কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরজুড়ে এখন সোনালি ধানের সমারোহ। মাঠে চলছে ধান কাটার উৎসব, কৃষকের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। কিন্তু এই বাহ্যিক উচ্ছ্বাসের আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর হতাশা। বাম্পার ফলন হলেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চরম সংকটে পড়েছেন হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা।
ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, করিমগঞ্জ ও নিকলী উপজেলার হাওর এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে—ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজ চলছে পুরোদমে। কিন্তু বাজারে ধানের দাম কৃষকদের জন্য একেবারেই অস্বস্তিকর। বর্তমানে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকায়, যেখানে উৎপাদন খরচই পড়ছে প্রায় ১ হাজার টাকা।
অন্যদিকে ধান কাটা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৩০০ টাকায়। ফলে কৃষকদের হিসাবে এখন দুই মণ ধান বিক্রি করেও একজন শ্রমিকের মজুরি মেটানো যাচ্ছে না। এতে করে লাভ তো দূরের কথা, মূলধনই উঠে আসছে না।
নিকলী উপজেলার মজলিশপুর গ্রামের কৃষক আব্বাস আলী বলেন, এভাবে কৃষি করে লাভ নেই। দুই মণ ধান বিক্রি করে একজন শ্রমিকের টাকা দিতে হচ্ছে। তাই ছেলেদের কৃষি কাজে না লাগিয়ে বিদেশে পাঠানোর চিন্তা করছি।
একই উপজেলার কৃষক সেলিম মিয়া জানান, দুই একর জমিতে চাষ করে প্রায় ১৫০ মণ ধান পাওয়ার আশা করছি। কিন্তু শ্রমিক, সার ও তেলের বাড়তি দামে সব মিলিয়ে এখন লোকসানের আশঙ্কা। ধান কাটার আগেই ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা খরচ হয়ে গেছে, এখন শ্রমিকের মজুরি এক হাজার ৩০০ টাকা। এই দামে কৃষি কাজ করা অসম্ভব।
কৃষকদের অভিযোগ, সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম এখনও শুরু না হওয়ায় বাজারে সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। এক শ্রেণির ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগী কম দামে ধান কিনে বেশি দামে বিক্রি করে লাভবান হচ্ছে। বিশেষ করে দাদনের ঋণে জর্জরিত কৃষকেরা বাধ্য হয়ে মাঠ থেকেই কম দামে ভেজা ধান বিক্রি করছেন। হাওরাঞ্চলের ধান বাণিজ্যের প্রধানকেন্দ্র ভৈরব বাজার ও করিমগঞ্জের চামড়া নৌবন্দর ঘুরে দেখা গেছে একইচিত্র। ভৈরব বাজারে নতুন ধান বিক্রি হচ্ছে ৬৮০ থেকে ৭০০ টাকায়, যেখানে এক মাস আগেও পুরোনো ধান বিক্রি হয়েছে এক হাজার ৪০০ টাকায়। আড়তদাররা বলছেন, মিলাররা ভেজা ধানের অজুহাতে দাম কমিয়ে দিয়েছেন।
করিমগঞ্জ চামড়া নৌবন্দরেও প্রায় ৪০টি আড়তে কৃষকেরা ধান নিয়ে এলেও কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না। এখান থেকে কম দামে ধান কিনে ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন চালকলে পাঠানো হচ্ছে। মাঝখানে লাভবান হচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগীরা। আর ক্ষতির বোঝা বইছেন প্রান্তিক কৃষকেরা।
জেলা খাদ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরকার এ বছর ধানের মূল্য নির্ধারণ করেছে ৩৬ টাকা কেজি (মণপ্রতি এক হাজার ৪৪০ টাকা), সেদ্ধ চাল ৪৯ টাকা এবং আতপ চাল ৪৮ টাকা। তবে এখনও কিশোরগঞ্জে ধান সংগ্রহ শুরু হয়নি। এমনকি লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ হয়নি।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে, যার মধ্যে হাওরাঞ্চলে রয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৪৩৫ হেক্টর (৬২ শতাংশ)। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১১ লাখ ৯৫ হাজার টন ধান এবং ৭ লাখ ৯৬ হাজার মেট্রিক টন চাল। ইতোমধ্যে প্রায় ৩৮ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান বলেন, হাওরে বাম্পার ফলন হয়েছে। সরকারিভাবে ধান ক্রয় শুরু হলে বাজারে দাম বাড়বে বলে আশা করছি।