Image description

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের বেশির ভাগই নতুন। তাই দাপ্তরিক কাজে তাদের বেশ কয়েকজনের অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণে কাজে ছন্দপতন ফুটে উঠেছে। সেই বাস্তবতায় সরকারের কাজের গতি বাড়াতে অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বিএনপির ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের যুক্ত করে মন্ত্রিসভার আকার বৃদ্ধির গুঞ্জন চলছে। মন্ত্রিসভার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পরিষদেও একাধিক সদস্য যুক্ত হওয়ার আভাস দিয়েছে সরকার ও বিএনপি সংশ্লিষ্ট সূত্র। 

একইসঙ্গে মন্ত্রিসভার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস হতে পারে। বিশেষ করে কৃষি ও প্রাণি সম্পদ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য, শিল্প, পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের দফতর নতুন করে বণ্টন করা হতে পারে। এতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বেশ কয়েকজন বিএনপির অভিজ্ঞ নেতা যুক্ত হবেন এবং টেকনোক্র্যাট কোটায় বিগত দিনে অবদান রাখায় আলোচিত কয়েকজন পরীক্ষিত নেতার পাশাপাশি প্রবাসী নেতারা যুক্ত হচ্ছেন বলে জানা গেছে। 

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি সূত্রমতে, বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া মন্ত্রিসভায় ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রীর পাশাপশি ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী থাকলেও কোনো উপমন্ত্রী নেই। তাই সম্প্রসারিত মন্ত্রিসভায় পূর্ণমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর পাশাপাশি বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা ও উপমন্ত্রী হিসেবে যুক্ত হচ্ছেন। এ ছাড়া, সংরক্ষিত নারী আসন থেকে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্যও যুক্ত হচ্ছেন বিএনপির এই মন্ত্রিসভায়। একইসঙ্গে তিনজন মন্ত্রীর দায়িত্ব কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আব্দুল মঈন খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, বেগম সেলিমা রহমানের নাম জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছে। তারা সবাই বেগম খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় ছিলেন। এবার অভিজ্ঞতা বিবেচনায় খালেদা জিয়াবিহীন মন্ত্রিসভায় তারা যুক্ত হতে পারেন। তবে, বেগম সেলিমা রহমানের বয়স ও শারীরিক অবস্থার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। তিনি দায়িত্ব না পেলে সংরক্ষিত নারী আসনের অন্য কোনো একজন সংসদ সদস্যকে মন্ত্রিসভায় আনা হতে পারে। এছাড়া, মন্ত্রিসভার বাইরে সংসদ উপনেতা ও রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ড. আব্দুল মঈন খানের নাম আলোচনায় রয়েছে।

নোয়াখালী-২ (সেনবাগ, সোনাইমুড়ী) আসন থেকে ৬ বারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক রয়েছেন এ তালিকায়। তিনি অষ্টম জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আন্দোলন-সংগ্রামে নির্যাতনের শিকার হয়ে গুরুতর আহত হয়েছিলেন। তিনি এবার মন্ত্রিসভায় ঠাঁই করে নেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

অন্যদিকে, উত্তরাঞ্চল তথা রাজশাহী বিভাগ থেকে মন্ত্রিসভায় যুক্ত হওয়ার আলোচনায় থাকা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সরকারদীয় হুইপ ও নাটোর-২ (সদর-নলডাঙ্গা) আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর চারদলীয় জোট সরকারের উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি হাসিনা সরকারে সময় জেল-জুলুমের শিকার হন। তারপরও রাজনীতি ও দেশ ছেড়ে যাননি। সবকিছু বিবেচনায় এবারও তিনি মন্ত্রিসভায় ঠাঁই করে নেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

এ ছাড়া, শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়কারী ও পাবনা-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস। তিনি প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত সহকারী ছিলেন। বিএনপি পরিবারের বিশ্বস্ত এই শ্রমিক নেতাও এবার মন্ত্রিসভায় ঠাঁই করে নেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

তবে, প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় আছেন চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ, প্রখ্যাত শিক্ষক নেতা ও কুমিল্লা-২ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক প্রথম যুগ্ম-আহ্বায়ক পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য বি এম মোশাররফ হোসেন, ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও খুলনা-৪ (রূপসা, তেরখাদা ও দিঘলিয়া) আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আজিজুল বারী হেলাল, ছাত্রদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও ফরিদপুর-৪ (ভাঙ্গা-সদরপুর-চরভদ্রাসন) আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল ও ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিরাজগঞ্জ-৫ (চৌহালী ও বেলকুচি) আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আমিরুল ইসলাম খান আলিম ও ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি ও ঢাকা-১ (দোহার-নবাবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য খন্দকার আবু আশফাক।

এছাড়া, টেকনোক্র্যাট কোটায় আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, যুগ্ম-মহাসচিব হাবিব-উন নবী খান সোহেল, যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহিদুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল।

যদিও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন, আর মাহদী আমিন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করছেন এবং এ বি এম আব্দুস সাত্তার প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া, যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহিদুর রহমান চার দশকের বেশি সময় ধরে বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত এবং দুইবার বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি মৌলভীবাজারে। 

এ প্রসঙ্গে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বলেন, প্রধানমন্ত্রী যে মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন, তা দেশবাসীর কাছে ইতিবাচকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। ভবিষ্যতে তিনি যে পরিবর্তন বা সম্প্রসারণ করবেন, সেটিও দেশ ও সরকারের স্বার্থ বিবেচনা করেই করবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবু আব্দুল্লাহ এম সালেহ (সালেহ শিবলী) বলেন, মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ বা রদবদল নিয়ে আমি কিছু জানি না। এ বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই।

মন্ত্রিসভায় রদবদল ও সম্প্রসারণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী জানান, এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। তবে এটি একান্তই প্রধানমন্ত্রীর বিষয়। কাজের সুবিধার্থে তিনি যদি মনে করেন মন্ত্রিসভার আকার বাড়ানোর প্রয়োজন, তাহলে সেটি করতে পারেন।

মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ নিয়ে দলীয় ফোরামে কোনো আলোচনা হয়নি জানিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, বিষয়টি বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এখতিয়ারাধীন। তাই তিনি কাকে, কোথায় দায়িত্ব দেবেন, সেটি সম্পূর্ণ প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার বলেও জানান তিনি।

কবে নাগাদ নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের নাম ঘোষণা করা হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত নির্দেশনা আসেনি। তবে আগামী বাজেট অধিবেশনের আগে মন্ত্রীসভা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা।