতাংশ অর্জিত হয়েছে।

টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের সংখ্যা জানার চেষ্টা করা হয় র‍্যাপিড কনভিনিয়েন্ট মনিটরিং (আরসিএম) বা দ্রুত যাচাই পদ্ধতিতে। তাতে দেখা যাচ্ছে, শহরে ও গ্রামে কোনো কোনো শিশু হামের টিকা পায়নি।

গত পরশু বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে হামবিষয়ক একটি গোলটেবিল বৈঠকে ইউনিসেফের টিকা বিভাগের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক রিয়াদ মাহমুদ বলেন, আরসিএম হয়েছে এমন এলাকার মধ্যে শহরে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ এবং গ্রামে ১৫ শতাংশ শিশু টিকা পায়নি।

টিকার ব্যাপারে প্রচার-প্রচারণার ঘাটতি আছে। মানুষের মধ্যে দ্বিধা আছে। আগে ৯ মাস বয়সীদের টিকা দেওয়া হতো, এখন বয়স কমিয়ে ৬ মাস করা হয়েছে। এতে শিশুর ক্ষতি হবে কি না, তা মায়েদের মধ্যে দ্বিধা তৈরি করতে পারে। এর জন্য দরকার ছিল স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে মায়েদের মুখোমুখি যোগাযোগ। সেটি হয়নি।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের (সিডিসি) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজীর আহমেদ

ঢাকা ও ঢাকার বাইরের চিত্র

গতকাল প্রথম আলোর তিনজন প্রতিবেদক রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানার চেষ্টা করেছেন ছয় মাস বয়স থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুরা হামের টিকা পেয়েছে কি পায়নি।

গতকাল সকালে রাজধানীর মিরপুরের ভাষানটেক বস্তি এলাকায় ১২টি পরিবার ঘুরে জানা যায়, পরিবারগুলোর সব শিশু হামের টিকা পেয়েছে। বাসিন্দারা এ–ও জানান যে ব্র্যাকের স্বাস্থ্যকর্মীরা তাঁদের শিশুদের টিকা দিতে সহায়তা করেছেন।

দুপুরে শাহবাগ এলাকায় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা নিতে আসা বেশ কয়েকজন শিশুর মা–বাবার সঙ্গে প্রথম আলোর প্রতিনিধির কথা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা এক বাবার কোলে আড়াই বছরের মেয়ে ছিল। ওই বাবা বলেন, তাঁর মেয়ে ৯ মাস বা ১৫ মাস বয়সে কোনো টিকা পায়নি। এখনো কোনো টিকা পায়নি। কেন টিকা পায়নি, তা বলতে চাননি তিনি।

নরসিংদী থেকে আসা এক দম্পতি জানান, তাঁদের তিন বছরের ছেলের অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো হচ্ছে। তাই তাঁরা হামের টিকা ছেলেকে দেননি। তাঁদের ধারণা, এই সময় টিকা নিলে ছেলের ক্ষতি হতে পারে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা এক বাবার কোলে আড়াই বছরের মেয়ে ছিল। ওই বাবা বলেন, তাঁর মেয়ে ৯ মাস বা ১৫ মাস বয়সে কোনো টিকা পায়নি। এখনো কোনো টিকা পায়নি। কেন টিকা পায়নি, তা বলতে চাননি তিনি।

ফেনী থেকে আসা এক দম্পতি বলেন, তাঁরা বুঝতে পারছেন না, মেয়েকে টিকা দেওয়া উচিত কি না। মেয়ের বয়স ১১ মাস। ৯ মাস বয়সে তাকে টিকা দেওয়া হয়েছে।

রাজধানীর শাহজাহানপুর এলাকার গাজী বস্তিতে হামের টিকা না পাওয়া শিশুর খোঁজ পাওয়া গেছে। সাত মাস বয়সী আয়েশা মনির পাশে বসে বাবা সানোয়ার হোসেন বলেন, মুঠোফোনে কিছু ভিডিও দেখে তিনি টিকার বিষয়ে নিরুৎসাহিত হয়েছেন। তাই মেয়েকে টিকা দেননি।

সুমাইয়া বেগম মনে করেন, টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। সে জন্য নিজের দেড় বছর বয়সী ও চার বছর বয়সী দুই সন্তানকে টিকা দেননি।

এই বস্তিতে প্রথম আলোর প্রতিবেদক ১০টি পরিবারের মা–বাবার সঙ্গে কথা বলেছেন। প্রতিটি পরিবারে ছয় মাস বয়স থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশু আছে। এদের মধ্যে তিনজন শিশু টিকা পেয়েছে, সাতজন পায়নি।

সারা দিন বাইরে বাইরে থাকি। কী জানি কখন টিকা দেয়। বাচ্চাদের হাম হচ্ছে শুনেচি। টিকার কথা তো শুনি নাই।
রূপালী আক্তার

গতকাল বিকেলে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর পদচারী–সেতুর ওপর নাতি নয়নকে নিয়ে ভিক্ষা করেছিলেন লাইলী বেগম। কথা বলে জানা যায়, নয়নের বয়স দুই বছর চার মাস। হামের টিকা সে কখনো পায়নি।

গোলচত্বর পেরিয়ে মিরপুর গার্লস আইডিয়াল স্কুলের সামনে ভ্যানে ফল বিক্রি করছিলেন রূপালী আক্তার। সঙ্গে ছিল তাঁর তিন বছর বয়সী ছেলে তানভীর। এখনো হামের টিকা পায়নি শিশুটি। রূপালী আক্তার বলেন, ‘সারা দিন বাইরে বাইরে থাকি। কী জানি কখন টিকা দেয়। বাচ্চাদের হাম হচ্ছে শুনেচি। টিকার কথা তো শুনি নাই।’

খুলনা জেলার সুন্দরবন সংলগ্ন একটি উপজেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান, ওই উপজেলায় দুই শর বেশি শিশু এখনো টিকা পায়নি। তাদের খুঁজে বের করে টিকা দেওয়া শুরু হবে মঙ্গলবার থেকে।

বরগুনা জেলায় টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে ৫ এপ্রিল থেকে। জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয় জানায়, এখনো ৫ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে।

গণমাধ্যমে প্রচার চালানো দরকার। এলাকায় এলাকায় মাইকিং করা দরকার। র্যালি হওয়া প্রয়োজন। কেন ছয় মাস বয়সীরা টিকা নেবে, তা মানুষকে বোঝানো দরকার। সবার মধ্যে উদ্দীপনা সৃষ্টি না হলে সব শিশু টিকার আওতায় আসবে না।
জনস্বাস্থ্যবিদ বে-নজীর আহমেদ

এখন কী দরকার

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই গোলটেবিল বৈঠকে ইউনিসেফের কর্মকর্তা রিয়াদ মাহমুদ বলেছিলেন, সব শিশুকে টিকার আওতায় আনার জন্য সব পক্ষকে কাজ করতে হবে।

গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করে টিকা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে শিক্ষক ও নাগরিক সমাজের সহায়তা নিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা যেন বাদ পড়া শিশুদের টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এ নিয়ে বাড়তি প্রচারও করা হবে।

বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনার জন্য ব্যাপক প্রচার দরকার বলে অনেকেই মনে করেন। জনস্বাস্থ্যবিদ বে-নজীর আহমেদ বলেন, গণমাধ্যমে প্রচার চালানো দরকার। এলাকায় এলাকায় মাইকিং করা দরকার। র্যালি হওয়া প্রয়োজন। কেন ছয় মাস বয়সীরা টিকা নেবে, তা মানুষকে বোঝানো দরকার। সবার মধ্যে উদ্দীপনা সৃষ্টি না হলে সব শিশু টিকার আওতায় আসবে না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার হিসাবে (শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত) হামের উপসর্গ নিয়ে ৭ জন ও নিশ্চিত হামে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে হামে মৃত্যু চার শ ছাড়িয়েছে। হামের উপসর্গ নিয়ে ৩৪৪ জনের এবং নিশ্চিত হামে ৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

মৃত্যু ৪০০ ছাড়াল

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার হিসাবে (শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত) হামের উপসর্গ নিয়ে ৭ জন ও নিশ্চিত হামে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে হামে মৃত্যু চার শ ছাড়িয়েছে। হামের উপসর্গ নিয়ে ৩৪৪ জনের এবং নিশ্চিত হামে ৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগের দিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলেছিল, হামের উপসর্গ নিয়ে ও নিশ্চিত হামে ৩৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এত দিন একাধিক জেলার তথ্য ঠিকমতো প্রকাশ করেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গতকাল তা প্রকাশ করায় মৃত্যুর সংখ্যা ৪৬ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০৯–এ।

[প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন প্রথম আলোর দুজন প্রতিবেদক মো. নোমান সিদ্দিক ও সুরাইয়া সারোয়ার]