Image description

গত কয়েক মাসে হামের প্রাদুর্ভাবে দেশে সাড়ে ৩০০’র বেশি শিশু মারা গেছে বলে জানা যাচ্ছে গণমাধ্যমের খবরে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে স্বাস্থ্যখাতে জনবল সংকট, টিকা সংকট, অব্যবস্থাপনা, টিকাদানের বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করতে না পারা ইত্যাদি কারণে শিশুদের একটা অংশ টিকার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এসব খবর থেকে জানা যায়, আক্রান্ত ও মৃত্যুবরণ করা শিশুদের একটা অংশ কখনো হামের টিকা পায়নি।

নানান কারণে টিকা না পেয়ে যখন শিশুরা প্রতিদিনিই মৃত্যুবরণ করছে তখন অনলাইনে জোরেশোরে চলছে টিকা বিরোধী প্রচারণা। সম্প্রতি দ্য ডিসেন্ট এই ধরনের অনলাইন প্রচারণার ওপর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

তবে এই প্রচারণা এখন অনলাইন থেকে অফলাইনেও গড়িয়েছে। রীতিমত সমাবেশ আয়োজন করে বলা হচ্ছে, ‘হামের টিকা একটি ভুয়া ব্যাপার’, ‘ব্যবসা করার জন্য এই টিকা দেওয়া হচ্ছে’ ইত্যাদি।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হামের টিকা নিয়ে একটি মানববন্ধনে দেয়া এক বক্তার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। 

ভিডিওতে ওই বক্তাকে বলতে শোনা যায়, “আমাদের দেশে একটি প্রচণ্ড ধোঁকা হাম নিয়ে, হাম। গতকালকে নাকি ১৭ জন লোক হামে মারা গেছে। প্রত্যেকটি মারা যাওয়া রোগীর তথ্য আমি খবর নিয়েছি। একজনও হামে মারা যায়নি। ১৭ জনের মধ্যে একজনও হামে মারা যায় নাই। একজনও মারা যায় নাই। একটা শিশু সর্দিতে মারা গেছে, নিউমোনিয়ায় মারা গেছে এটাকে হাম বলা হয়েছে। আর বিগত ৭ দিনে শতাধিক লোক হামে মারা গেছে, এগুলা হচ্ছে করপোরেট ব্যবসায়ীদের মিথ্যা অপপ্রচার। যেমন লকডাউনের সময় যেকোন লোক মারা গেলে, সেটা হার্ট এ্যাটাকে মারা যাক, এক্সিডেন্ট করে মারা যাক, সেটাকে বলা হতো করোনায় মারা গেছে। এখন যেকেউ মারা গেলে বলা হচ্ছে হামে মারা গেছে। এর পিছনে আছে করপোরেটদের, ইউনিসেফের, এগুলা হচ্ছে টিকা ব্যবসা।”

বক্তব্যটি যিনি দিচ্ছিলেন তিনি ‘ইনসাফ কায়েমকারী ছাত্র-শ্রমিক-জনতা’ নামক একটি সংগঠনের আহ্বায়ক আরিফ আল খবীর। সংগঠনটির আয়োজনেই ওই মানববন্ধনটি অনুষ্ঠিত হয়। খবীর জানিয়েছেন গত শুক্রবার তিনি হামের টিকার বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছেন। 

সংগঠনটির দপ্তর সম্পাদক মোহাম্মদ রাসেল জানিয়েছেন প্রতি শুক্রবারে ডিবি কার্যালয়ের সামনে তারা প্রোগ্রামের আয়োজন করেন যেখানে বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বক্তব্য দেওয়া হয়। 

দ্য ডিসেন্টর সাথে আলাপের সময়ও আরিফ আল খবীর দাবি করেছেন, হামে কারো মৃত্যু হয় না এবং টিকার বিষয়টি পুরোপুরি ভুয়া। 

তিনি বলেন, “হামে কেউ মারা যায় না। অন্যকোন জটিল রোগ হয় সেটার বহিঃপ্রকাশ জ্বর হিসেবে ঘটে। পরে বলে হামে মারা গেছে। হাম সবারই হয়। যখন হামের টিকা আবিষ্কার হয়নি তখন কি হাম হতো না মানুষের? তখন তো কেউ হামে মারা যেত না। এটা টিকা ব্যবসার জন্য এই রোগটা নিয়ে এত কথা বলা হচ্ছে।”

ইহুদিদের স্বার্থ রক্ষার জন্য জাতিসংঘ টিকা দেওয়ার কথা বলে দাবি করে তিনি বলেন, “বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হু তো জাতিসংঘের একটা প্রতিষ্ঠান। জাতিসংঘ হচ্ছে ইহুদিদের স্বার্থ রক্ষার জন্য কাজ করে। টিকা কোম্পানিগুলো মূলত ইহুদি মালিকানার। একারণেই হু হামের টিকা দেয়ার কথা বলে। করোনা আর হামের টিকা পুরোটাই ভুয়া। গত জুমাবারেও আমরা হামের টিকা নিয়ে কথা বলেছি। এর আগে আমরা জরায়ু মুখ ক্যান্সারের টিকা নিয়ে কথা বলেছি। এই টিকাটা জরায়ুমুখকে সংকুচিত করে ফেলে এবং মা হওয়ার ক্ষমতা নষ্ট করে।”

খবীরের কাছে জানতে চাওয়া হয় এসব দাবি তিনি কিসের ভিত্তিতে করছেন। জবাবে তিনি জানান, তারা গবেষণা করে এসব তথ্য পেয়েছেন। ‘ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ অব সায়েন্টেফিক রিসার্চ এন্ড কোলাবোরেশন’ (আইজিএসআরসি) নামে তাদের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সে প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় দেখা গেছে হাম ও করোনার টিকা অপ্রয়োজনীয়। তবে দ্য ডিসেন্ট এ ধরণের কোন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি। তবে ফেসবুকে ‘ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চ এন্ড কোপারেশন’ নামে একটি পেইজ খুঁজে পাওয়া যায়। পেেইজটিতে বিজ্ঞান বিষয়ক বিভিন্ন লেখা পোস্ট করা হয় এবং বিজ্ঞানে মোসলমানদের অবদান তুলে ধরা হয়। তবে এই পেইজ থেকে ভ্যাক্সিন বিরোধী কোন প্রচারণা চালানোর প্রমাণ পাওয়া যায়নি। 

এর আগে গত ৩১ মার্চ দ্য ডিসেন্ট “হামের প্রাদুর্ভাবে মারা যাচ্ছে শিশুরা, অনলাইনে চালানো হচ্ছে টিকা বিরোধী প্রচারণা” শিরোনামে অনলাইনে টিকা বিরোধী প্রচারণা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। 

সে প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছিল অনলাইন প্রচারণার কেন্দ্রে রয়েছেন রাজিব আহমেদ নামের একজন অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সার ও ফয়জুল ইসলাম মানিক নামে প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ে কর্মরত একজন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা। 

খবীর জানান রাজিব আহমেদ ও ফয়জুল ইসলাম মানিক যেসব বিষয় প্রচার করেন সেসবের সাথে তার চিন্তার মিল রয়েছে। এমনকি তাদের সাথে তথ্য আদান-প্রদানও হয় খবীরের। তবে ফয়জুল ইসলাম মানিকের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান খবীর নামে কারো সাথে তার যোগাযোগ হয় বলে তিনি মনে করতে পারছেন না। এছাড়া মানিক দাবি করেন তিনি ভ্যাক্সিন বিরোধীও নন। কাউকে তিনি ভ্যাক্সিন দিতে তিনি নিষেধ করেন না। তবে ভ্যাক্সিনের ব্যাপারে তার সন্দেহ রয়েছে। 

টিকা বিরোধী প্রচারণায় বিভ্রান্ত হয়ে যদি মানুষ শিশুদের টিকা দান থেকে বিরত থাকে তাহলে সেটা মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য গবেষকরা।

জনস্বাস্থ্য গবেষক এবং ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের সহযোগী অধ্যাপক তৌফিক জোয়ার্দার বলেন, “হামের টিকার বিরুদ্ধে প্রচারণা দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ। এটা ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে। টিকার পেছনে বিজনেস আছে এটা সত্য। তার কারণ হচ্ছে এটার উৎপাদন অনেক ব্যয়বহুল। একজন সায়েন্টিস্ট সারাজীবন গবেষণা করেও হয়তো সফল নাও হতে পারেন টিকা উৎপাদন করতে। কিন্তু এর মানে নয় যে টিকাটা অপ্রয়োজনীয়। এটার মডেলটাই এরকম যে টিকার পেছনে হিউজ ইনভেস্ট করতে হয় এবং টিকা আবিষ্কারের সাকসেস রেট কম। টিকার উৎপাদন থেকে বাজারজাত হাইলি মনিটরড, এখানে কোন এদিকসেদিক হওয়ার সুযোগ নাই। পুরা প্রতিক্রিয়াটা এড়িয়ে বাজারে কোন ক্ষতিকর জিনিস বাজারে আসার কোন সুযোগ নাই।”

প্রচারণায় বিভ্রান্ত হয়ে টিকা না নেওয়ায় যদি শিশু মৃত্যু ঘটে তার দায়ভার কে নিবে-এমন প্রশ্ন তুলে এই গবেষক বলেন, “যারা এসব প্রচার করছেন তাদের কারণে যদি কোন শিশু ক্ষতিগ্রস্থ হয় সেটার দায়ভার কি তারা নেবে? মুসলিম দেশগুলোতে সারা পৃথিবীতে টিকা ব্যবহার হচ্ছে। কোথাও এটা নিয়ে কোন আপত্তি নেই। ধর্মের দিক থেকেও এটা অত্যন্ত আপত্তিকর, এসব ভুল প্রচারণার জন্য যদি একজন শিশুও মারা যায় সেটার দায়ভার ধর্মের দিক থেকেও তো তার উপর যায়। সরকার আলেম, ইমামদের সাথে বসে তাদের সাথে আলোচনা করতে পারে, সঠিক তথ্যটার ব্যাপারে তাদের সচেতন করতে পারে।”